“মহাস্থবির ধর্মসেন। সাকেতের সমস্ত বিহারবাসী ভিক্ষুদের প্রধান।”
“শুনেছি, চন্ডাল কুলে তাঁর জম্ম। অথচ আমার আপন কাকা ভিক্ষু শুভগুপ্ত তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তাঁকে প্রণাম করেন। ভেবে দেখ, কোথায় এক শ্রোত্রিয় ব্রাক্ষণ কুলজাত বিদ্ধা্ন শুভগুপ্ত , আর কোথায় চন্ডালপুত্র ধর্মসেন?”
“কিন্তু মহাস্থবির ধর্মসেনও প্রগাঢ় পান্ডিত্যের অধিকারী।”
“আমি প্রাক্ষণ্যধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি, প্রভা?……….”
“বৃদ্ধ তাঁর ভিক্ষু-সঙ্গকে সমুদ্র আখ্যা দিয়েছেন , যিনিই এই সঙ্গে যোগ দেন তিনিই তাঁর নাম-রুপ ছেড়ে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যান।”
“বৌদ্ধ গৃহীরাও কেন এমনি করে না?”
“বৌদ্ধ গৃহীরা দেশের অন্যান্য গৃহী লোকদের থেকে স্বতস্ত্র হয়ে থাকতে পারে না। তা’ছাড়া তাদের ঘাড়ে পারিবারিক বোঝাও থাকে।”
“আমার তো মনে হয় কালকারামের ভিক্ষুদের মতো নগর এবং গ্রামের সমস্থ লোক যদি জাতিভেদ শূন্য, বর্ণভেদ শূন্য হয় হবে খুবই ভালো।”
“একটা কথা তোমাকে আমি বলিনি প্রিয়তম। তোমার পিতা একদিন আমার সামনে উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন, আপনার কথা আমি অশ্বঘোষের তুমি মুক্তি দাও।”
“যেন তুমি মুক্তি দিলেই তিনি তাঁর পুত্রকে ফিরে পাবেন! তুমি কি বললে?”
“আমি বলেছিলাম, আপনার কথা আমি অশ্বঘোষের কাছে বলব।”
“আর তাই আজ বললে তুমি। ব্রাক্ষণদের পাষশুতাকে আমি অসীম ঘৃণা করি- ঘৃণায় আমার সর্বাঙ্গ জলতে থাকে । তাঁরা বলে বেড়ায়, আমরা বেদ-শাস্ত্রকে অনুসরণ করি, কিন্তু বহু পরিশ্রম এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে সমগ্র ব্রাক্ষণ্য-বিদ্যা অধ্যয়ন করেও কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না, কি তারা অনুসরণ করে।পুরাণের্ কোনো ঋষিবাক্য উদ্বৃত করলে বলবে-আজকাল এ সবের প্রচলন নেই। হয় যুক্তির পথে চল, নয় তো ঋষিবাক্য অনুসরণ কর! পুরাতন বেদনীতি যদি কউ ভঙ্গ করে ,তবেই না নতুন রীতি প্রবর্তিত হয়। ভশু, কাপুরুষ , স্বার্থপররা পুষ্ট বাছুরের মাংস আর মোটা দক্ষিণা পেলেই খুশী। আশ্রয়দাতা রাজা এবং সামন্তগণ যাতে প্রসন্ন হয় সেই কাজেই এরা সদা প্রস্তুত।”
“দরিদ্র হলে কাউকেও নিজেদের ধর্মে স্থান দেয় না এরা…”
“হ্যাঁ, অন্যান্য দেশ থেকে আগত যবন, শক, আভীর ইত্যাদি জাতিসমূহকে এরা ক্ষত্রিয় বলে রাজপুত্র বলে স্বীকার করে নিয়েছে, করাণ, তাদের হাতে ক্ষমতা এবং অর্থ ছিল। তাদের কাছে থেকে এরা মোটা-মোটা দক্ষিণা পেত। কিন্তু স্বদেশের শুদ্র, চণ্ডালদের চিরতরে দাস করেই রেখেছে এরা। যে ধর্ম মানুষের হৃদয়কে উদার করে তুলতে পারে না, যে ধর্মের বিকাশ শুধু টাকার থলি বা শাসন-ক্ষমতার অপেক্ষায় পড়ে থাকে, আমি তাকে মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কলঙ্কজনক মনে করি। জগৎ পরিবর্তনশীল, ব্রাহ্মণদের প্রাচীন ধর্মগ্রস্থ থেকে আজকের গ্রন্থাবলী পর্যন্ত সমস্ত পড়ে তাদের আচার ব্যবহারেও পরিষ্কার পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি! কিন্তু এদের সঙ্গে কথা বল, দেখবে এরা সমস্ত কিছুকেই শাশ্বত সনাতন প্রতিপন্ন করতে চাইছে। একে এক ধরনের জড়তাই আখ্যা দেওয়া যায় প্রভা।”
“তোমার এই সমস্ত বিষোদগারের কারণ আমি নই তো!”
