আমরা এসেছিলুম চারটের সময়; তখন বাজে প্রায় সাতটা। এর মাকে যে কত পাপিরসি পুড়ল, কত চা চলল গল্পের তোড়ে আমি কিছুমাত্র লক্ষ্য করিনি। এক কাপ শেষ হতেই মাদাম সেটা তুলে নিয়ে এটো চা একটা বড় পাত্রে ঢেলে ফেলেন, লিকার ঢেলে গরম জল মিশিয়ে চিনি দিয়ে আমার অজানাতেই আরেক কাপ সামনে রেখে দেন। জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করেন না কতটা লিকারের প্রয়োজন, দু-একবার দেখেই আমার পরিমাণটা শিখে নিয়েছেন। আমি কখনো ধন্যবাদ দিয়েছি, কখনো টলস্টয় গর্কির তর্কের ভিতরে ডুবে যাওয়ায় লক্ষ্য করিনি বলে পরে অনুতাপ প্রকাশ করেছি।
কথার ফাঁকে মাদাম বললেন, আপনারা এখানেই খেয়ে যান। আমি অনেক ধন্যবাদ দিয়ে বললুম, আরেক দিন হবে। বেনওয়া সায়েব তো ছিলেছেড়া ধনুকের মত লাফ দিয়ে উঠে বললেন, অনেক অনেক ধন্যবাদ, কিন্তু আজ উঠি, বড় বেশীক্ষণ ধরে আমরা বসে আছি।
আমি একটু বোকা বনে গেলুম। পরে বুঝতে পারলুম বেনওয়া সায়েব খাওয়ার নেমন্তন্নটা অন্য অর্থে ধরে নিয়ে লজ্জা পেয়েছেন। মাদামও দেখি আস্তে আস্তে বেনওয়ার মনের গতি ধরতে পেরেছেন। তখন লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে বললেন, না মসিয়োঁ, আমি সে অর্থে বলিনি; আমি সত্যিই আপনাদের গালগল্পে ভারী খুশী হয়ে ভাবলুম দুমুঠো খাবার জন্য কেন আপনাদের আড্ডাটা ভঙ্গ হয়।
দেমিদফ চুপ করে ছিলেন। ভালো করে কুয়াশাটা কাটাবার জন্য বললেন, পশ্চিম ইয়োরোপীয় এটিকেটে, এ-রকম খেতে বলার অর্থ হয়ত তোমরা এবার ওঠো, আমরা খেতে বসব। আমার স্ত্রী সে ইঙ্গিত করেননি। জানেন তো খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে আমরা এখনো আমাদের কুর্তা পাতলুনের উপরে পরে থাকি অর্থাৎ আমরা প্রাচ্যদেশীয়।
সকলেই আরাম বোধ করলুম। কিন্তু সে যাত্রা ডিনার হল না। সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় দেমিদফ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি রাশান শেখেন না কেন?
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, আপনি শেখাবেন? তিনি বললেন, নিশ্চয়। with pleasure!
বেনওয়া বললেন, No, not with pleasure বলে আমার দিকে চোখ ঠার দিলেন।
মাদাম বললেন, ঠিক বুঝতে পারলুম না।
বেনওয়া বললেন, এক ফরাসী লণ্ডনের হোটেলে ঢুকে বলল, Waiter, bring me a cotlette, please? ওয়েটার বলল, with pleasure, Sir. ফরাসী ভয় পেয়ে বলল, No, no, not with pleasure, with potatoes, please?
বেনওয়া বিদগ্ধ ফরাসী। একটুখানি হাল্কা রসিকতা দিয়ে শেষ পাতলা মেঘটুকু কেটে দিয়ে টুক করে বেরিয়ে এলেন।
মাদামও কিছু কম না। শেষ কথা শুনতে পেলুম But I shall give you cotlettes with both pleasure and potatoes.
