“হ্যাঁ, কোনোদিনি হয়ত নশ্বর অশ্বঘোষ বিলীন হয়ে যাবে আমার দৃষ্টি থেকে, কিন্তু আমি যুগ-যুগান্তরের অমর কবি অশ্বঘোষের আরাধানা করে চলব। তোমারই বীণায় তোমার রচিত গান গাইব। জীবনভোর গান গেয়ে ফিরব দেশে-বিদেশে, যতদিন না আমাদের যুগ্ম জীবনপ্রবাহ অন্য কোনো দেশকালে এসে সাকার-সম্মিলনের ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমি না থাকলে তুমি কি করবে?”
কথাগুলো শুনে অশ্বঘোষের অন্তস্থল থেকে সুরু করে সারা দেহ কেঁপে উঠল খরখর করে, প্রভা অনুভব করল সে কম্পন। কথা বলবার চেষ্টা করল অশ্বঘোষ, কিন্তু কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে তার, চোখে জল। কিছুক্ষণ চেষ্টার পর ক্ষীণকণ্ঠে বলল,“জীবনে এমন দিন সত্যই বড় সাংঘাতিক, কিন্তু আমিও আত্মহত্যা করব না প্রভা। তোমার প্রেমের প্রেরণা আমার হৃদয়ে যে গানের সঞ্চার করবে, তাই আমি গেয়ে চলব জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। আমি যে তোমারই অমর অশ্বঘোষ।”
“সরষুর-ধারা ঘুমিয়ে পড়েছে প্রিয়তম, চল আমরা এবারঘরে ফিরি।”
৯
গ্রীষ্মকাল । মাতা সুবর্ণাক্ষী রোগে পড়লেন। অশ্বঘোষ দিনরাত মায়ের কাছে থাকে। দিনের বেলা প্রভাও থাকে। চিকিৎসায় কোনো ফল হল না, সুবর্ণাক্ষীর অবস্থা সস্কটজনক হয়ে উঠল। আর এক পূর্ণিমার রাত এসে গেল, রুপালী চাঁদের আলো ছড়িয়ে চারিদিকে। এই চাঁদের আলোতেই সুবর্ণাক্ষী ছাদের ওপর যেতে চাইলেন। তাঁর পালস্ক উঠল সেখানে। তাঁর কস্কালসার শরীর দেখে অশ্বঘোষের হৃদয় ব্যথায় ভরে উঠতে লাগল। ধীরে স্পষ্ট কণ্ঠে মা বললেন, “কি সুন্দর জ্যোৎস্না!”
অশ্বঘোষের কানে প্রভার কথা বেজে উঠল,‘সিরযুর তরঙ্গ-লহরী আমাকে ডাকছে।’বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল অশ্বঘোষের । মা আবার বললেন,“প্রভা কোথায় বাবা?”
“তাদের বাড়িতে মা, সন্ধ্যা পর্যন্ত তো এখানেই ছিল।”
“প্রভা !মা আমার !ওকে তুই কখনও ভুলিস না বাবা…..” কথা হবার আগেই একটা কাশির দমকে সুবর্ণাক্ষীর দেহ নিশ্চল হয়ে গেল। সুবর্ণাক্ষী গত হলেন। সুবর্ণাক্ষী পুত্রের বুক ফেটে হাহাকার উঠল। রাত দিন সমানে কাঁদল সে।
পরদিন মধ্যাহ্ন পর্যন্ত মায়ের দাহকর্মেই কেটে গেল। তারপর প্রভার কথা মনে পড়ল। সে দত্তমিত্রের বাড়িতে গেল। প্রভার মা-বাবা ভেবেছিলেন, সে অশ্বঘোষের কাছেই গেছে। গত রাত্রের আঘাতেই অশ্বঘোষের হৃদয় জর্জরিত হয়ে উঠেছিল, এখন সে আরও অধরি হয়ে পড়ল। অশ্বগোষ প্রভার শয়নকক্ষে ঢুকল । সব জিনিসই ঠিকমতো সাজানো রয়েছে। শয্যার ওপর থেকে সাদা চাদরটা টেনে তুলল সে, সেখানে দেখতে পেল নিজের একখানা ছবি। ছবিখানা তৈরী করিয়েছিল প্রভা এক নবাগত যবন চিত্রকরকে দিয়ে। এই ছবির জন্য অনিচ্ছসত্ত্বেও অশ্বঘোষকে বহু সময় স্থির হয়ে বসে থাকতে হয়েছিল। ছবির ওপর একটি স্নান জুঁই ফুলের মালা । ছবির নীচে প্রভার মুদ্রাস্কিত তালপত্র-লেখ রয়েছে। অশ্বঘোষ চিঠিখানা তুলে নিল। সুতো দিয়ে বাঁধা ছিল সেটা। সুতোর বাঁধুনি আটুকাবার জন্য যে কালো মাটি লাগানো হয়েছিল তা তখনও ভালো করে শুকোয়নি। সুতো কেটে চিঠি খুলতেই প্রভার সুন্দর হস্তাক্ষরে লম্বা পাতার ওপর লেখা পাঁচটি পংত্তি জলজল করে উঠল-
