সেরগেই চমকে উঠল।
এসব কী বলছ, কাতেরিনা লুভরা, আমার চোখের মণি। আমাদের অবস্থাটার দিকে একবার ভালো করে চেয়ে দেখ। তুমি এখুনি লক্ষ করেছ, আমি কীরকম আনমনা হয়ে বসে ছিলুম কিন্তু তুমি একবারও শান্ত হয়ে ভাবো না, এই আনমনা হওয়াটা আমি ঠেকাতে পারি কি না। তুমি তো জানোই না, আমার বুকের ভিতর কীরকম শক্ত শক্ত রক্তের টুকরো জমা হয়ে আছে।
তোমার কী বেদনা, সেরেজা, তোমার বেদনা আমায় বল!
এর আবার বলার কী থাকতে পারে? প্রথম দেখ অল্পদিনের মধ্যেই, ঈশ্বরের আশীর্বাদে তোমার স্বামী এসে উদয় হবেন, আর তুমি বলবে– সেরগেই ফিলেপিচ, দূর দূর বেরো এখান থেকে আর যা তুই ওই পেছনের আঙিনায়, ছোকরারা যেখানে গান-টান গাইছে। আর সেখান থেকে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখ, কাতেরিনা ভার শোবার ঘরে ছোট্ট পিদিমটি জ্বলছে, আর তিনি কীরকম পালকের তুলতুলে বিছানাটি দু-হাত দিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে জুৎসই করে তার সাতপাকের সোয়ামীর সঙ্গে শুয়ে আরাম করতে যাচ্ছেন।
অসম্ভব! ওরকমধারা কখনোই হবে না- সোল্লাসে টানা টানা সুরে কাতেরিনা কথাগুলো বলল, আর সঙ্গে সঙ্গে কচি একখানি হাত নাড়িয়ে সেরগেইয়ের কথাগুলো যেন সামনের থেকে সরিয়ে দিল।
কেন হবে না? আমি যতদূর দেখতে পাচ্ছি, এ পরিস্থিতি থেকে বেরোবার জন্যে তোমার তো কোনও পথই নেই। তা সত্ত্বেও, বুঝলে কাতেরিনা ভনা, আমারও একটা আপন হৃদয় আছে, আর নিদারুণ যন্ত্রণাটি আমি অনুভব করতে পারি।
ব্যস্ ব্যস, হয়েছে। তোমার যথেষ্ট বলা হয়ে গিয়েছে।
সেরগেইয়ের এই হিংসের অনুভূতিটা কাতেরিনাকে বড়ই আনন্দ দিল। জোরে হেসে উঠে সে ফের সেরগেইকে চুমোর পর চুমো খেতে লাগল।
অতি সাবধানে কাতেরিনার সম্পূর্ণ অনাচ্ছাদিত বাহুপাশ থেকে নিজের মস্তকটি মুক্ত করতে করতে সেরগেই কথার খেই ধরে বলে যেতে লাগল, দ্বিতীয়ত, সমাজে আমার যে হীনতম অবস্থা সেটাই আমাকে বহুবার বাধ্য করেছে ব্যাপারটা সবদিক দিয়ে বিবেচনা করতে। এই মনে কর, আমি যদি সমাজে, তোমার ধাপের মানুষ হতুম, আমি যদি ভদ্রলোক বা ব্যবসায়ী হতুম, তা হলে এ দেহে যতক্ষণ প্রাণ আছে তোমাকে কিছুতেই ছেড়ে দিতে রাজি হতুম না– কাতেরিনা ভনা। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতিটা–তুমি নিজেই বিবেচনা করে দেখ তোমার কাছে দাঁড়ালে আমি কে? অল্প দিনের ভিতরই তোমার স্বামী যখন তোমার কচি সাদা হাতটি ধরে তোমাদের শোবার ঘরে তোমাকে নিয়ে যাবে, আমাকে তখন সেটা নীরব হৃদয়ে সয়ে নিতে হবে, এবং হয়তো সেই কারণেই আমি নিজেকে বাকি জীবন ধরে ঘেন্না করব। কাতেরিনা ভা! বুঝলে আমি তো সে দলের নই যারা যে কোনও একটা রমণীর সঙ্গে ফুর্তি করতে পারলেই অন্য কোনও কিছুর পরোয়া করে না। প্রেম সত্য সত্য কী, সে অনুভূতি আমার আছে, আর সেটা যেন কালনাগিনীর মতো আমার বুকের রক্ত শুষে শুষে খাচ্ছে।
কাতেরিনা বাধা দিয়ে বলল, কিন্তু এসব কথা তুমি আমাকে বার বার বুঝিয়ে বলছ কেন?
