শমীক প্রণতির পিসতুতো দাদা-টাদা নয়, পুরনো প্রেমিক। নীতিশ ব্যাপারটা একটু আধটু আঁচ করেছিল। কিন্তু বিশেষ গা করত না। ডমরুনাথে পৌঁছে দিতে এসেছিল শমীক, প্রণতির অনুরোধেই। প্রণতি তাকে কথায় কথায় সোনার ডমরুর। কথাও বলেছিল।
এখানে পৌঁছনোর পর প্রেমিক শমীক তার পুরনো প্রেমিকাকে স্বামীর কাছে যাবার আগে এই একটা রাত প্রচণ্ডভাবে কাছে পেতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রণতি বেঁকে বসে। শমীকের সঙ্গে একঘরে রাত কাটাতে রাজি নয়। অথচ উপায় ছিল না। বৃষ্টি পড়ছিল। অমন দুর্যোগে সারাঙ যাবে কীভাবে? তাই এই বাংলোয় আশ্রয় নিতেই হয়েছিল শেষপর্যন্ত। তারপর শমীক প্রেমনিবেদন শুরু করে। প্রণতি বাধা দেয়। ঝগড়াঝাটি শুরু হয়। তখন শমীক ক্ষেপে গিয়ে বলে, তোমার স্বামী চোর। বাবা ডমরুনাথের সোনার ডমরু চুরি করেছে। ওকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেব।
সম্ভবত বদ্রী আড়ি পেতে ব্যাপারটা শুনেছিল। এই হলো প্রণতির জবানবন্দী।
ঝগড়াঝাঁটি চরমে উঠলে শমীক রাগ করে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে যায়। তারপর একটা কিছু ঘটেছিল। ওই সময় বদ্রী তাকে নিজের ঘরে স্বচ্ছন্দে খুন করে। কেনই বা খুন করল, কেন শমীক তার ঘরে গেল–এখনও বোঝা যাচ্ছে না। বদ্রীর জবানবন্দী আদায় করলে বোঝা যাবে।
ওদিকে নীতিশই বা ঝর্ণার ধারে খুন হলো কেন, তাও বোঝা যাচ্ছে না।
কর্নেল প্রাতঃভ্রমণে গিয়ে তার লাশ দেখতে পান। লাশটা খুনী পুঁতে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তার প্রমাণ ওই অসমাপ্ত গর্ত। কর্নেল গিয়ে পড়ায় সে পালিয়ে যায়। কর্নেল ঘুরতে ঘুরতে একটু তফাতে স্বচ্ছ জলের মধ্যে সোনার ডমরুটা আবিষ্কার করেন। বোঝা যায়, নীতিশের হাতে ওটা ছিল এবং খুনী তার ওপর হামলা করার সময় ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। খুনী আর ওটা খুঁজে পায়নি–অথবা খোঁজার সময়ও পায়নি।
কেন নীতিশ ডমরুটা নিয়ে এত ভোরে ওখানে এসেছিল?
আমার প্রশ্ন শুনে পুলিশ অফিসার বললেন, বদ্রীর জবানবন্দী না আদায় করলে অনুমান করা যাচ্ছে না কিছু। তাছাড়া সারাঙে এখনও তদন্ত করছেন আমাদের অফিসার।
বললুম– আমি প্রণতি ও শমীকের ঝগড়া শুনেছিলুম। শমীক বলছিল, তুমি নিজেই এজন্যে দায়ী…
কর্নেল পকেট থেকে চকপাথর বের করছেন দেখে থেমে গেলুম। কর্নেল লিখলেন টেবিলে : ওটা পুরনো কথা তুলে প্রেমিক-প্রেমিকার কলহ। অর্থাৎ প্রণতি নিজেই নীতিশের সঙ্গে বিয়ের জন্যে দায়ি। ওসব কথার সঙ্গে এ ঘটনার সম্পর্ক নেই।
পুলিশ অফিসাররা উঠে দাঁড়ালেন। তারপর কর্নেল ও আমাকে বিদায় সম্ভাষণ করে চলে গেলেন।
বললুম– আপনার স্বরভঙ্গের আর সময় ছিল না? কেলেংকারি বটে!
কর্নেল করুণমুখে হাসলেন শুধু।…
.
০৫.
