আমি জানতাম আমার ছাদের ঘরে এসে পড়তে বললে টুম্পা আসতে পারবে না। আমাদের এই মধ্যবিত্ত পাড়ায় সন্ধ্যের অন্ধকারে একলা কোনো মেয়েকে কোন মা ছাড়বে একটা ছেলের কাছে পড়া বুঝতে? আর যতই হালফ্যাশানি হোন না কেন টুম্পার মা, তিনি বেশ ভালোই জানেন, তাঁর মেয়ে সুন্দরী, উঠতি বয়স আর আমার ইংরেজি বিদ্যার ওপর ওর দুর্বলতা আছে। ইংরেজিতে ভালো হলে আমাদের পাড়ায় সাত খুন মাফ। এ পাড়ায় যার অঙ্কের মাথা সব থেকে বেশি সেই নির্মলেন্দুকে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। কিন্তু ইংরেজিতে কেরামতি থাকলেই হল, মাঝে মাঝে আমি যখন মার্লিনের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা কই টুম্পার মা, গজার বাবা, তিলকের কাকা দিব্যি পাশে দাঁড়িয়ে মাথা হেলিয়ে শোনেন। একদিন তো তিলকের কাকা বলেই দিলেন, বাঃ বেশ বলছ তো ইংরেজি। হবে না? তোমার বাবা ইংরেজিকে তো মাতৃভাষাই করে ফেলেছিলেন। কী দারুণ প্লিড করতেন কোর্টে দাঁড়িয়ে। সে সব শোনা আছে। তুমি নিশ্চয় বাবার ওকালতির লাইনে যাবে? আমি হ্যাঁ, না কিছু না বলে সরে এসেছিলাম।
তবু টুম্পা বলেছিল বলেই কি না জানি না। গত তিন-চার দিন আমি পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ওয়েন আর ওয়াল্টার ডি লা মেয়ারের কবিতা দুটো পড়ি। সন্ধ্যের অন্ধকারে একলা বসে যখন ওয়েনের ‘স্ট্রেঞ্জ মিটিং’ থেকে পড়ি :
I am the enemy you killed; my friend
I knew you in this dark; for so you frowned.
Yesterday through me as you stabbed and killed
I parried, but my hands were loath and cold.
Let us sleep now………
কিংবা ডি লা মেয়ারের ‘লিসনার্স’ থেকে পড়ি—
Is there anybody there? said the Traveller
Knocking on the moonlit door
And his horse in the silence champed the grasses
Of the forest’s ferny floor.
আমার মনে হয় এক নির্জন, ভৌতিক অন্ধকারে জায়গা করে নিয়েছি আমি। আমার এই চিলেকোঠার ঘর তখন আর ঘর থাকে না। তেপান্তরের মাঠ হয়ে যায়। আমার গায়ের নোম দাঁড়িয়ে যায়, আমি মৃত্যুর পরপারে কোনো জগতের স্বাদ পাই। মনে মনে তখন ধন্যবাদ দিই টুম্পাকে এই কবিতা দুটোর কথা বলার জন্য। আমার স্বর্গত বাবা আর কাকার জগতে চলে যাই, আমি ছাদের অন্ধকারে ভর করে।
ওয়েন আর ডি লা মেয়ারই পড়ছিলাম, যখন দরজার শিকল বাজিয়ে কে আওয়াজ দিল যেন। উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি টুম্পা, হাতে বই। বললাম, কী ব্যাপার টুম্পা? এরকম সময় এখানে?
-কী করব, তুমি তো পড়াতে গেলে না।
–তোর মা জানেন?
—মা-ই তো বলল, ও আসবে না। তুই পড়াটা দেখে নিয়ে আয়। বললাম, ভেতরে আয়। ও ভেতরে ঢুকে আমার ঘরটা চোখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। তারপর বলল, বেশ ঘর তোমার। ভূতের কবিতা পড়ার পক্ষে আইডিয়াল।
আমি ভেতরের আড়ষ্ট ভাবটা কাটানোর জন্য বললাম, ওসব ছাড়, বই খোল।
টুম্পা আমার ডি লা মেয়ারের কবিতার খোলা পাতাটার দিকে চোখ ফেলে বলল, আমি কী খুলব? তুমিই তো খুলে বসে আছ।
আমি হেসে বললাম, তা পড়াতে গেলে নিজেকে একটু তৈরি হয়ে নিতে হয় না?
এবার টুম্পার হাসির পালা। বলল, তাহলে তুমি জানতে আমি আসব? আমি বললাম, হ্যাঁ। ও জিজ্ঞেস করল, কী করে?
বললাম, সে তুই বুঝবি না। ও খেপে উঠল, কেন আমি কি কচি মেয়ে নাকি?
এবার আমি ধমক দিলাম, তুই পড়বি, না, এইসব বাজে বকবি?
টুম্পা তাড়াতাড়ি বই খুলে ফেলল। তারপর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, না তুমি দেখছি ভালো মাস্টারমশাই হবে।
আমি ফের গর্জালাম, আবার।
আর তক্ষুনি ‘লিসনার্স’ এর শেষ দুটো লাইন মুখস্ত আউড়ে আমাকে স্তম্ভিত করে দিল টুম্পা–
‘Tell them I came, and no one answered.
That I kept my word,’ he said.
কথাগুলো আউড়ে মুখ নীচু করে টুম্পা বসে রইল আমার পড়ানো শুনবে বলে। আর আমার মগজের মধ্যে সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। শেষে কোনো মতে বললাম, হঠাৎ এই লাইনদুটো মুখস্থ বলার মানে কী? মুখ না তুলে টুম্পা বলল, সে তুমি বুঝবে না। তুমি পড়াও বরং।
আমি এবার সরাসরি কবিতায় চলে এলাম। বললাম, কবিতার পরিবেশটাই আসল। পরিবেশটাই কবিতা। ধ্বনির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা নিস্তব্ধতার কবিতা। চাঁদের আলোয় মায়াবী মূৰ্ছনায় ধরা এক অশরীরী জগৎ। সে জগতেরই দোরগড়ায় দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছে কবিতার নায়ক, পর্যটক। মানুষের জগতের এক প্রতিনিধি সে, সংলাপ তৈরি করতে চাইছে জীবনের ওপারের নীরব শ্রোতাদের সঙ্গে…।
হঠাৎ একটা গান বেজে উঠল কাছেই, আর আমাদের নীরব পরিবেশে অশরীরীদের আহ্বানে ছেদ পড়ল। ঘরের পেছনের জানালা দিয়ে দেখি রেডিওগ্রামে এলভিস প্রেসলির গান চালিয়ে নাচ প্র্যাক্টিস করছে আমার আর এক নায়িকা লোরেন সুইন্টন।
চমকে উঠেছিল টুম্পাও। মুখের সামনে থেকে বই নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ওটা কী শুরু হল নীতুদা? আমি সংক্ষেপে উত্তর করলাম, ক্যাবারে নাচের রিহার্সাল।
ও জিজ্ঞেস করল, কে নাচছে?
বললাম, লোরেন সুইন্টন।
ও বিস্ময়ের সুরে বলল, ওই সুন্দরী অ্যাংলো ইণ্ডিয়ানটা? যার মা ক্যাবারে নাচে?
বললাম, সবই তো জানিস দেখছি। তাহলে জিজ্ঞেস করছিস কেন?
ও আমার পাশে সরে এসে জানলার বাইরে চোখ মেলল, আমি একটু দেখি নীতুদা।
আমি ঝাঁজিয়ে বললাম, তুই কি এই করতেই এসেছিস তাহলে? পড়বিটা কখন?
