জানি, পণ্ডিত মাত্রই সন্দেহ-পিশাচ। আপনিও বলবেন, না হয় মানলুম, জলালাবাদের জমির শুধু উপরেই নয়, নিচেও বিস্তর সোনার ফসল ফলে আছে, কিন্তু প্রশ্ন, চতুর্দিক থেকে অ্যাদ্দিন ধরে ঝাঁকে ঝাঁকে বুলবুলির পাল সেখানে ঝামেলা লাগায়নি কেন?
তার কারণ তো বেতারবাণী বহু পূর্বেই বলে দিয়েছেন। ইংরেজ এবং অন্য হরেক রকম সাদা বুলবুলিকে আফগান পছন্দ করে না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পাণ্ডিত্যাম্বরে উপস্থিত যে কয়টি পক্ষী উডডীয়মান তাদের সর্বাঙ্গে শ্বেতকুষ্ঠ, এখানে তাদের প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু আপনার রঙ দিব্য বাদামী, আপনি প্রতিবেশী, আফগান আপনাকে বহু শতাব্দী ধরে চেনে— আপনি না হয় তাকে ভুলে গিয়েছেন, আপনারি জাতভাই বহু ভারতীয় এখনো আফগানিস্থানে ছোটখাটো নানা ধান্দায় ঘোরাঘুরি এমন কি বসবাসও করে, আপনাকে আনাচে কানাচে ঘুরতে দেখলে কাবলীওয়ালা আর যা করে করুক, আঁৎকে উঠে কেঁৎকা খুজবে না।
তবু শুনবেন না? সাধে বলি, সব কিছু পণ্ড না হলে পণ্ডিত হয় না।
১১. মোটর ছাড়ল অনেক বেলায়
মোটর ছাড়ল অনেক বেলায়। কাজেই বেলাবেলি কাবুল পৌঁছবার আর কোনো ভরসাই রইল না।
পেশাওয়ার থেকে জলালাবাদ এক শ মাইল, জালালাবাদ থেকে কাবুল আরো এক শ মাইল। শাস্ত্রে লেখে সকালে পেশাওয়ার ছেড়ে সন্ধ্যায় জলালাবাদ পৌঁছবে। পরদিন ভোরবেলা জলালাবাদ ছেড়ে সন্ধ্যায় কাবুল। তখনই বোঝা উচিত ছিল যে, শাস্ত্র মানে অল্প লোকেই। পরে জানলুম একমাত্র মেল বাস ছাড়া আর কেউ শাস্ত্রনির্দিষ্ট বেগে চলে না।
জলালাবাদের আশেপাশে গাঁয়ের ছেলেরা রাস্তায় খেলাধুলো করছে। তারি এক খেলা মোটরের জন্য রাস্তায় গোলকধাঁধা বানিয়ে দেওয়া। কায়দাটা নূতন। কাবুলীরা যে আণ্ডার মত শক্ত টুপির চতুর্দিকে পাগড়ি জড়ায় ছোঁড়া সই টুপি এমনভাবে রাস্তায় সাজিয়ে রাখে যে, হুশিয়ার হয়ে গাড়ি না চালালে দুটো চারটে থেলে দেবার সম্ভাবনা। দূর থেকে সেগুলো দেখতে পেলেই সর্দারজী দাড়িগোঁফের ভিতরে বিড়বিড় করে কি একটা গালাগাল দিয়ে মোটরের বেগ কমান। কয়েকবার এ রকম লক্ষ্য করার পর বললুম, দিন না দুটো-চারটে থেলে। ছোঁড়াদের তাহলে আক্কেল হয়। সর্দারজী বললেন, খুদা পনাহ,। এমন কর্ম করতে নেই। আর টায়ার ফঁসাতে চাইনে। আমি বুঝতে না পেরে বললুম, সে কি কথা, এই টুপিগুলো আপনার টায়ার ছাদা করে দেবে? তিনি বললেন, আপনি খেলাটার আসল মর্মই ধরতে পারেননি। টুপির ভিতরে রয়েছে মাটিতে শক্ত করে পোঁতা লম্বা লোহা। যদি টুপি বাঁচিয়ে চলি তবে গাড়ি বাঁচানো হল, যদি টুপি থেৎলাই, তবে সঙ্গে সঙ্গে নিজের পায়ে কুড়োল মারা হল।
আমি বললুম, অর্থাৎ ছোকরারা মোটরওয়ালাদের শেখাতে চায়, পরের অপকার করিলে নিজের অপকার হয়।
সর্দারজী বললেন, ওঃ, আপনার কি পরিষ্কার মাথা।
বেতারবাণী বললেন, কিন্তু প্রশ্ন, এই মহান শিক্ষা এল কোথা হতে?
