কর্নেল বললেন, আছে। তুমি তৈরি থেক–আগামীকাল সকাল নটায় ট্রেন।
.
০২.
ভৈরবগড় বর্ধমানের সীমান্তে খনি অঞ্চলের একটি বনেদী জনপদ। গ্রাম-শহরের অদ্ভুত সংমিশ্রণ। চারদিকে অসমতল রুক্ষ মাটির বিস্তার। গাছপালা স্বভাবত কম। এদিকে ওদিকে কিছু পোড়ো এবং চালুখনি রয়েছে। বেশির ভাগই কয়লাখনি, কয়েকটা অভ্র খনিও আছে। তবে ভৈরবগড়ের উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তিও কম নয়। বিশেষ করে পাঁচশো বছরের বাবা ভৈরবের বিশাল মন্দিরটা।
ট্রেনে যেতে যেতে গোয়েন্দাপ্রবর আমাকে ভৈরবগড়ের ভূপ্রকৃতির এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে বললেন, আজ ১১ মার্চ মঙ্গলবার। গত ৭ মার্চ শুক্রবার সকালে ভৈরবমন্দিরের চত্বরে মহেশ্বর ত্রিপাঠী নামে এক ব্যবসায়ীর লাশ পাওয়া যায়। মহেশ্বরবাবু নির্বিরোধ মানুষ ছিলেন। স্থানীয় অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে প্রচুর টাকাকড়ি সাহায্য করতেন। কাজেই তার জনপ্রিয়তাও ছিল। এমন মানুষকে কেউ খুন করবে, ভাবা যায় না। রাত্রিবেলা মন্দিরেই বা কেন তিনি গিয়েছিলেন, পুলিস তদন্ত করে প্রথমে জানতে পারেনি। পরে জেনেছে ৬ মার্চ বৃহস্পতিবার এক তান্ত্রিক সাধুবাবা, নাকি তার বাড়ি গিয়েছিলেন। কিন্তু তন্নতন্ন খুঁজে সেই সাধুবাবার পাত্তা আর মেলেনি।
জিজ্ঞেস করলাম, খুন করা হয়েছিল কীভাবে?
মহেশবাবুর পিঠের দিকে হার্টের পেছনে সমান ব্যবধানে তিনটি গভীর ক্ষতচিহ্ন ছিল। সম্ভবত বসে থাকা অবস্থায় অতর্কিতে তাকে পেছন থেকে আঘাত করা হয়। কর্নেল ট্রেনের জানালার দিকে চোখ রেখে বললেন, পরবর্তী হত্যাকাণ্ড ঘটে ঠিক পরদিনই–শনিবার। একই জায়গায় একই অবস্থায় পাওয়া যায় নবারুণ ভদ্র নামে একজন রিটায়ার্ড খনি-ইঞ্জিনীয়ারের লাশ। এক্ষেত্রেও আগের দিন নবারুণবাবুর কোয়ার্টারে সেই সাধুবাবা এসেছিলেন। কিছুক্ষণ গোপনে দুজনের মধ্যে নাকি কী কথাবার্তা হয়নবারুণবাবুর স্ত্রীর কাছে পুলিশ এটুকু জানতে পেরেছে। সাধুবাবাকে যে মহেশ্বরবাবুর খুনের ব্যাপারে পুলিশ খুঁজছে, নবারুণবাবুর স্ত্রী বা নবারুণবাবুও তা জানতেন না। বাড়িতে ওই সময় আর কেউ ছিল না। এর পর যেটুকু জানা গেছে, তা হল : দুজনেই আসছি বলে বাড়ি থেকে আন্দাজ সন্ধ্যা সাতটায় বেরিয়ে যান। আর ফেরেন নি।
কর্নেল চুপ করলে বললাম, তন্ত্রসাধনায় নরবলির কথা শুনেছি। এ তো দেখছি তাই।
গতকাল বর্ধমানের পুলিসসুপারের ট্রাঙ্ককল পেলাম–তখন সবে নেপাল যাত্রার জন্য তৈরি হচ্ছি। ভৈরবমন্দিরের একই জায়গায় একই ভাবে পাওয়া গেছে। ভবেশ মজুমদার নামে আর একজন ব্যবসায়ীর লাশ। বসে থাকা অবস্থায় খুন। পিঠে তিনটি গভীর ক্ষতচিহ্ন। এবারও জানা গেছে, আগের দিন এক সাধুবাবা এসেছিলেন ভবেশবাবুর কাছে। তিনিও আসছি বলে সন্ধ্যা ছটায় বেরিয়ে যান। এবারও ভবেশবাবু বা