কাতেরিনা লভভনা! না বলে করি কী, বল। কী করি বল। হয়তো-বা এতদিনে সবকিছু তোমার স্বামীকে কাগজে-কলমে ভালো করে বুঝিয়ে রিপোর্ট করা হয়ে গিয়েছে, খুব বেশি দূরের কথা নয়, হয়তো-বা আসছে কাল থেকেই এখানে আর সেগেইকে দেখতে পাওয়া যাবে না, তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাবে না।
না, না, ও নিয়ে তুমি একটি মাত্র কথা বল না, সেরেজা! এটা কস্মিনকালেও হতে পারে। যা হোক তা হোক, তোমাকে ছেড়ে আমি কিছুতেই থাকতে পারব না। চুম্বনে-আলিঙ্গনে সোহাগ করে কাতেরিনা সেরগেইকে প্রবোধ দিতে লাগল। চূড়ান্ত নিষ্পত্তি যদি একদিন করবার সময়ই আসে, তবে… হয় নিয়তি তাকে ওপারে নিয়ে যাবেন, নয় আমাকে, কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে থাকবেই।
সেটা তো সম্ভব নয়, কাতেরিনা ভা!- বিষণ্ণ কণ্ঠে সেরগেই উত্তর দিল। তার পর মাথায় যেন দুঃখের ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, আমি যে এই প্রেম নিয়ে বেঁচে আছি তার জন্যে আমার নিজেরই দুঃখ হয়। সমাজে আমি যে ধাপে আছি সেই ধাপের কাউকে ভালোবাসলে হয়তো আমি সন্তুষ্টই হতুম। এ-ও কি কখনও সম্ভব যে, তুমি চিরকাল আমার সত্য প্রেম হয়ে থাকবে? আর এখন আমার প্রণয়িনী হয়ে থাকাও কি তোমার পক্ষে গৌরবের বিষয়? আমি তো চাই পূত চিরন্তন দেউলের সামনে তোমার স্বামী হতে; তার পর তোমার তুলনায় তখন আমি নিজেকে হীন মনে করলেও আমি সমাজের সামনে বুক চেতিয়ে দেখাতে পারব, আমার স্ত্রী আমাকে কতখানি সম্মানের চোখে দেখেন– কারণ আমি তাকে সম্মান করি
সেরগেইয়ের কথাগুলো কাতেরিনার মাথা ঘুলিয়ে দিয়েছে। তার ঈর্ষা, কাতেরিনাকে বিয়ে করার তার কামনা– এ কামনা মেয়েছেলে মাত্রেরই বড় প্রিয়, তা সে হোক না, বিয়ের পূর্বে তাদের অল্পদিনেরই পরিচয়। কাতেরিনা এখন সেরগেইয়ের জন্যে আগুনের ভিতর দিয়ে যেতে প্রস্তুত, অতলে তলাতে তৈরি, কিংবা ভয়ঙ্কর কারাগারে অথবা ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মরতে। সেরগেই তখন কাতেরিনাকে তার প্রেমে এমনই মজিয়েছে যে, সে তার অন্তহীন আত্মসমর্পণ সেগেইয়ের পদপ্রান্তে করে ফেলেছে। আনন্দে সে তখন আত্মহারা, তার রক্তে রিনিঝিনি বাজছে– আর কোনও কথা শোনবার সব শক্তি তার তখন নেই। তাড়াতাড়ি হাতের তেলো দিয়ে সে সেরগেইয়ের মুখ বন্ধ করে দিয়ে তার মাথা আপন বুকে চেপে ধরে বলল, শোন, এখন আমার জানা হয়ে গিয়েছে, তোমাকেও কী করে ব্যবসায়ী করে তোলা যায়, আর তোমার সঙ্গে কীভাবে যথারীতি সসম্মানে বাস করা যায়। যতদিন না আমাদের অবস্থার চরম বোঝাঁপড়ার সময় এসেছে—- ততদিন কোনওকিছু নিয়ে আমাকে আর বেদনা দিও না।
