শুনেছি বিলেতে কোনো কোনো ফিলম্ নাকি যোলো বছরের কম বয়স হলে দেখতে দেয় না— চরিত্র দোষ হবে বলে; যাদের ওজন এক শ ষাট পৌণ্ডেরকম তাদের ঠিক তেমনি বলশফের সঙ্গে শেকহ্যাণ্ড করা বারণ ছিল, পাছে হাতের নড়া কাঁধ থেকে খসে যায়। মহিলাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা।
বীরপুরুষ হিসেবে রাশান রাজদূতাবাসে বলশফের খাতির ছিল। ১৯১৬ সাল থেকে বলশেভিক বিদ্রোহের শেষ পর্যন্ত তিনি বিস্তর লড়াই লড়েছেন। ১৯১৬-১৭ সালের শীতকালে যখন রুশবাহিনী পোল্যাণ্ডে লড়াই হেরে পালায় তখন বলশফ রাশান ক্যাভালরিতে ছোকরা অফিসার। সেবারে ঘোড়ায় চড়ে পালাবার সময় তার পিঠের চোদ্দ জায়গায় জখম হয়েছিল বিস্তর ঝুলোষুলির পর একদিন শার্ট খুলে তিনি আমায় দাগগুলো দেখিয়েছিলেন। কোনো কোনোটা তখনো আধ ইঞ্চি পরিমাণ গভীর। আমি ঠাট্টা করে বলেছিলুম, পৃষ্ঠে তব অস্ত্র-লেখা।।
বলশফকে কেউ কখনো চটাতে পারেনি বলেই রসিকতাটা করেছিলুম। তিনি ভারতবর্ষের ক্ষাত্র বীরত্বের, কোড় শুনে বললেন, যদি সেদিন না পালাতুম তবে হ্রৎস্কির আমলে পোলদের বেধড়ক পাল্টা মার দেবার মুখ থেকে যে বঞ্চিত হতুম, তার কি?
মাদাম দেমিদফ সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আর জানেন তোত, মসিয়োঁ, ঐ লড়াইতেই সোভিয়েট রাশার অনেক পথ সুরাহা হয়ে যায়।
বলশফের একটা মস্ত দোষ দুদণ্ড চুপ করে বসে থাকতে পারেন। হাত দুখানা নিয়ে যে কি করবেন ঠিক করতে পারেন না বলে এটা সেটা নিয়ে সব সময় নাড়াচাড়া করেন, বেখেয়ালে একটু বেশী চাপ দিতেই কর্কদ্ভুটা পর্যন্ত ভেঙ্গে যায়। তিনি ঘরে ঢুকলেই আমরা টুকিটাকি সব জিনিষ তার হাতের নাগাল থেকে সরিয়ে ফেলতুম। আমার ঘরে ঢুকলে আমি তৎক্ষণাৎ তাকে একথালা আন্ত আখরোট খেতে দিতুম।
দুটো একটা খেতেন মাঝে সাঝে যাওয়ার পর দেখা যেত সব কটি আখরোটের খোসা ছাড়িয়ে ফেলেছেন, চহারমগজশিকন (হাতুড়ি) না দেওয়া সত্ত্বেও।
এ রকম অজাতশত্ৰু লোক সমস্ত কাবুল শহরে আমি দুটি দেখিনি। একদিন তাই যখন দেমিদফের ঘরে আলোচনা হচ্ছিল তখন বলশফের সবচেয়ে দিলী-দোস্ত রোগাপটকা সিয়েশকফ বললেন, বলশফের সঙ্গে সকলের বন্ধুত্ব তার গায়ের জোরের ভয়ে।
বলশফ বললেন, তা হলে তো তোমার সবচেয়ে বেশী শত্রু থাকার কথা।
স্মিয়েশকফ যা বললেন, পদাবলীর ভাষায় প্রকাশ করলে তার রূপ হয়
বঁধু তোমার গরবে গরবিনী হাম
রূপসী তুহারি রূপে—
বাকিটা তিনি আর প্রাণের ভয়ে বলেননি।
বলশফ বললেন, নোগা লোকের ঐ এক মস্ত দোষ। খামকা বাজে তর্ক করে। বলে কি না ভয়ে বন্ধুত্ব। যতসব পরস্পরদ্রোহী, আত্মঘাতী বাক্যাড়ম্বর।