“কারণ হওয়া তো প্রশংসারই কথা প্রভা! তুমি আমার কবিতায় নতুন প্রাণ, নতুন প্রেরণার সঞ্চার করেছ। আমার অন্তদৃষ্টিতেও নতুন প্রাণ, নতুন প্রেরণা সৃষ্টি করে তুমি আমার উপকার করেছ। এতদিন ভাবতাম যে, জ্ঞানের সর্বোচ্ছ শিখরে আমি আরোহণ করেছি, এই মিথ্যা দম্ভের সহজ স্বীকৃতি হল ব্রাহ্মণকুল। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, জ্ঞানসমুদ্রের পরিধি ব্রাহ্মণদের শ্রুতি আর তাদের তাল এবং ভূর্জপত্রের পুথিতেই সীমাবদ্ধ নয়, সে এ সবের চেয়ে অনেক বিশাল।”
“আমি সামান্য এক নারী মাত্র।”
“সামান্য নারী বলেই যদি কেউ তাকে নীচ বলে, তবে সে আমার ঘৃণার পাত্র।”
“যবনকুলে নারীদের সম্মান অন্যদের চেয়ে বেশী। যদি কেউ নিঃসন্তান থেকে মরেও যায় তবু এক স্ত্রী বর্তমানে সে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারে না।”
“আর এই ব্রাহ্মণেরা শত শত বিবাহ করে বেড়ায় শুধু দক্ষিণা লাভের আশায়, ছিঃ! কোনো যবন যে ব্রাহ্মণ্যধর্মকে মানে না এতে আমি খুব খুশী।”
“বৌদ্ধ হলেও পূজাপাঠের জন্য আমাদের মধ্যে ব্রাহ্মণেরা আসে।”
“স্বার্থরক্ষার জন্য যবনদের যখন ক্ষত্রিয় বলে অভিহিত করেছে,তখন দক্ষিণার আশায় এটুকুই বা করবে না কেন!”
“আমি কি তোমার ব্রাহ্মণত্বের অহঙ্কার ভেঙ্গে দেবার কারণ হয়ে দাঁড়ালাম?”
“তাতে মন্দ কিছু হয়নি। ব্রাহ্মণত্বের দম্ভ যদি তোমার আমার মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায় তো সে দম্ভ আমার কাছে ঘৃণার বস্তু।”
“তুমি আমাকে এত ভালোবাসো জেনে বড় সুখী হলাম।”
“তোমার প্রেমে বঞ্চিত থাকলে অশ্বঘোষ এক নিষ্প্রাণ জড়পিণ্ডে পরিণত হবে।”
“তা’হলে আমার প্রেমের পুরষ্কার, বরদান করতে পার তুমি?”
“ঐ প্রেমটুকু বাদে আর সব কিছু ছেড়ে দিতে পারি।”
“আমার প্রেম যদি অমর অশ্বঘোষ, মহান যুগকবি অশ্বঘোষকে এতটুকুও নীচে নামিয়ে এনে থাকে, তবে ধিক্আমার সে প্রেম।”
“পরিষ্কার করে বল প্রিয়!”
“প্রেমের পথে আমি বাধা সৃষ্টি করতে চাই না, কিন্তু আমি তাকে তোমার অমর প্রতিভার সহায়ক রূপে দেখতে চাই। তাই বলছিলাম আমি যদি না থাকি….”
তড়িতাহিত মতো উঠে অশ্বঘোষ প্রভাকে দৃঢ়ভাবে বুকে চেপে ধরল, তার কণ্ঠলয় হয়ে প্রভা দেখল যে, সে কাঁদছে। কিছুটা শান্ত হলে প্রভা বলল,“শোন আমার প্রেম তোমার কাছে বড় জিনিসের প্রত্যাশা রাখে, সেটা তোমাকে দিতে হবে।”
