জালাল সব অর্থেই পরম্পরাগত টিপিকাল পথের ফকির। গানের সহযোগী বাদ্য-আয়োজন কিংবা গান গাওয়ার সময়কার পোশাক-পরিচ্ছদে কোনও মৌলিকতা নেই। ব্যবহার্য সামগ্রীও ধারাগত— সেই কিস্তি, ঝোলা, আসা। চুল রাখাটা ফকিরদের ‘ধর্ম’ নয়, যেমন ভেবেছেন জালাল, এটাও বহুদিনের অভ্যস্ত বিষয়।
জালাল শাহ-র কথা—৭
বাউলদের মতো ফকিররা চারচন্দ্রে সাধনা করে না। খায় না। ফকিররা ওকে কন্ট্রোল করতে পারে। প্রস্রাব পায়খানা ফকিররা ছ’দিন-সাতদিন পর্যন্ত কন্ট্রোল করতে পারে। সাধনায় বসেছি। যতক্ষণ সাধনা শেষ না-হচ্ছে উঠছি না, ততক্ষণ ওকে কন্ট্রোল করা যাবে।…খাওয়া বন্ধ থাকে—হয়তো খালি জলই খেলাম, বা চা হল তো খেয়ে নিলাম। হাল্কা রাখতে হবে খাবার, তা হলে ওগুলো সব কন্ট্রোল থাকবে। ফকিরদের কাছে এই খাওয়া-দাওয়া কন্ট্রোল করাটা কোনও ব্যাপার নয়। আগে আমি গাঁজা-টাজা খুব খেতাম—পনেরো ভরি, যোলো ভরি গাঁজা খেতাম—এখন খাই না, মনও চায় না।
ফকিরি সাধনায় যুগল-সাধনাও আছে, আবার নির্জনে সাধনাও আছে।.…ফকিরদের দমের সাধনা যেমন আছে, বস্তুসাধনাও আছে।…আমরা জিকিরটাকেই বেশি গুরুত্ব দিই—জিকির করা মানেই শ্বাসকে কন্ট্রোল করা। দমের জিকির সব সময়েই হচ্ছে। দমে জিকিরের মানেই হচ্ছে— সে দমে আসে, দমে যায়। এই দমের তো কোনও ভরসা নাই। … নিশ্বাসকে বিশ্বাস নাই। নিশ্বাসকে আজও পর্যন্ত কেউ ধরে রাখতে পারল না।— বহুত জপ-তপ তপস্যা করেও।
আল্লাকে সম্পূর্ণ জানাও যাবে না। শেষ নাই। যুগে যুগে সাধকেরা আসবেন—তারা আরও জানাবেন—শেষ হবে না। শেষ যেদিন হবে—সেদিন তো রোজ কেয়ামত হবে।
আমার মন্তব্য
ফকিররা চারচন্দ্রের সাধনা করেন না, খবরটি ঠিক নয়। আমি এমন অনেক ফকির দেখেছি। মজার কথা যে, জালাল নিজেই পরে বলেছেন ফকিরদের ‘বস্তুসাধনাও আছে’। বস্তু শব্দের তাৎপর্য আমরা জানি। সেটাই তো রসরতির সাধনা।
তবে খাদ্য সংযম বা প্রস্রাব দমন যে ফকিরি সাধনার বিশেষ লক্ষণ তা আমরা জানি। দমে জিকিরের পদ্ধতি এঁদের সাধারণ করণকৌশল। ফকিরের গাঁজা বিষয়ে তীব্র আসক্তি ও পরবর্তী অনীহা বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ স্বীকারোক্তি।
জালাল শাহ-র বাচনিক কৌশল খুব সুন্দর ও সুবিন্যস্ত। ‘নিশ্বাসকে বিশ্বাস নাই’ বাক্যবন্ধটি চমৎকার। ‘আল্লাকে সম্পূর্ণ জানা যাবে না’ ফকিরদের পরম উপলব্ধি। আবু তাহের ফকির আমাকে বলেছিলেন, ‘তাঁকে জানা যায় না, এই জানাটাই সবচেয়ে বড় জানা।’
.৮ ফকিরের আত্মকথা
