ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, টেনিস খেলতে পারেন?
হাঁ।
তবে কাবুলে এলেই আমার সঙ্গে টেনিস খেলে যাবেন।
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, অনেক ধন্যবাদ কিন্তু আপনার কোর্ট কোথায়, আপনার পরিচয়ও তো পেলুম না।
ভদ্রলোক প্রথম একটু অবাক হলেন। তারপর সামলে নিয়ে বললেন, আমি? ওঃ, আমি? আমি মুইন-উস্-সুলতানে। আমার টেনিস-কোর্ট ফরেন অফিসের কাছে। কাল আসবেন। বলে আমাকে ভালো করে ধন্যবাদ দেবার ফুসৎ না দিয়েই মোটর হাঁকিয়ে চলে গেলেন।
এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি, মোটরের প্রায় বিশ গজ পিছনে দাঁড়িয়ে আমার ভৃত্য আবদুর রহমান অ্যারোপ্লেনের প্রপেলারের বেগে দুহাত নেড়ে আমাকে কি বোঝাবার চেষ্টা করছে। মোটর চলে যেতেই এঞ্জিনের মত ছুটে এসে বলল, মুইন-উস্-সুলতানে, মুইন-উস্-সুলতানে।
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, লোকটি কে বটেন?
আবদুর রহমান উত্তেজনায় ফেটে চৌচির হয় আর কি। আমি যতই জিজ্ঞাসা করি মুইন-উ-সুলতানে কে, সে ততই মন্ত্রোচ্চারণের মত শুধু বলে, মুইন-উস-সুলতানে, মুইন-উস-সুলতানে। শেষটায় নৈরাশ্য, অনুযোগ, ভর্ৎসনা মিশিয়ে বলল, চেনেন না, বরাদরে-আলা-হজরত, বাদশার ভাই,–বড় ভাই। আপনি করেছেন কি? রাজবাড়ির সকলের হাতে চুমো খেতে হয়।
আমি বললুম, রাজবাড়িতে লোক সবশুদ্ধ কজন না জেনে তো আর চুমো খেতে আরম্ভ করতে পারিনে। সক্কলের পোষাবার আগে আমার ঠোঁট ক্ষয়ে যাবে না তো?
আবদুর রহমান শুধু বলে, ইয়া আল্লা, ইয়া রসুল, করেছেন কি, করেছেন কি
আমি জিজ্ঞেস করলুম, তা উনি যদি রাজার বড় ভাই-ই হবেন তবে উনি রাজা হলেন না কেন?
আবদুর রহমান প্রথম মুখ বন্ধ করে তার উপর হাত রাখল, তারপর ফিসফিস করে বলল, আমি গরীব তার কি জানি; কিন্তু এসব কথা শুধোতে নেই।
সে রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর আবদুর রহমান যখন ঘরের এক কোণে বাদামের খোসা ছাড়াতে বসল তখন তার মুখে ঐ এক মুইন-উস-সুলতানের কথা ছাড়া অন্য কিছু নেই। দুতিনবার ধমক দিয়ে হার মানলুম। বুঝলুম, সরল আবদুর রহমান মনে করেছে, আফগানিস্থান যখন কাকামামাশালার দেশ, অর্থাৎ বড়লোকের নেকনজর পেলে সব কিছু হাসিল হয়ে যায় তখন আমি রাতারাতি উজীরনাজির কেউ-কেটা, কিছু-না-কিছু একটা, হয়ে যাবই যাব।
ততক্ষণে অভিধান খুলে দেখে নিয়েছি মুইন-উস্-সুলতানে সমাসের অর্থ যুবরাজ।
যুবরাজ রাজা হলেন না, হলেন ছোট ভাই। সমস্যাটার সমাধান করতে হয়।
২৩. যুবরাজ রাজা না হয়ে ছোট ছেলে কেন রাজা
মুইন-উস-সুলতানে বা যুবরাজ রাজা না হয়ে ছোট ছেলে কেন রাজা হলেন সে-সমস্যার সমাধান করতে হলে খানিকটা পিছিয়ে এ-শতকের গোড়ায় পৌঁছতে হয়।