রাস্তায় বেরিয়ে নেওয়াকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে বললুম, এ দুটি যথার্থ খাঁটীলোক।
২৮. হেমন্তের কাবুল
হেমন্তের কাবুল মধ্যযুগীয় সম্প্রসারণে ফুলে ওঠে, ইংরিজীতে যাকে বলে মিডল এজ স্পেড। অর্থাৎ ভূড়িটা মোটা হয়, চাল-চলন ভারিক্কীভরা।।
যবগমের দানা ফুলে উঠল, আপেল ফেটে পড়ার উপক্রম, গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত গ্রীষ্ম-ভর বোদ বাতাস বৃষ্টি খেয়ে খেয়ে মোটা হয়ে গিয়েছে, হাওয়া বইলে ডাইনে বাঁয়ে নাচন তোলে না, ঠায় দাঁড়িয়ে অল্প অল্প কাঁপে, না হয় থপ করে ডাল ছেড়ে গাছতলায় শুয়ে পড়ে। প্রথম নবান্ন হয়ে গিয়েছে, চাষীরাও খেয়েদেয়ে মোটা হয়েছে। শীতকাতুরেরা দুটো একটা ফালত জামা পরে ফেঁপেছে, গাধাগুলো ঘাস খেয়ে খেয়ে মোটা হয়ে উঠেছে, খড়-চাপানো গাড়ির পেট ফেটে গিয়ে এদিক ওদিক কুটোর নাড়ী ছড়িয়ে পড়ছে।
আর সফল হয়ে কেঁপে ওঠার আসল গরমি দেখা যায় সকাল বেলার শিশিরে। বেহায়া বড়লোকের মত কাবুল উপত্যকা কেবলি হীরের আংটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখায়, ঝলমলানিতে চোখে ধাধা লেগে যায়।
কিন্তু এ সব জেল্লাই কাবুল নদীর রক্তশোষণ করে। সাপের। খোলসের মত সে নদী এখন শুকিয়ে গিয়েছে, বাতাস বইলে বুক চিরে বালু ওড়ে। মার্কস তো আর ভুল বলেননি, শোষণ করেই সবাই ফাঁপে।
যে পাগমান পাহাড়ের বরফের প্রসাদে কাবুল নদীর জৌলুশ সে তার নীল চুড়োগুলো থেকে এক একটা করে সব কটা বরফের সাদা টুপি খসিয়ে ফেলেছে। আকাশ যেন মাটির তুলনায় কড় বেশী বুড়িয়ে গেল নীল চোখে ঘোলাটে ছানি পড়েছে।
পাকা, পচা ফলের গন্ধে মাথা ধরে; আফগানিস্থানের সরাইয়ের চতুর্দিক বন্ধ বলে দুর্গন্ধ যে রকম বেরতে পারে না, কাবুল উপত্যকার চারিদিকে পাহাড় বলে তেমনি পাকা ফল ফসলের গন্ধ সহজে নিষ্কৃতি পায় না। বাড়ির সামনে যে ঘূর্ণিবায়ু খড়কুটো পাতা নিয়ে বাইরে যাবে বলে রওয়ানা দেয় সেও দেখি খানিকক্ষণ পরে ঘুরে ফিরে কোনোদিকে রাস্তা না পেয়ে সেই মাঠে ফিরে এসে সবশুদ্ধ নিয়ে থপ করে বসে পড়ে।।
তারপর একদিন সন্ধ্যের সময় এল ঝড়! প্রথম ধাক্কায় চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলুম, মেলে দেখি শেলির ওয়েস উইণ্ড কীটসের অটামকে ঝেঁটিয়ে নিয়ে চলেছে, সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বর্ষশেষ। খড়কুটো, জমে-ওঠা পাতা, ফেলে-দেয়া কুলল সবাই চলল দেশ ছেড়ে মুহাজরিন হয়ে। কেউ চলে সার্কাসের সঙের মত ডিগবাজি খেয়ে, কেউ হনুমানের মত লাফ দিয়ে আকাশে উঠে পক্ষীরাজের মত ডানা মেলে দিয়ে আর বাদবাকি যেন ধনপতির দল–প্রলেতারিয়ার আক্রমণের ভয়ে একে ওকে জড়িয়ে ধরে।
আধ ঘণ্টার ভিতর সব গাছ বিলকুল সাফ।
সে কী বীভৎস দৃশ্য।
আমাদের দেশে বন্যার জল কেটে যাওয়ার পর কখনো কখনো দেখেছি কোনো গাছের শিকড় পচে যাওয়ায় তার পাতা ঝরে পড়েছে সমস্ত গাছ ধবলকুষ্ঠ রোগীর মত ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে।