“প্রিয়তম, প্রভা বিদায় নিয়ে যাচ্ছে, সরষুর জলরাশি আমার ডাক দিয়েছে, তাই আমি চলেছি। আমার প্রেমের প্রতিদারে তুমি একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলে মনে আছে?প্রভার চির-তারুণ্য, শাশ্বত সৌন্দর্য আমি রেখে যাচ্ছি তোমার কাছে। পাকাচুল, ভাঙাদাঁত লোলচর্ম প্রভাকে আর তোমায় দেখতে হবে না। আমার প্রেম, আমার এই অবিনশ্বর যৌবন তোমাকে প্রেরণা জুগিয়ে চলবে। এই প্রেরণাকে তুমি হেলায় নষ্ট কর না, প্রিয়তম। এ কথা ভেব না, আমি তোমার আত্নীয়-স্বজনের তিরস্কারের ভয়ে আম্নহত্যা করছি। শুধু তোমাকে কাব্য-প্রেরণা জোগাবার জন্যেই আমি এই পথে আমার অক্ষুন্ন যৌবনকে তোমার কাছে রেখে গেলাম। প্রিয়তম, প্রভা তার কল্পনায় তোমাকে শেষ আলিঙ্গন আর চুম্বন দিয়ে যাচ্ছে।”
বারে বারে চোখের জল মুছে চিঠিখানা পড়ল অশ্বঘোষ। শেষে চিঠিখানা তার হাত থেকে পড়ে গেল। খাটের ওপর বসে পড়ল সে। সব কিছুই যেন শূন্য হয়ে গেছে তার। তম্নয় হয়ে সে যেন হুদস্পন্দন স্তব্ধ হবার প্রতীক্ষা করতে লাগল। মর্মর মুতির মতো শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রিইল। বহুক্ষণ পর প্রভার বাবা-মা ঘরে এসে ঢুকলেন। অশ্বঘোষের এই অবস্থা দেখে বড়ই শস্কিত হয়ে পড়লেন তাঁরা । তারপর চিঠিখানা তুলে পাঠ করলেন। প্রভার মা তীব্র আর্তনাত করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। দত্তমিত্রের চোখ থেকে নীরব অশ্রুধারা নেমে এল। অশ্বঘোষ তাকিয়ে রইল তেমনি স্থির শূন্য দৃষ্টি মেলে। বহুক্ষণ পর্যন্ত তাকে এই অবস্থায় দেখার পর প্রভার মা-বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন । সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এল, অশ্বঘোষ বসে রয়েছে সেই একই অবস্থায়। চোখের জল শুকিয়ে গেল। তার হৃদয়ের ভিতরটাও পাথর হয়ে গেছে যেন। এইভাবে বসে থাকতে থাকতে অনেক রাতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
সকলে প্রভার মা এসে দেখলেন , অশ্বঘোষ প্রকৃতিস্থ হয়ে কি যেন চিন্তা করছে বসে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছ?”
“সম্পুর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছি মা। প্রভা যে কাজ আমাকে সঁপে দিয়ে গেছে এ বারে আমি তাই সম্পন্ন করব। আমি বুঝতাম না, কিন্তু প্রভা জানত , সে আমার কর্তব্য বলে দিয়ে গেছে।–আম্নহত্যা নয় মা, প্রভা আত্নদান করে গেছে। এ কথা ঠিকই যে, এই আত্নদানকে আমি আম্নহত্যা বলে প্রচার করতে পারি, কিন্তু এত অকৃতজ্ঞ আমি হতে পারব না।”