কেউ জানতেন না, সাধুবাবাকে পুলিস খুঁজছে। তাই গতকাল সঙ্গে সঙ্গে পুলিস তেঁড়রা পিটিয়ে ঘোষণা করেছে, ঢ্যাঙা, রোগা গড়নের কোনও লাল কৌপিন ও জটাধারী সাধুবাবাকে দেখলেই যেন জনসাধারণ পুলিশে খবর দেন। বলার দরকার নেই, এলাকার সব সাধু গা-ঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ জনতার হাতে প্রচণ্ড মারধরও খেয়েছেন। কিন্তু পুলিশ যাকে খুঁজছে, তাঁরা কেউই তিনি নন। নিহতদের বাড়ির লোকের সাক্ষ্যে সেটা বোঝা গেছে। তবু ভুল হতেও তো পারে। জনাতিনেক সাধু ভৈরবগড় হাসপাতালে এখন আহত অবস্থায় রয়েছেন। আজ দুপুরে ফের এসপি ট্রাঙ্ককল করে এসব কথা জানিয়েছেন।
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে গম্ভীর মুখে টানতে থাকলেন। বললাম, পুলিস ঢেঁড়রা পিটিয়ে ভুল করেছে।
তুমি ঠিকই বলেছ, জয়ন্ত। কর্নেল একটু হাসলেন। পুলিস অনেক সময় একটু বেশি উৎসাহ দেখিয়ে বসে। তবে এই তিনটি অদ্ভুত হত্যাকাণ্ডের আরও একটি অদ্ভুত ধরনের কমন ব্যাপার আছে। সেটা পরে লোকের চোখে পড়েছে। ভৈরবমন্দিরের, চূড়ায় অন্তত পঁচিশ-তিরিশ ফুট উঁচুতে একটা ত্রিশূল আছে। প্রতিবার হত্যাকাণ্ডের পর সেই ত্রিশুলের গায়ে রক্ত দেখা যাচ্ছে কয়েকপোঁচ। জ্বলজ্বলে টাটকা রক্ত। কাছের একটা খনি থেকে ফায়ারব্রিগেড আনিয়ে পুলিশ ত্রিশূলের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে কলকাতায় বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠিয়েছে। মানুষের রক্ত হলে সত্যি বড় রহস্যময় ঘটনা বলতে হয়। এত উঁচুতে কেউ উঠে রক্ত মাখিয়ে আসবে, এ তো অসম্ভব! মোচার আকৃতি মন্দিরচূড়া পাথরে তৈরি এবং ভীষণ পিছল। অত উঁচু মই কার আছে?
কর্নেল! তাহলে বেশ বোঝা যাচ্ছে, হত্যার অস্ত্র ত্রিশূল ছাড়া কিছু নয়। তিনটে সমান ব্যবধানে ক্ষতচিহ্ন, একমাত্র ত্রিশূলই সৃষ্টি করতে পারে।
ঠিক ঠিক। বলে কর্নেল ঘাড় নাড়লেন। তারপর গলায় ঝুলন্ত বাইনোকুলার চোখে রেখে টেলিগ্রাফের তারে পাখি দেখতে থাকলেন। পাখিটা দ্রুত পিছিয়ে পড়ল। তখন উনি জানালায় ঝুঁকে গেলেন। পাখি দেখলেই আমার এই বাতিকগ্রস্ত বন্ধুটির ঘিলু যেন গলে যায়। জ্ঞানগম্যি আর থাকে না।….
সরকারী বাংলোটা ভৈরবগড়ের শেষপ্রান্তে! দক্ষিণে সামান্য দূরে জি.টিবোড়। পূর্বদিকে বেশ কিছুটা দূরে ভৈরবমন্দিরের চূড়া দেখা যাচ্ছিল। বিকেলে পৌঁছে খাওয়া-দাওয়ার পর লনে বসেছিলাম। আমার বৃদ্ধ বন্ধু হঠাৎ উঠে গেলেন। তারপর বরাবর যা দেখেছি, তাই দেখতে পেলাম। চোখে বাইনোকুলার রেখে উনি পূর্বের অনাবাদী মাঠে হনহন করে হেঁটে চলেছেন। ওঁর লক্ষ্যবস্তু পাখি যদি হয়, তাহলে সে-পাখি কোনও গাছের নয়। কারণ ওদিকে কোনও গাছই নেই। একটু পরে একটা ঢিবির আড়ালে ওঁর ধূসর রঙের টুপিটা অদৃশ্য হলে ঘরে ঢুকে সটান শুয়ে পড়লাম। ট্রেনজার্নির ক্লান্তি ছিল।
