“পরিবর্তন আমাদের চাই, কিন্তু সেটা এগিয়ে যাবার জন্য, পিছিয়ে পড়ার জন্য নয়—আমার মনে হয় ভদন্ত, অতীত চিরকালই মৃত।”
“খুবই খাঁটি কথা! বুদ্ধ পরিবর্তন চাইতেন উন্নততর জগৎ প্রতিষ্ঠার জন্য। এই ভবিষ্যৎ জগতের প্রতীক হিসাবে তিনি ভিক্ষুসঙ্ঘকে সংগঠিত করেছেন। যেখানে জাতিভেদে, শ্রেণীভেদ নেই, উঁচু-নীচুর ভেদ নেই। যেখানে সকলেই সমান, যেখানে সবাইকেই সমান শ্রম করতে হবে। তুমি আমাদের মহাস্থবির ধর্মসেনকে বাইরে ঝাড়ু হাতে কাজ করতে দেখেছ?”
“ঐ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ বৃদ্ধটি?”
“হ্যাঁ, উনিই আমাদের ভেতরে শ্রেষ্ঠ, আমরা প্রতিদিন পঙ্ক-প্রতিষ্ঠিত হয়ে তাঁকে বন্দনা করি। সমগ্র কোশল দেশের ভিক্ষসঙ্ঘগুলির উনিই নায়ক।”
“শুনেছি, উনি না-কি চণ্ডাল কুলজাত?”
“ভিক্ষুসঙ্ঘ কুলবিচার করে না, কুমার। তারা বিচার করে গুণের। নিজ বিদ্যা এবং গুণের জোরেই আজ উনি আমাদের নায়ক, আমাদের পিতা। শুধু নিজের পেট ভরানোর মতো সামান্য ভিক্ষাও যদি তিনি লাভ করেন, তবু সঙ্গীদের ভাগ না দিয়ে কখনই তা গ্রহণ করেন না তিনি এবং এই হল বুদ্ধের শিক্ষা। পরিধেয় তিন খণ্ড কাপড়, মাটির তৈরী এক ভিক্ষাপাত্র, একটি সূচ, জল পান করবার একটি পাত্র, একটি চিরুণী আর এক কোমর বন্ধনী—এই কয়টি জিনিস ছাড়া আমাদের আর সব কিছু সঙ্ঘের সাধারণ সম্পত্তি। আমাদের কোনো বিহারে যে জমি রয়েছে, তাও সঙ্ঘেরই। কাউকে ভিক্ষুসঙ্ঘে গ্রহণ করতে হলে সঙ্ঘ বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তা করে, কিন্তু একবার যে সঙ্ঘে প্রবিষ্ট হয়েছে, ভিক্ষুতে পরিণত হয়েছে, সে সঙ্ঘের আর সবারই সমান।”
“সারা দেশটাই যদি এমনই এক সঙ্ঘে পরিণত হত!”
“সে কি করে হবে কুমার? রাজা বা ধনীর দল কেন অন্যকে তাদের সমান হতে দেবে! ভিক্ষুরা একাবর একজন দাসকে সঙ্ঘে ঢুকিয়েছিল। সঙ্ঘে আসবার পরই সে আর দাস রইল না, হয়ে গেল সকলের সমান। কিন্তু এরপরই তার প্রভু এসে হল্লা সুরু করে দেয়। রাজা নিজে হাজার হাজার দাসের প্রভু। তিনিই বা তাঁর সম্পত্তির ওপর এ ধরনের হস্তক্ষেপ সহ্য করবেন কেন? এ সবের বিরুদ্ধে কি আর করতে পারি, কাজেই নির্দেশ দিতে হল, কোনো দাসকে আর সঙ্ঘের ভিতর নেওয়া হবে না। অসাম্যের বিশাল সমুদ্রের মাঝে আমাদের সঙ্ঘ এক ক্ষুদ্র দ্বীপমাত্র। দারিদ্র্য এবং দাসত্ব যতদিন অটুট থাকবে, ততদিন আমাদের সঙ্ঘগুলিকে নিরাপদ মনে করা চলে না।”
৮