বাঙালী পাঠক এখানে একটু বিপদগ্রস্ত হবেন। আমি জানি, বাঙালী—তা তিনি হিন্দুই হোন আর মুসলমানই হোন-আরবী ফার্সী মুসলমানী নাম মনে রাখতে বা বানান করতে অল্পবিস্তর কাতর হয়ে পড়েন। একথা জানি বলেই এতক্ষণ যতদূর সম্ভব কম নাম নিয়েই নাড়াচাড়া করেছি বিশেষতঃ আনাতোল ফ্রাঁসের মত গুণী যখন বলেছেন, পাঠকের কাছ থেকে বড় বেশী মনোযোগ আশা করে না, আর যদি মনস্কামনা এই হয় যে, তোমার লেখা শত শত বৎসর পেরিয়ে গিয়ে পরবর্তী যুগে পৌঁছুক তা হলে হাল্কা হয়ে ভ্রমণ করো। আমার সে-বাসনা নেই, কারণ ভাষা এবং শৈলী বাবলে আমার অক্ষমতা সম্বন্ধে আমি যথেষ্ট সচেতন। কাজেই যখন ক্ষমতা নেই, বাসনাও নেই তখন পাঠকের নিকট ঈষৎ মনোযোগ প্রত্যাশা করতে পারি। মৌসুমী ফুলই মনোযোগ চায় বেশী; দুদিনের অতিথিকে তোয়াজ করতে মহা কঞ্জুসও রাজী হয়।
যে সময়ের কথা হচ্ছে তখন আফগানিস্থানের কর্তা বা আমীর ছিলেন হবীব উল্লা। তার ভাই নসর উল্লা মোল্লাদের এমনি খাসপেয়ারা ছিলেন যে, বড় ছেলে মুইন-উস-সুলতানে তার মরার পর আমীর হবেন এ-ঘোষণা হবীব উল্লা বুকে হিম্মৎ বেঁধে করতে পারেননি। বরঞ্চ দুই ভায়ে এই নিষ্পত্তিই হয়েছিল যে, হবীব উল্লা মরার পর নসর উল্লা আমীর হবেন, আর তিনি মরে গেলে আমীর হবেন মুইন-উস-সুলতানে। এই নিষ্পত্তি পাকা-পোক্ত করার মতলবে হবীব উল্লা নসর উল্লা দুই ভাইয়ে মীমাংসা করলেন যে, মুইন-উস-সুলতানে নসর উল্লার মেয়েকে বিয়ে করবেন। হবীব উল্লা মনে মনে বিচার করলেন, আর যাই হোক, নসর উল্লা, জামাইকে খুন করে দামাদ-কুশ (জামাতৃহন্তা) আখ্যায় কলঙ্কিত হতে চাইবেন না। ঐতিহাসিকদের স্মরণ থাকতে পারে যোধপুরের রাজা অজিত সিং যখন সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের সঙ্গে একজোট হয়ে জামাই দিল্লীর বাদশাহ ফররুখ সিয়ারকে নিহত করেন তখন দিল্লীর ছেলে-বুড়োর দামাদ-কুশ, দামাদ-কুশ চিৎকারে অতিষ্ঠ হয়ে শেষটায় তিনি দিল্লী ছাড়তে বাধ্য হন। রাস্তার ডেপো ছোঁড়ারা পর্যন্ত নির্ভয়ে অজিত সিং-এর পাল্কির দুপাশে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে চলত আর সেপাই-বরকন্দাজের তন্বী-তম্বকে বিলকুল পোয়া না করে তারস্বরে ঐকতানে দামাদ-কুশ, দামাদ-কুশ, বলে অজিত সিংহকে ক্ষেপিয়ে তুলত।
[আমীর আবদুর রহমান
- আমীর হবীব উল্লা
- মুইন-উ-সুলতানে (যুবরাজ)
আমান উল্লা (হবীব উল্লা দ্বিতীয়া মহিষী—রানী-মা–উলিয়া হজরত) - ইনায়েত উল্লা (মাতা মৃতা)
- মুইন-উ-সুলতানে (যুবরাজ)
- নসর উল্লা
- কন্যা (যুবরাজের নিকট বাগদত্তা)]

হবীব উল্লা, নসর উল্লা, মুইন-উস-সুলতানে তিনজনই এই চুক্তিতে অল্পবিস্তর সন্তুষ্ট হলেন। একদম নারাজ হলেন মাতৃহীন মুইন-উসসুলতানের বিমাতা। ইনি আমান উল্লার মা, হবীব উল্লার দ্বিতীয়া মহিষী। আফগানিস্থানের লোক একে রানী-মা বা উলিয়া হজরত নামে চিনত। এর দাপটে আমীর হবীব উল্লার মত খাণ্ডারও কুরবানির বকরি অর্থাৎ বলির পাঁঠার মত কাঁপতেন। একবার গোসা করে রানী-মা যখন নদীর ওপারে গিয়ে তাবু খাটান তখন হবীব উল্লা কোনো কৌশলে তার কিনারা না লাগাতে পেরে শেষটায় এপারে বসে পাগলের মত সর্বাঙ্গে ধুলো-কাদা মেখে তাঁর সংগৃ-দিল বা পাষাণ হৃদয় গলাতে সমর্থ হয়েছিলেন। রানী-মা স্থির করলেন, এই সংসারকে যখন ওমর খৈয়াম দাবাখেলার ছকের সঙ্গে তুলনা করেছেন তখন নসর উল্লা এবং মুইন-উ-সুলতানের মত দুই জব্বর ঘুটিকে ঘায়েল করা আমান উল্লার মত নগণ্য বড়ের পক্ষে অসম্ভব নাও হতে পারে। তার পক্ষেই বা রাজা হওয়া অসম্ভব হবে কেন?