আমি নিবেদন করলুম, আপনিই বলুন।
তিনি বললেন, ছোঁড়াদের খেলাতে রয়েছে, বৌদ্ধধর্মের মহান আদর্শের ভগ্নাবশেষ। জানেন, এককালে এই অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের প্রচুর প্রসারপ্রতিপত্তি ছিল।
আমি বললুম, তাই তো শুনেছি।
তিনি বললেন, শুনেছি মানে? একটুখানি ডাইনে হটলেই পোঁছবেন হাদ্দায়। সেখানে গিয়ে স্বচক্ষে দেখতে পাবেন কত বৌদ্ধ মূর্তি বেরিয়েছে মাটির তলা থেকে। আপনি কি ভাবছেন, সে আমলের লোক নানা রকম মূর্তি জড়ো করে যাদুঘর বানাত?
এ যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার প্রশ্ন, কনিষ্কের আমলে গান্ধারবাসীরা যাদুঘর নির্মাণ করিত কি না?
ফেল মারলুম। কিন্তু বাঙালী আর কিছু পারুক না পারুক, বাজে তর্কে খুব মজবুত। বললুম, কিন্তু কাল রাত্রে সরাইয়ে নিজের জান-মাল, থুড়ি, মালজান সম্বন্ধে যে সতর্কতার হুঙ্কার শুনতে পেলুম তা থেকে তো মনে হল না প্রভু তথাগতের সাম্যমৈত্রীর বাণী শুনছি।
বেতারবার্তা বললেন, ঠিক ধরেছেন। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্ম হচ্ছে অহিংস শিশুশাবক ও এলোমে ধর্ম। পূর্ণবয়স্ক, প্রাণবন্ত দুধ পুরুষের ধর্ম হচ্ছে ইসলাম।
আমি বললুম, বিলক্ষণ।
সর্দারজী খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে থেকে বললেন, আমি তো গ্রন্থসাহেব মানি কিন্তু একথা বার বার স্বীকার করব যে, এই আধাইনসান পাঠান জাতকে কেউ যদি ধর্মের পথে নিয়ে যেতে পারে তবে সে ইসলাম।
আমি তো ভয় পেয়ে গেলুম। এইবার লাগে বুঝি। আধাইনসান অর্থাৎ অর্ধ-মনুষ বললে কার রক্ত গরম না হয়। কিন্তু বেতারবাণী অত্যন্ত সৌম্য বৌদ্ধ কণ্ঠে বললেন, আপনি বিদেশী এবং আমাদের সকলের চেয়ে বেশী লোকজনের সংস্রবে এসেছেন, তার উপর আপনি বয়সে প্রবীণ। আপনার এই মত শুনে ভারী খুশী হলুম।
আমি আরো আশ্চর্য হয়ে গেলুম। কৌতূহল দমন করতে না পেরে গাড়ির ঝড়ঝড়ানির সঙ্গে গলা মিলিয়ে সর্দারজীকে আস্তে আস্তে উর্দুতে শুধালুম, একি কাণ্ড? আপনি এর জাত তুলে একে আধা-ইনসান বললেন আর ইনি খুশী হয়ে আপনাকে তসলীম করলেন!
সর্দারজী আরো আশ্চর্য হয়ে বললেন, ইনি চটবেন কেন? ইনি তো কাবুলী।
আমি আরো সাত হাত জলে। ফের শুধালুম, কাবুলী পাঠান নয়?
সর্দারজী তখন আমার অজ্ঞতা ধরতে পেরে বুঝিয়ে বললেন, আফগানিস্থানের অধিবাসী পাঠান। কিন্তু খাস কাবুলের লোক ইরান দেশ থেকে এসে সেখানে বাড়িঘরদোর বেঁধে শহর জমিয়েছে। তাদের মাতৃভাষা ফার্সী। পাঠানের মাতৃভাষা পশতু। বেতারের সায়েব পশতু ভাষার এক বর্ণও বোঝে না।
