নির্ঘাৎ ওঁর এবার ভীমরতি ধরেছে। অগত্যা উঠে দাঁড়িয়ে বললুম–আপনার কিঞ্চিৎ ভোলা বাতাস সেবন করা দরকার। টুপি খুলে টাক বিকশিত করে, হে প্রাজ্ঞ ঘুঘুমশায়, নদীর ধারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন। ঘিলুর ধুলোময়লা সাফ হয়ে। যাবে। আসুন।
কর্নেলও উঠে দাঁড়ালেন, তখুনি সায় দিয়ে বললেন–ঠিকই বলেছ ডার্লিং। এর চেয়ে আপাতত আরামদায়ক কিছু নেই। ওঃ, এই ঘরে যেন আমার দম আটকে আসছে।
.
সেই যে বেরুলুম দুজনে, পুরো দুপুর কেটে গেল জঙ্গলে-জঙ্গলে। কর্নেলকে স্বাভাবিক দেখে আশ্বস্ত হয়েছিলুম। কাঁধে কিটব্যাগ নিয়েছিলেন। তার মধ্যেese প্রজাপতি ধরা জাল আর ভাজকরা খাঁচাও ছিল। আড়াইটে অব্দি সাতটা প্রজাপতি ধরলেন উনি। পাখির পিছনেও বাইনোকুলার চোখে নিয়ে ছোটাছুটি করলেন। আমার অবস্থা তখন শোচনীয়। অবশেষে কর্নেলের দৃষ্টি ঘড়ির কাঁটার দিকে আনা গেল এবং দুজনে গলদঘর্ম হয়ে ফেরার পথে পা বাড়ালুম। ..
কিন্তু নদীর ধারে এসে হঠাৎ কর্নেল বললেন–জয়ন্ত, মনে হচ্ছে আমরা ফরেস্ট বাংলোর কাছে এসে পড়েছি। একবার অন্তত মিঃ চাকলাদারের সঙ্গে দেখা করা উচিত। কী বলে?
বিরক্ত হয়ে বললুম–লাঞ্চের সময় চলে গেল যে। তাছাড়া উনি এখানে, আছেন, না জঙ্গলে ঘুরছেন–ঠিক নেই!
কর্নেল আমার হাত ধরে সস্নেহে টানলেন। –ডার্লিং, এটা ভদ্রতা। জঙ্গলে আছি কিন্তু আমরা মানুষ।
বলে উনি যেন বীরবিক্রমে হাঁটা শুরু করলেন। একটু পরেই টের পেলুম, এ যাওয়া স্বাভাবিক গতিতে নয়। তাড়া খাওয়া জন্তুর মতো ঝোপঝাড় ভেঙে আগাছা মাড়িয়ে যেন আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যাওয়া। কয়েকবার ওঁর টুপি কাঁটায় আটকে গেল। দ্রুত ছড়িয়ে নিলেন। আমিও প্রায় ক্ষতবিক্ষত হলুম। তারপর হঠাৎ কর্নেল আমাকে টেনে ধরে বসিয়ে দিলেন এবং নিজেও বসলেন। ঝোপের আড়াল ছিল। তার ওধারে ফরেস্ট বাংলোটা দেখা যাচ্ছিল। নদীর এপারেই একটা টিলার গায়ে রয়েছে সেটা। তারপর দেখলুম, কর্নেল বাইনোকুলার দিয়ে বাংলোটা দেখছেন। আমি অবাক এবং অস্থির।
একটু পরে ঘুরে কর্নেল চাপা গলায় বললেন–এক মিনিট, জয়ন্ত। তুমি এখানে অপেক্ষা করো, আমি এখুনি আসছি। সাবধানে, যেভাবে বসে আছ, তাই থাকবে। নড়ো না।
কোনও প্রশ্নের সুযোগ না দিয়ে উনি গুঁড়ি মেরে এগোলেন। ওঁর ভঙ্গি দেখে, মনে হলো, একটা ক্ষুধার্ত সিংহ যেন চুপিসারে তার শিকারের দিকে এগিয়ে চলেছে। একটু পরেই ওঁকে গাছপালা ও ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হতে দেখলুম। এই অদ্ভুত কাণ্ডের মাথামুণ্ডু না খুঁজে পেয়ে অগত্যা হাল ছেড়ে দিতে হলো। ঝোপের ফাঁকে দুরের ওই বাংলোর দিকে চোখ রইল আমার।
কিন্তু বাংলো যেমন নির্জন ছিল তেমনিই আছে। জনপ্রাণীটি নেই। পনের মিনিট কেটে গেল। তারপর সামনের দিকে শুকনো পাতা মচমচ করে উঠল। শব্দটা এগিয়ে আসতে থাকল। রাইফেলটা সঙ্গে নিয়ে বেরোয়নি। তাই অসহায় হয়ে আশা করতে থাকলুম যে, ওই শব্দ যেন কর্নেলেরই হয়। শেষ অব্দি আশা মিটল। আন্দাজ দশ গজ দূর থেকে কর্নেলের টুপি চোখে পড়ল। ওঁর মুখে অমায়িক হাসি। কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন–যে পথে এসেছি সেই পথে এই ভাবেই ফিরতে হবে, জয়ন্ত। সাবধান।
অতএব ফের সেইসব কাঁটায় খোঁচা খেতে খেতে আগের জায়গায় পৌঁছানো গেল এবং এবার উনি চড়া গলায় জঙ্গলের সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে করতে সুপথে পা বাড়ালেন।
বিজয়ের বাংলোর কাছে পৌঁছে এতক্ষণে বললুম–এসবের মানে কী?
