আমি বললুম, সুন্দ-উপসুন্দের লড়াই।
দোস্ত মুহম্মদ জিজ্ঞাসা করলেন, রাইফেলের জন্য তারা লড়েছিল?
আমি বললুম, না, সুন্দরীর জন্য।
দোস্ত মুহম্মদ বললেন, তওবা! তওবা! স্ত্রীলোকের জন্য কখনো জব্বর লড়াই হয়? মোক্ষম লড়াই হয় রাইফেলের জন্য। রাইফেল থাকলে সুন্দরীর স্বামীকে খুন করে তার বিধবাকে বিয়ে করা যায়। উত্তম বন্দোবস্ত। সে বেহেস্তে গিয়ে হুরী পেল তুমিও সুন্দরী পেলে।
রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, ভেবো না, লক্ষ্য করিনি যে, তুমি আমাকে আপনি বলছে। আর আমি তুমি বলে যাচ্ছি। কিন্তু বেশী দিন চালাতে পারবে না। সমস্ত আফগানিস্থানে আমাকে কেউ আপনি বলে না, ইস্তেক আগা আহমদ পর্যন্ত না।
টাঙ্গায় চড়বার সময় দাঁড়াও বলে ছুটে গিয়ে একখানা বই নিয়ে এসে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। মন্তব্য প্রকাশ করলেন, ভালো বই, কর্সিকা আর আফগানিস্থানে একই রকম প্রতিশোধের ব্যবস্থা। চেয়ে দেখি কলঁবা।*
———-
* আগুনের ফুলকি নাম দিয়ে চারু বন্দ্যোপাধ্যায় অনুবাদ করেছেন।
১৯. দোস্ত মুহম্মদ
দিন দশেক পরে একদিন জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, দোস্ত মুহম্মদ। ছুটে গিয়ে দরজা খুলে কাবুলী কায়দায় ভালো আছেন তো, মঙ্গল তো, সব ঠিক তো, বলতে আরম্ভ করলুম। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলুম, দোস্ত মুহম্মদ কোনো সাড়া-শব্দ না দিয়ে আপন মনে কি সব বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছেন। কাছে এসে কান পেতে যা শুনলুম, তাতে আমার দম বন্ধ হবার উপক্রম। বলছেন, কমরত ব শিকনদ, খুদা তোরা কোর সাজদ, ব পূন্দী, ব তরকী ইত্যাদি।
সরল বাঙলায় তর্জমা করলে অর্থ দাঁড়ায়, তোর কোমর ভেঙে দুটুকরো হোক, খুদা তোর দুচোখ কানা করে দিন, তুই ফুলে উঠে ঢাকের মত হয়ে যা, তারপর টুকরো টুকরো হয়ে ফেটে যা।
আমি কোনো গতিকে সামলে নিয়ে বললুম, দোস্ত মুহম্মদ, কি সব আবোল-তাবোল বকছেন?
দোস্ত মুহম্মদ আমাকে আলিঙ্গন করে দুগালে দুটো বশেল চমো লাগালেন। বললেন, আমি কক্ষনো আবোল-তাবোল বকিনে।
আমি বললুম, তবে এসব কি?
বললেন, এসব তোর বালাই কাটাবার জন্য। লক্ষ্য করিসনি, এদেশে বাচ্চাদের সাজিয়ে-গুজিয়ে কপালের একপাশে খানিকটে ভুসস মাখিয়ে দেয়। তোর কপালে তো আর ভুসো মাখাতে পারিনে তাই কথা দিয়ে সেরে নিলুম। যাকে এত গালাগাল দিচ্ছি, যম তাকে নেবে কেন? পরমায়ু বেড়ে যাবে। বুঝলি?