এই বিশাল ভারতবর্ষের এক কোণে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙ্গা থানার অন্তর্গত কাপাসডাঙ্গা গ্রামে এক ভিজে স্যাঁতসেঁতে গলিতে হাজরা পরিবারে দারিদ্র্যের ব্যথা নিয়ে ১৩৬৪ সালের কার্তিক মাসের ২৩ তারিখে ভোর ৩-১৫ মিনিটে জন্মগ্রহণ করেছিলাম। বাবার নাম অক্ষয়নাথ হাজরা, মায়ের নাম লক্ষ্মীবালা হাজরা। জন্ম থেকেই অভাব আর অনটনের মধ্যে দুঃখকে বরণ করে নিয়ে, কখনও খেয়ে কখনও না খেয়ে কেটেছে ছেলেবেলার দিনগুলি। চার বছর বয়সে হাতে খড়ি নিয়েই শুরু হয় গ্রামে প্রাইমারি স্কুল জীবন। প্রতি বছর ক্লাস উত্তীর্ণ হয়ে এগিয়ে চললাম অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। এরই ফাঁকে পেলাম পাঁচ/ছ’জন ভাই-বোন। ছোট ভাই বোনদের সঙ্গে পেয়ে যেন অভাবের দড়ি আরও গলায় ফাঁসির মত টুঁটি টিপে ধরেছিল। তাই তো সংসারের প্রয়োজনে বিড়ি শ্রমিকের কাজ শুরু করি। তারপর এভাবে কেটে চলল আঠেরো বছরের জীবন।
উনিশে পা দিতেই বাবা মায়ের মনে আকাঙ্ক্ষা জাগলো বউমায়ের মুখ দেখবার। এ জন্যই মায়ের দূর সম্পর্কের দাদার মেয়ের সঙ্গে আমার প্রথম বিবাহ হল। খুবই অল্পবয়স্ক মেয়ে। আঠারো মাস সংসার-ধর্ম পালন করে ন’মাস গর্ভবতী অবস্থায় একলেম্শিয়া রোগে বহরমপুর সদর মাতৃসদন হাসপাতালে সে মারা যায়। এর পর শ্রাদ্ধক্রিয়া সেরে মনের উপর এক ব্যথাভরা চাপ পড়ল। সারাক্ষণ উদাস আর সাথিহারা জীবন নিয়ে পূর্বস্মৃতিভার বুকে নিয়ে এক ত্যাগের ভাব মনে উদয় হল। রাতদিন শুধু রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম। হঠাৎ একদিন বিকালবেলায় দেখা আমাদের গ্রামেই বাড়ি উস্তাদ জাফরউদ্দিনের সঙ্গে যিনি নকসবন্দিয়া তরিকায় মুরিদ হয়ে কালবী জিকিরে যথেষ্ট মশগুল থাকতেন। লেখাপড়া তাঁর জীবনে তেমন ছায়া ফেলতে পারেনি। তবে আক্ষরিক জ্ঞান বা ঐশ্বরিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে বহু কিতাব কোরান হাদিস বা হিন্দু শাস্ত্র বিষয়ক বহু বই তিনি অবসর সময়ে পড়ে নিজে বহু জ্ঞানের অধিকারী হয়েছিলেন। এই সব আধ্যাত্মিক চিন্তা ভাবনার সঙ্গে নিজে আধ্যাত্মিক গান ও গজল রচনা করতেন। কিন্তু তাঁর চিন্তাধারা বিশ্বময় প্রকাশ করার তেমন কোনও মাধ্যম হয়তো পাচ্ছিলেন না। তাই হঠাৎ আমাকে ডেকে বললেন ‘যতীন সন্ধ্যার পর আমার বাড়ি আসবি, তোর সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।’
যদিও ওঁর কথা আমার মনোমতো হচ্ছে না তবু ‘আসবো’ বলে বাড়ি ফিরে গেলাম। গ্রাম সম্পর্কে আমরা ওঁকে দাদু বলতাম। সন্ধ্যাবেলায় একটু ভেবে ওঁর সঙ্গে গেলাম দেখা করতে। গিয়ে দেখি উনি নামাজ পড়া শেষ করে তখন জায়নামাজে বসে ছবি তেলাওত করছেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘তুই এসেছিস? আমি তোকে নিয়েই ভাবছি। আয় বোস। তোর ভালর জন্যেই তোকে ডেকেছি। রাতদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াস, সংসারের কোনও কাজকর্মও করিস না তোর বাবা বলছিল। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে মনে শান্তি আসবে কোথা থেকে? মন তো লাগামবিহীন ঘোড়া, আলগা পেলেই অন্যদিকে ছুটিয়ে নিয়ে চলে যাবে। শোন্ আমি তোর জন্যে একটা চিন্তাভাবনা করেছি, আর একটা কিছু করতেই হবে তোকে।’