ঘুম ভেঙে গেল অতি পরিচিত কণ্ঠস্বরে-সুপ্রভাত ডার্লিং। আশা করি, সুনিদ্রা হয়েছে? শুনে লাফিয়ে উঠে বসলুম। বাইরে সোনালী রোদ ঝলমল করছে। আমার বৃদ্ধ বন্ধু খাটের পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন।
চেঁচিয়ে উঠলুম, স্বরভঙ্গ সেরে গেছে আপনার?
কর্নেল মধুর হেসে বললে, প্রাচীন আয়ুর্বেদকে অবহেলা কোরো না বস? যষ্ঠীমধু এবং নানাপ্রকার শেকড়বাকড় সহযোগে প্রস্তুত ওই রক্তবর্ণ বটিকাগুলি আমাকে এক কবিরাজ উপহার দিয়েছিলেন। এতকাল ব্যবহারের সুযোগ পাইনি। পেয়ে ব্যবহার করে দেখলুম, অতি অব্যর্থ। কাশি তো তখনই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে স্বরভঙ্গও সেরে গেল। যাই হোক, ওঠো। চলো, আমরা নিচে রাস্তার ধারে খাবারের দোকানে গিয়ে গরম গরম কচুরি এবং চা সেবন করি গে! বদ্রী নেই–অতএব একটু কষ্ট করতেই হবে।
ঝটপট বাথরুম সেরে এসে দেখি, ঘুঘুমশাই তাঁর প্রজাপতি ধরা জাল, অত্যদ্ভুত ক্যামেরা, বাইনোকুলার ইত্যাদি কাঁধে ঝুলিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
দরজায় তালা এঁটে বেরিয়ে গেলুম দুজনে। টিলা থেকে ঢালু পিচের রাস্তায় নামতে নামতে বললুম– থানায় যাবেন না?
না ডার্লিং। আমার খাওয়াটা সেরে নিয়ে জঙ্গলের দিকে যাব।
বদ্রীর জবানবন্দীটা শোনার ইচ্ছে ছিল যে!
কর্নেল আমার একটা হাত ধরে বললেন, কী দরকার? সেটা তুমি আমার মুখেই শুনতে পারো।
আপনি জানেন সব?
আঁচ করেছিলুম কী ঘটতে পারে। কিন্তু স্বরভঙ্গ হয়ে গিয়ে অনিবার্য বিপদকে ঠেকাতে পারিনি।
আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলুম। বলেন কী!
কর্নেল আমাকে টানতে টানতে বললেন, আভাস পেয়েছিলুম। এ আমার এক সহজাত বোধ বলতে পারো। বদ্রীর হাবভাবে খুনীর আদর্শ ক্রমশ ফুটে উঠছিল। সেটাই প্রথমে আমার চোখে পড়ে। তাছাড়া সোনার ডমরু চুরির ঘটনা আগেই কলকাতায় থাকতে কাগজে পড়েছিলুম। খবরের কাগজের লোক হয়েও তুমি ব্যাপারটা জানো না, এতে আমার বিস্ময় নেই। কারণ ময়রার সন্দেশে রুচি থাকে না।
হাসতে হাসতে বললুম– ঠিক বলেছেন। তারপর?
কর্নেল মৃদুস্বরে বললেন, বদ্রীর মধ্যে আমার চির পরিচিত খুনীর আদর্শ আবিষ্কার করার পর তার দিকে নজর রাখা উচিত মনে হয়েছিল। তবে রাতে বদ্রী যখন খানা আনল, তখন তুমি একটা চিৎকার শুনেছিলে। ওটা শমীকের আর্তনাদ হতে পারে না। হিমালয়ের ভালুকের চিৎকার। বৃষ্টির রাতে বিরক্ত হয়ে ওরা চেঁচামেচি করে। যাই হোক, শমীক প্রণতির সঙ্গে ঝগড়া করে বেরিয়ে গিয়ে বদ্রীর ঘরে গিয়েছিল রাত কাটাতে। বৃষ্টির মধ্যে যাবে কোথায় বেচারা? বদ্রী তাকে নিজের বিছানায় শুতে দেয়। খুব ভোরে আমি যখন বেরুচ্ছি, তখন বদ্রীর ওপর নজর রাখতে গিয়ে উঁকি মেরে তার ঘরে শমীককে দেখি। গেটের কাছে গিয়ে বদ্রীকে খুঁজছি, চোখ পড়ল সে হনহন করে সারাঙয়ের রাস্তায় চলেছে। তখন কিছু বুঝিনি। আমার ইচ্ছে ছিল ঝর্ণার ধারে জঙ্গলে গিয়ে প্রজাপতি ধরব গোটাকতক।
