জমাখরচের খাতা খুলে দেখলেন, জমায় লেখা, আমান উল্লা খান দেশের স্বাধীনতা অর্জন করে জনসাধারণের হৃদয় জয় করেছেন, তিনি আর আমীর আমান উল্লা নন— তিনি গাজী বাদশাহ আমান উল্লা খান।
খরচে লেখা, নসর উল্লার মোল্লার দল যদিও আসর থেকে সরে গিয়েছে তবু তাদের বিশ্বাস নেই। আমান উল্লা ফরাসী জানতেন
রেকুলের পূর মিয়ো সোতের, অর্থাৎ ভালো করে লাফ দেওয়ার জন্য পিছিয়ে যাওয়া প্রবাদটা তার অজানা ছিল না।।। কিন্তু আমান উল্লা মনে মনে স্থির করলেন, মোল্লারা সরকারী রাস্তার কোন্ খানে খানাখন্দ বানিয়ে রাখবে সে ভয় অহরহ বুকের ভিতর পুষে রাখলে দেশসংস্কারের মোটর টপ গিয়ারে চালান অসম্ভব। অথচ পুরা স্পীডে মোটর না চালিয়ে উপায় নেইসাধুর মাত্র এক দিন।
কাবুলে পৌঁছে যে দিকে তাকাই সেখানেই দেখি হরেকরকম সরকারী উর্দিপরা স্কুল-কলেজের ছেলেছোকরারা ঘোরাঘুরি করছে। খবর নিয়ে শুনি কোনোটা উর্দি ফরাসী স্কুলের, কোনোটা জর্মন, কোনোটা ইংরিজী আর কোনোটা মিলিটারি স্কুলের। শুধু তাই নয়, গাঁয়ের পাঠশালা পাশ করে যারা শহরে এসেছে তাদের জন্য ফ্রি বোর্ডিং, লজিং, জামাকাপড়, কেতাবপত্র, ইস্ট মেন্টবক্স, ডিক্সনরি, ছুটিতে বাড়ি যাবার জন্য খচ্চরের ভাড়া, এক কথায় অল ফাউণ্ড।
ভারতবর্ষের হয়ে আমি বললুম, নাথিং লস্ট।
প্যারিসফের্তা সইফুল আলম বুঝিয়ে বললেন, আপনি ভেবেছেন অল ফাউণ্ড হলে বিদ্যেও বুঝি সঙ্গে সঙ্গে জুটে যায়। মোটই না। হস্টেল থেকে ছেলেরা প্রায়ই পালায়।
আমি বললুম, ধরে আনার বন্দোবস্ত নেই?
সইফুল আলম বললেন, গাঁয়ের ছেলেরা শক্ত হাড়ে তৈরী। পালিয়ে বাড়ি না গিয়ে যেখানে সেখানে দিন কাটাতে পারে। তারও দাওয়াই আমান উল্লা বের করেছেন। হস্টেল থেকে পালানো মাত্রই আমরা সরকারকে খবর দিই। সরকারের তরফ থেকে তখন দুজন সেপাই ছছাকরার গায়ের বাড়িতে গিয়ে আসর জমিয়ে বসে, তিন বেলা খায় দায় এবং যদিও হুকুম নেই তবু সকলের জানা কথা যে, কোর্মা-কালিয়া না পেলে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে ছেলের বাপকে তিন বেলা মার লাগায়। বাপ তখ ছেলেকে খুজতে বেরোয়। সে এসে হস্টেলে হাজিরা দেবে, হেডমাস্টারের চিঠি গায়ে পৌঁছবে যে আসামী ধরা দিয়েছে তখন সেপাইরা বাপের ভালো দুম্বাটি কেটে বিদায়-ভোজ খেয়ে তাকে হুশিয়ার না করে শহরে ফিরবে। পরিস্থিতিটার পুনরাবৃত্তিতে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
আমি বললুম, কিন্তু পড়াশোনায় যদি কেউ নিতান্তই গর্দভ হয় তবে?
পর পর তিনবার যদি ফেল মারে তবে হেডমাস্টার বিবেচনা করে দেখবেন তাকে ডিসমিস করা যায় কি না? বুদ্ধিশুদ্ধি আছে অথচ পড়াশোনায় ঢিটেমি করছে জানলে তার তখনো ছুটি নেই।
এর পর কোন দেশের রাজা আর কি করতে পারেন?
