“তোমাকে অদেয় আমা কিছুই নেই প্রিয়ে।”
“কিন্তু তুমি আমার কথা শেষ করতে দাওনি….”
“তুমি যে বস্ত্রবাক্য উচ্চারণ করতে যাচ্ছিলে!”
“কিন্তু এই বজ্রবাক্য শাশ্বত অশ্বঘোষের হিতকল্পে উচ্চারণ তো করতেই হবে। আমার প্রেম চায়, মহান কবি অশ্বঘোষের আপন অমর কবি-প্রতিভার মতো প্রভার প্রেমকেও যেন অমর বলে মনে করে, তাকে যেন শুধু প্রভার রক্ত-মাংসের দেহ দিয়ে বিচার না করে। অমর অশ্বঘোষের প্রভা শাশ্বত তরুণী, শাশ্বত সুন্দরী। শুধু এইটুকুই আমি তোমাকে দিয়ে উপলদ্ধি করাতে চাই।”
“তা’হলে মূর্তিময়ী প্রভার বদলে কল্পলোকের প্রভা আমার সামনে থাকবে?”
“আমি উভয়কেই মূর্তিময়ী মনে করি, পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, দু’জনের মধ্যে একজন এক শ’ অথবা পঞ্চাচ বছর বেঁচে থাকবে আর অন্যজন থাকবে চিরজীবী হয়ে। তোমার প্রভা তোমার ‘উর্বশী-বিয়োগ’-এ অমর হয়ে থাকবে কিন্তু আমার প্রেমকে অমর করে রাখতে হলে তোমাকে অমর অশ্বঘোষের দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। রাত অনেক হয়ে গেছে, সরষূর-জল যেন ঘুমিয়ে পড়েছে, আমাদেরও ঘরে ফেরা উচিত।”
“অমর প্রভার একটি চিত্র আমি আমার মানসপটে অঙ্কিত করে নিলাম।”
“শুধু এইটুকুই আমি চাই প্রিয়তম”—এই বলে রেশমের মতো কোমল কেশপাশ অশ্বঘোষের কপোলতলে বুলিয়ে দিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল প্রভা।
৭
প্রশন্ত এক অঙ্গনের চারিদিকে বারান্দা এবং পিছনে চারতলা এক অট্টালিকা। বারান্দায় ভিজে কাপড় শুকোচ্ছে। অঙ্গনের এক কোণে একটি কুয়া এবং স্নানের ঘর। অঙ্গনের অন্যান্য স্থানে বহু রকমের গাছপালা, তার মধ্যে একটি অশ্বথ গাছ। গাছের মূলে বাঁধানো বেদী আর একটু দুর পাথরের দেওয়াল। দেওয়ালের ওপর সহস্র দীপ রাখবার স্থান। হাঁটু গেড়ে বসে এই সুন্দর বৃক্ষ বন্দনা করে প্রভা বলল, “প্রিয়, এ হচ্ছে সেই জাতে বৃক্ষ যার নীচে বসে সিদ্ধার্থ গৌতম আপন সাধনা, আপন চিন্তায় দ্বারা মনকে ভ্রান্তিমুক্ত করে বোধপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং সেই থেকে এ গাছ বুদ্ধের নামে খ্যাত হয়েছে । সেই পবিত্র স্মৃতি স্মরণ করে আমি এই বৃক্ষের সামনে মাথা নত করি।”
“আপন সাধনা, আপন চিন্তায় দ্বারা সমনে ভ্রান্তিমুক্ত করে বৌধিক মার্গ অর্জনের প্রতীক! এ রকম প্রতীককে পূজা করা উচিত প্রিয়ে! এ রকম প্রতীকের পূজা আপন সাধনায় আত্ম-বিজয়েরই পূজা।”
এরপর দু’জনেই ভদন্ত ধর্মরক্ষিতের কাছে গেল। তিনি অঙ্গনের এক বকুল বৃক্ষের নীচে উপবিষ্ট ছিলেন। নবপুষ্পিত ফুলের মধুর সৌরভ ছড়িয়ে পড়ছিল। বৌদ্ধ উপাসিকার ন্যায় প্রভা পঙ্কপ্রতিষ্ঠিত হয়ে (হাঁটু গেড়ে বসে, হাতের পাতা এবং কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে) তাঁকে বন্দনা করল। অশ্বঘোষ দণ্ডায়মান অবস্থাতেই শ্রদ্ধা নিবেদন করল। তারপর দু’জনে মাটির ওপর রক্ষিত চর্মাসনে বসে পড়ল। সাধারণ শিষ্টাচারের কথাবার্তার পর অশ্বঘোষ দর্শনের কথা তুলল। ধর্মরক্ষিত বললেন, “ব্রাহ্মণকুমার, বৌদ্ধধর্মে দর্শনকেও বন্ধন এবং দৃঢ়বন্ধন (দৃষ্টিসংযোজন) বলা হয়েছে।”
“তবে কি বৌদ্ধধর্মে দর্শনের কোনো স্থান নেই, ভদন্ত?”