কর্নেল আমার হাত টেনে নিয়ে বললেন-অধৈর্য হয়ো না। ঠিক মতো সব কিছু চললে তুমি এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারবে। জয়ন্ত, এটা আমার দূরদৃষ্টি বলতে পারো। যেখানে যাই, এক মারাত্মক আততায়ী আমার সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে এগিয়ে আসে। না, না, ডার্লিং। তুমি ভয় পেয়ো না। আশা করি, খুব বেশি কিছু ঘটবে না।
অস্থিরতা চেপে রাখতে হলো। আর তখন খিদেয় নাড়িভুঁড়ি জ্বলছে।
.
সেদিন সন্ধ্যায় বিজয়ের সেই ঘরে আবার আজ্ঞা চলেছে। তবে এ-বেলা সেই ব্যবসায়ী ভদ্রলোক, অর্থাৎ নরেন্দ্র সিংহরায় আসেননি। শিকারী বা ম্যানেজারও না। আমি, কর্নেল ও রায়দম্পতি গল্প করছি। গল্প করার সময় কর্নেলের অন্যমনস্কতা লক্ষ করছিলুম। মাঝেমাঝে ঘড়ি দেখছেন আড়চোখে। কে যেন আসবে, প্রতীক্ষা করছেন। কে সে?
পাশের ঘরে নিনা ইংরেজি ছড়া মুখস্থ করছে, শোনা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে আবার কথাও বলছিল। বাইরে তখন ফুটফুটে শরঙ্কালীন জ্যোৎস্না।
কর্নেলের চঞ্চলতা এবার বিজয়ের চোখে পড়ল। বললেন কর্নেলের কি। শরীর খারাপ করছে?
কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন–ও নো নো! আমি–ইয়ে মিঃ রায়, ভাবছি যে আজ রাতটা বরং ফরেস্ট বাংলোয় গিয়ে কাটাব। ভারি চমৎকার জ্যোৎস্না ফুটেছে। তাছাড়া আজ দুপুরে জায়গাটা দেখে এসেছি–অপূর্ব। আপনি যদি কিছু না মনে করেন
বিজয়েন্দু বললেন, না। মনে করার কি আছে?
চন্দ্রকণা বললেন কিন্তু এক শর্তে। এখানে ডিনারে না খেয়ে নয়।
কর্নেল বেজার মুখে বললেন–প্লিজ মিসেস রায়। আপনার রাঁধুনীকে কিন্তু আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছি। সে আপনাকে কিছু বলে নি?
চন্দ্রকণা ক্ষুব্ধমুখে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন-কই না তো। তারপর ভেতরে চলে গেলেন। হয়তো রাঁধুনীকে ধমক দিতেই গেলেন।
বিজয়েন্দু একটু হেসে বললেন–তাহলে যা ভেবেছি। শরীর খারাপ। মুশকিল– কী জানেন, এ জায়গাটা একটা বিউটি স্পষ্ট। কিন্তু জলবায়ুটা তেমন ভাল নয়। আমারও মাঝে মাঝে পেটের অসুখ হয়।