লক্ষ্য করলুম গেল বার দোস্ত মুহম্মদ আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করেছিলেন এবারে সেটা তুইয়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
ফার্সী ভাষায় আপনি, তুমি, তুই তিন বাক্য নেই। আছে শুধু শোমা আর তো। কিন্তু ঐ তো দিয়ে তুমি, তুই দুই-ই বোঝানো যায় যে রকম ইংরিজীতে যখন বলি, ড্যাম ইউ, তখন তার অর্থ আপনি চুলোয় যান, নয়, অর্থ তখন তুই চুলোয় যা। খাঁটি পাঠান আবার শোমা কথাটাও ব্যবহার করে না, ইংরেজের মত শুধু ঐ এক ইউই জানে। বেদুইনের আরবীতেও মাত্র এক আনতা। বোধ হয় পাঠান, ইংরেজ, বেদুইনের ডিমোক্র্যাসি তার সম্বোধনের সময় প্রকাশ পেয়েছে।
দোস্ত মুহম্মদ স্মরণ করিয়ে দিলেন প্যারিসফের্তা সইফুল আলমের ছোট ভাইয়ের বিয়ের নেমন্তন্ন। সইফুল আলম তাকে পাঠিয়েছেন আমাকে নিয়ে যেতে। গাড়ি তৈরী।
সিগরেট দিয়ে বললুম, খান।
বললেন, না। আবদুর রহমানকে বলল তামাক দিতে।
আমি বললুম, আবদুর রহমানকে চেনেন তা হলে।
বললেন, তোমাকে কে চেনে বাপু, তুমি তো দুদিনের চিড়িয়া আমাকে কে চেনে বাপু, আমিও তিন দিনের পাখি— যে-পাহাড় থেকে নেমে এসেছি, সে-পাহাড়ের গর্ভে আবার ঢুকে যাব, আগা আহমদের টাকাটা মেয়ে। আমি কে? মকতবে আমানিয়ার অধ্যাপক অবশ্যি বটি, কিন্তু কটা লোক জানে। অথচ বাজারে গিয়ে পুছছ, দেখবে সবাই জানে, আমি হচ্ছি সেই মূর্খ, যার কাঁধে বন্দুক রেখে আগা আহমদ শিকার করে; অর্থাৎ আগা আহমদের মনিব। তুমি কে? যার কাধে আবদুর রহমান বন্দুক রেখেছে–শিকার করে কি না-করে পরে দেখা যাবে। চাকর দিয়ে মনিব চিনতে হয়।
আমি বললুম, বেশ, বেশ। তারপর বাঙলায় বললুম, গোঁপের আমি, গোঁপের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।
বললেন, বুঝিয়ে বল।
তর্জমা শুনে দোস্ত মুহম্মদ আনন্দে আত্মহারা। শুধু বলেন আফরীন, আফরীন, সাবাস, সাবাস, উদা কবিতা, জরির কলম। তারপর মুখে মুখে শেষ লাইনের একটা অনুবাদও করে ফেললেন,
মনে বুরুৎ, তনে বুরুৎ, বুরুৎ সনাক্তদার।। তারপর বললেন, আমি আরবী, ফার্সী, আর তুর্কী নিয়ে কিছু কিছু নাড়াচাড়া করেছি, কিন্তু ভাল রসিকতা কোথাও বিশেষ দেখিনি। পদ্যে তো প্রায় নেই-ই। বাঙলায় বুঝি এরকম অনেক মাল আছে?
আমি বললুম, না, মাত্র দুখানা কি আড়াইখানা বই।
দোস্ত মুহম্মদ নিরাশ হয়ে বললেন, তাহলে আর বাঙলা শিখে কি হবে।
পেশাওয়ারের আহমদ আলী আর কাবুলের দোস্ত মুহম্মদে একটা মিল দেখতে পেলুম— দুজনই অল্প রসিকতায় খুব মুগ্ধ হন। তফাতের মধ্যে এইটুকু যে, আহমদ আলীর জীবনের ধারা বয়ে চলেছে আর পাঁচজনের মত, আর দোস্ত মুহম্মদের জীবন যেন নিঝরের স্বপ্নভঙ্গ। এক পাথর থেকে আরেক পাথরে লাফ দিয়ে দিয়ে এগিয়ে চলেছে, মাঝখানে রসিকতার সূর্যকিরণ পড়লেই রামধনুর রঙ মেখে নিচ্ছে। দু-একবার মামুলি দুঃখকষ্টের কথা বলতে গিয়ে দেখলুম, সে সব কথা তার কানে যেন পৌচচ্ছেই না। বিলাসব্যসনেও শখ নেই। তিনি যেন সমস্তক্ষণ বোম্বাগড়ের সন্ধানে যেখানে রাজার পিসি পাঁউরুটিতে পেরেক ঠোকেন, যেখানে পণ্ডিতেরা টাকের উপর ডাকের টিকিট আঁটেন।