“বুদ্ধের ধর্মই দর্শনময়, কিন্তু বুদ্ধ একে নদী পার হবার ভেলা মনে করতেন।”
“কি বললেন, ভেলা মনে করতেন?”
“হ্যাঁ, খেয়াবিহীন নদী পার হতে হলে লোক ভেলার সাহায্যে পার হয়। কিন্তু পার হবার পর সেই ভেলা মাথায় করে নিয়ে যায় না।”
“আপন ধর্মের সপক্ষে যে পুরুষ উচ্চকণ্ঠে এত বড় কথা বলবার স্পর্ধা রাখেন, তিনি নিশ্চয়ই সত্যের অন্তর্নিহিত শক্তিকে উপলদ্ধি করেছেন। ভদন্ত, বুদ্ধের দর্শন থেকে এমন কিছু বলুন যাতে আমরা নিজেদের চলার সঠিক পথ খুঁজে নিতে পারি।”
“অনাত্মবাদ, কুমার! ব্রাহ্মণেরা আত্মাকেই নিত্য, ধ্রুব, এবং শাশ্বত তত্ত্বকে স্বীকার করেন না। এ জন্যেই তাঁর দর্শনকে অনাত্মবাদ, অর্থাৎ অবিরাম উৎপত্তি আর বিনাশের সংঘর্ষে যে অনিত্যতা তারই দর্শন বলা হয়।”
“এই একটা বাণীই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট ভদন্ত! ধর্ম এবং অনাত্মবাদ ভেলার ন্যায়, এই বাণী প্রচার করেছেন যে বু্দ্ধ—তাঁকে শত শত অশ্বঘোষ প্রণাম জানাচ্ছে। অশ্বঘোষ যা খুঁজে মরছিল তা সে পেয়ে গেছে। আমি নিজের ভিতরে এমনই এক চিন্তালহরী অনুভব করছিলাম কিন্তু রূপ দেবার মতো ভাষা এর আগে আমি খুঁজে পাইনি। লোকে বুদ্ধের শিক্ষাকে যথাযথ পালন করলে পৃথিবীর রূপ আজ বদলে যেত।”
“ঠিকই বলছে কুমার! আমাদের যবন দেশগুলোতে মহান দার্শনিকগণ জন্মগ্রহণ করেছেন যাঁদের ভিতর পিথাগোরাস এবং হেরাক্লিটাস ছিলেন ভগবান বুদ্ধের সমসাময়িক আর সক্রেটিস, প্লেটো, দেমোক্রেটাস, আরিস্টোটল—এরাঁ জন্মগ্রহণ করেন কিছুকাল পরে। এইসব যবন দার্শনিকদের সকলেই ছিলেন অত্যন্ত চিন্তাশীল ব্যক্তি। কিন্তু একমাত্র হেরাক্লিটাস ছাড়া আর কেউেই শাশ্বতবাদ, নিত্যবাদের উর্ধ্বে উঠতে পারেননি।বর্তমান সম্বন্ধে তাদের মোহ ছিল বড় বেশী। তার কারণ , ভবিষ্যৎকে তাঁরা বর্তমানের নাগপাশে বেঁধে রাখতে চাইতনে। হেরাক্লিটাস অবশ্য বুদ্ধের মতোই, জগৎকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থির, অঞ্চল বলে স্বীকার করতেন না, বুদ্ধের মতোই চির-চলমান বলে তিনি জগৎকে মনে করতেন—কিন্তু এর পেছনে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থ।”
“দর্শন-বিচারে ব্যক্তিগত স্বার্থ!”
“উদর নামক জিনিসটি সকলেরই আছে কুমার! হেরাক্লিটাসের সময়ে আমাদের এথেন্স নগরে গণ-শাসন ছিল, অর্থাৎ এথেন্স কোনো রাজার অধীন রাজ্য ছিল না। প্রথমে হেরাক্লিটাসদের পরিবারের মতো বড় বড় সামন্ত পরিবারেরা গণ-শাসনের কর্ণধার ছিলেন। পরে তাঁদের হটিয়ে দিয়ে ব্যবসায়ী-শেঠরা শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেয়। হেরাক্লিটাস এতে মোটেই খুশী হননি, তিনি পরিবর্তন চেয়েছিলেন সত্যি, কিন্তু এগিয়ে চলার পথে নয়, পিছনে ফিরিবার জন্যে।”