মিলিটারি স্কুলের ভার তুর্কদের হাতে। তুর্কী জেনারেলদের ঐতিহ্য বার্লিনের পৎদাম সমরবিদ্যায়তনের সঙ্গে জড়ানো; তাই শুনলুম স্কুলটি জর্মন কায়দায় গড়া। সেখানে কি রকম উন্নতি হচ্ছে তার খবর কেউ দিতে পারলেন না। শুধু অধ্যাপক বেনওয়া বললেন, ইস্কুলটা তুলে দিলে আফগানিস্থানের কিছু ক্ষতি হবে না।
মেয়েদের শিক্ষার জন্য আমান উল্লা আর তাঁর বেগম বিবি সুরাইয়া উঠে পড়ে লেগেছেন। বোরকা পরে এক কাবুল শহরেই প্রায় দুহাজার মেয়ে ইস্কুলে যায়, উঁচু পাঁচিলঘেরা আঙিনায় বাস্কেটবল, ভলিবল খেলে। সইফুল আলম বললেন, লিখতে পড়তে, আঁক কষতে শেখে, সেই যথেষ্ট। আর তাও যদি না শেখে আমার অন্তত কোন আপত্তি নেই। হারেমের বন্ধ হওয়ার বাইরে এসে লাফালাফি করছে এই কি যথেষ্ট নয়?
আমি সর্বান্তঃকরণে সায় দিলুম। সইফুল আলম কানে কানে বললেন, কিন্তু একজন লোক একদম সায় দিচ্ছেন না। রানী-মা।।
শুনে একটু ঘাবড়ে গেলুম। দুই শত্রু নিপাত করে, তৃতীয় শত্রুকে ঠাণ্ডা রেখে যিনি আমান উল্লাকে বাদশা বানাতে পেরেছেন তাঁর রায়ের একটা মূল্য আছে বই কি? তার মতে নাকি এত শিক্ষার খোরাক আফগানিস্থান হজম করতে পারবে না। এই নিয়ে নাকি মাতাপুত্রে মনোমালিন্যও হয়েছে মাতা অভিমানভরে পুত্রকে উপদেশ দেওয়া বন্ধ করেছেন। বধু সুরাইয়াও নাকি শাশুড়ীকে অবজ্ঞা করেন।
কিন্তু কাবুল শহর তখন আমান উল্লার চাবুক খেয়ে পাগলা ঘোড়ার মত ছুটে চলেছে দেরেশি পরে। দেরেশি কথাটা ইংরিজী ড্রেস থেকে এসেছে অর্থাৎ হ্যাট, কোট, টাই, পাতলুন। খবর নিয়ে জানতে পারলুম, সরকারী কর্মচারী হলেই তাকে দেরেশি পরতে হয় তা সে বিশ টাকার কেরানীই হোক, আর দশ টাকার সিপাই-ই হোক। শুধু তাই নয়, দেরেশি পরা না থাকলে কাবুল নাগরিক সরকারী বাগানে পর্যন্ত ঢুকতে পায় না। একদিকে সরকারী চাপ, অন্যদিকে বাইরের চাকচিক্যের প্রতি অনুন্নত জাতির মোহ, মাঝখানে সিনেমার উস্কানি, তিনে মিলে কাবুল দেরেশিপাগল হয়ে উঠেছে।
ইন্তেক আবদুর রহমানের মনে ছোঁয়া লেগেছে। আমি বাড়িতে শিলওয়ার পরে বসে থাকলে সে খুতখুত করে; আটপৌরে সুট পরে বেরতে গেলে নীলকৃষ্ণ দেরেশি পরার উপদেশ দেয়।
মেয়েরাও তাল রেখে চলেছেন। আমীর হবীব উল্লা হারেমের মেয়েদের ফ্রক ব্লাউজ পরাতেন। আমান উল্লার আমলে দেখি ভদ্রমহিলা মাত্রেই উঁচু হিলের জুতো, হাঁটু পর্যন্ত ফ্রক, আস্বচ্ছ সিল্কের মোজা, লম্বাহাতার আঁটসাট ব্লাউজ, দস্তানা আর হ্যাট পরে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। হ্যাটের সামনে একখানা অতি পাতলা নেট ঝুলছে বলে চেহারাখানা পষ্টাপষ্টি দেখা যায় না। যে মহিলার যত সাহস তার নেটের বুনুনি তো দিলে।