শরতের পূর্ণিমা। সন্ধ্যা থেকেই চাঁদের আলো পূর্ব দিগন্ত থেকে উঠে আসছে। অন্তমিত সূর্যের লাল আভা যেমন নীল দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে, চাঁদের শীতল রূপালী আলোও তেমনি নীল আকাশকে উদ্ভাসিত করে তুলেছে। আজকাল অশ্বঘোষ বেশীরভাগ সময়ই প্রভাদের বাড়ি থাকে। দু’জনে ছাদের ওপর বসেছিল, প্রভা বলে উঠল, “সরষুর তরঙ্গ-লহরী আমাকে ডাকছে প্রিয়তম! সেই লহরী, যা তোমাকে প্রথম আমার কাছে টেনে এনেছিল এবং প্রথম প্রেমডোরে আমরা বাঁধা পড়েছিলাম। সে দিনটি দু’বছর আগের, কিন্তু আজও মনে হয় যেন গতকালে গটনা। কত চাঁদনী-রাতই না আমরা সরযুতীরে কাটিয়েছি, কি মুধর ছিল সেইসব রাতগুলো! আজও তেমনি মধুযামিনী প্রিয়ে! চল, আমরা সরষুতীরে যাই।” দু’জনে চলতে লাগল। নদী এখান থেকে দুরে। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত বালুকারাশির ওপর দিয়ে অনেক দুর হাঁটল তারা। প্রভা তার চটি জোড়া আগেই তাহে তুলে নিয়েছে, পায়ে নীচে কোমল বালুকারাশির সুখস্পর্শ অনুভব করতে লাগল। দু’হাতে অশ্বঘোষের কটি বেষ্টন করে প্রভা বলল, “সরযু-সৈকতে এই বায়ুর স্পর্শ কি অপূর্ব, না প্রিয়তম?”
“হ্যাঁ, পায়ের নীচে বেশ চমৎকার সুড়সুড়ি দেয়!”
“এক অদ্ভুত অনুভতি না? রোমাঞ্চ লাগে যেন!”
“আমি কতবার ভেবেছি, আমরা দু’জনে পালিয়ে যাই! চলে যাই সেই দেশে যেখানে আমাদের প্রেমকে ঈর্ষা করার কেউ থাকবে না। যেখানে তুমি আমাকে প্রেরণা জোগাবে আর আমি রচনা করব সুন্দর গীত। তারপর বীণা বাজিয়ে সেই গীত এক সঙ্গে গাইব দু’জনে। এখানে এমন রাত্রে আমার বীণা তো সঙ্গে আনতে পারি না প্রভা, লোক জমে যাবে। আর তাদের মধ্যে হয়ত দেখব বহু ঈর্ষাকলষিত নয়ন!”
“মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, যদি আমি না থকি…”
প্রভাকে দৃঢ়ভাবে বুকে চেপে ধরে অশ্বঘোষ বলল, “ না না প্রিয়ে, কখনেই তা হতে পারে না, আমরা এমই এক সঙ্গে চিরদিন থাকব।”
“অন্য কিছু ভেবে আমি এ কথা বলছিলাম প্রিয়তম। ধর, তুমি মারা গেলে আমি একা হয়ে গেলাম। জগতে এ রকম ঘটনা ঘটে তো নিশ্চয়ই।”
“ঘটে!”
“তোমার মৃত্যুর কথায় তো অধীর হয়ে উঠলে না তুমি! তোমার অবর্তমানে আমার ওপরেই শুধু শোকের পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে—এই ভেবে, না?”
“তুমি নিষ্ঠুর কথা শোনাচ্ছ কেন প্রভা!”
অশ্বঘোষের অধর চুম্বন করে প্রভা বলল, “জীবনে পূর্ণিমাই শুধু নয়, জীবনে অমানিশারও আগমন হয। আমি শুধু এইটুকুই বলতে চাইছিলাম, একের অবর্তমানে অপরের কর্তব্য কি। তুমি না থাকলে আমি কি করব জানো?”
মাথা নীচু করে দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে অশ্বঘোষ বলল,“বল।”
“নিজের জীবনকে কিছুতেই শেষ করে দেব না আমি। ভগবান বুদ্ধ আত্মহত্যাকে পাপপূর্ণ মূর্খের কাজ বলে অভিহিত করেছেন। তুমি তো দেখেছ, ইতিমধ্যেই বীণার ওপর কতটা দখল আামার এসে গেছে।”
“অনেকখানি প্রভা! কতবার তোমার হাতে বীণা তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে গান গেয়েছি আমি।”