বলশফ সম্বন্ধে এত কথা বললুম তার কারণ তিনি তখন আমান উল্লার অ্যার-ফোর্সের ডাঙর পাইলট। বলশেভিক-বিদ্রোহ জুড়িয়ে গিয়ে থিতিয়ে যাওয়ায় তাঁর সঙ্কটাকাঙ্ক্ষী মন কাবুলে এসে নূতন বিপদের সন্ধানে আমান উল্লার চাকরী নিয়েছিল।
শেষদিন পর্যন্ত তিনি আমান উল্লার সেবা করেছিলেন।
————–
* অনুবাদকের নাম মনে নেই বলে দুঃখিত।
৩২. বক্তৃতা দেবার বদ অভ্যাস
আমান উল্লা ইয়োরোপ থেকে নিয়ে এলেন একগাদা দামী আসবাবপত্র, অগুনতি মোটর গাড়ি আর বক্তৃতা দেবার বদ অভ্যাস। প্রাচ্যদেশের লোক খেয়েদেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে আরামে গা এলিয়ে দেয়, পশ্চিমে ডিনারের পর স্পীচ, লাঞ্চের পর অরেটরি–তাও আবার যত সব শিরঃপীড়াদায়ক পোলিটিক্যাল বিষয় নিয়ে।
সায়েবরা বিলেতে লাঞ্চে ডিনারে আমান উল্লাকে যে নেশার পয়লা পাত্র খাইয়ে দিয়েছিল তার খোয়ারি তিনি চালালেন কাবুলে ফিরে এসে, মাত্রা বাড়িয়ে, লম্বা লম্বা লেকচার ঝেড়ে। পর পর তিনদিনে নাকি তিনি একুনে ত্রিশ ঘণ্টা বক্তৃতা দিয়েছিলেন।
কিন্তু কারো কথায় তো আর গায়ে ফোস্কা পড়ে না, কাবুলে চিঁড়ের প্রচলন নেই—কাজেই শ্রোতারা কেউ ঘুমলো, কেউ শুনলে, দু-একজন মনে মনে ইউরোপে তাঁর বাজে খর্চার আঁক কষলো।
তারপর আরম্ভ হল সংস্কারের পালা। একদিন সকাল বেলা মৌলানার বাড়ি যেতে গিয়ে দেখি পনবো আনা দোকানপাট বন্ধ। বড় দোকানের ভিতর গ্রামোফোন-ফোটোগ্রাফের দোকানটা খোলা ছিল। দোকানদার পাঞ্জাবী, অমৃতসরের লোক; আমাদের সঙ্গে ভাব ছিল।
খবর শুনে বিশ্বাস হল না। আমান উল্লার হুকুম, কার্পেটের উপর পদ্মাসনে বসে দোকান চালাবার কায়দা বেআইনী করা হল; সব দোকানে বিলিতী কায়দায় চেয়ার টেবিল চাই।
আমি বললুম, সে কি কথা? ছুতোর কামার, কালাইগর, মুচী?
সব, সব।
ছোট ঘোট খোপের ভিতর চেয়ার টেবিল ঢোকাবে কি করে, পাবেই বা কোথায়?
নিরুত্তর।
যারা পয়সাওয়ালা, যাদের দোকানে জায়গা আছে?
রাতারাতি মেজ-কুর্সি পাবে কোথায়? ছুতোরও ভয়ে দোকান বন্ধ করেছে। বলে, চেয়ারে বসে টেবিলে তক্তা রেখে সে নাকি বাঁদা চালাতে শেখেনি।
আগের থেকে নোটিশ দিয়ে হুশিয়ার করা হয়নি?
না। জানেন তো, আমান উল্লা বাদশার সব কুছ ঝটপট্।
পাক্কা তিন সপ্তাহ চোদ্দ আনা দোকানপাট বন্ধ রইল। গম ডাল অবশ্যি পিছনের দরজা দিয়ে আড়ালে আবডালে বিক্রি হল, তাদের উপরে চোটপাট করে পুলিশ দুপয়সা কামিয়ে নিল।
আমান উল্লা হার মানলেন কিনা জানিনে তবে তিন সপ্তাহ পরে একে একে সব দোকানই খুলল—পূর্ববৎ, অর্থাৎ বিন্ চেয়ারটেবিল। কাবুলের সবাই এই ব্যাপারে চটে গিয়েছিল সন্দেহ নেই কিন্তু রাজার খামখেয়ালিতে তারা অভ্যস্ত বলে অত্যধিক উষ্মবোধ করেনি। কাবুলীদের এ মনোভাবটা আমি ঠিক ঠিক বুঝতে পারিনি কারণ আমরা ভারতরর্ষে অত্যাচার-অবিচারে অভ্যস্ত বটে, কিন্তু খামখেয়ালি বড় একটা দেখতে পাইনে।
