মোট কথা সেই থেকে এই বাড়ি অভিশপ্ত বাড়ি বলে পরিচিত। কেউ আর সে বাড়িতে থাকেনি। সকলের পক্ষে সম্ভবও হত না, কারণ এত পেল্লায় বাড়ি মেনটেন করা মুখের কথা নয়। আসবাবপত্র যা ছিল সবই নাকি কনওয়ের এক আত্মীয় বিলেত থেকে এসে নিলামে বিক্রি করে দেয়।
রাধানাথ সব শুনে-টুনে বলল, কনওয়ে কাপ্ল সম্বন্ধে একটা ঘটনা শুনেছি সেটা স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
কোন স্বদেশি আন্দোলন? প্রশ্ন করলেন আপ্টে।
বালগঙ্গাধর তিলকের সময়কার, বললে রাধানাথ। উনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে। মেজর লেথব্রিজ বলে এক সাহেবকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল এক সন্ত্রাসবাদী দল। তারা নাকি ওই কাসূলে তাদের গুপ্ত ডেরা করেছিল। পরে আত্মসমর্পণ করে। তবে তাদের লিডার আচরেকারকে নাকি ধরা যায়নি। সে বেপাত্তা হয়ে যায়।
কনওয়ে কালে খোঁজ করা হয়েছিল কি? আপৃটে প্রশ্ন করলেন। আগাশে হো হো করে হেসে উঠলেন।
মিঃ আপ্টে–পুলিশও মানুষ। তাদেরও ভুতের ভয় আছে। ওই অভিশপ্ত বাড়ি রেড করতে গেলে রীতিমতো হিম্মৎ লাগে।
এদিকে আমার কৌতূহল চাগিয়ে উঠেছে। ছেলেবেলা থেকেই ডানপিটেমোর শখ। সেটা চৌত্রিশ বছরেও পুরোপুরি বজায় আছে। পর পর অতগুলো মৃত্যু যেখানে ঘটেছে, সেই বাড়ির ভেতরে দু-একটা প্রেতাত্মা বসবাস করবে না কি? বাজি জেতার পক্ষে এ যে একটা বড় সুযোগ।
এর কিছুদিন পরেই হেলমার সাহেব আবার এলেন আড্ডায় তাঁর টেলিফুংকেন টেপ রেকর্ডার নিয়ে। ভদ্রলোকের বাঁ কব্জিতে ব্যান্ডেজ। বললেন কাঁটা ঝোপে হাত কেটে গেছে। মুখের ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে না সুখবর না দুঃসংবাদ। তাঁকে বসতে দিয়ে সকলেই তাঁর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিলুম। হুতোমের ডাক শোনা যাবে কি?
হেলমার কপালের ঘাম মুছে বললেন, ডাক তুলতে পেরেছি, তবে পারফেক্ট হল না। রাত বারোটার পর প্যাঁচাটা ডাকল, সঙ্গে সঙ্গে মেশিন চালু করলাম। তখন শহরের অন্য শব্দ প্রায় নেই বললেই চলে। নিয়মমতো নিখুঁত রেকর্ডিং হবার কথা, কিন্তু দেখ কী হয়েছে।
শুনলাম প্যাঁচার ডাক। ছেলেবেলা আমাদের বাদুড়বাগানের বাড়ির পাঁচিলের ওপারে পুকুরের ধারে শ্যাওড়া গাছে একটা হুতোম প্যাঁচা থাকত, তাই তার ডাক চেনা ছিল। ইনিও যে হুতোম তাতে কোনও ভুল নেই। কিন্তু ডাকের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা শব্দ তাকে সত্যিই বড্ড ডিস্টার্ব করছে। সাহেবের এত মেহনত ষোলো আনা সার্থক হল না জেনে তাঁর প্রতি মমতা হল।
বাট হোয়াট ইজ দ্যাট আদার সাউন্ড? প্রশ্ন করল কুরেশি। সে দাবা ছেড়ে এগিয়ে এসেছে।
সেটাই তো বুঝতে পারছি না, বললেন হেলমার। মেশিনেই গণ্ডগোল বলে মনে হচ্ছে। এর আগে তো এ রকম হয়নি কখনও।
শুনলে মনে হয় একটা যান্ত্রিক শব্দ। ঘটাং ঘটাং ঘটাং ঘটাং এই রকম। খুবই ক্ষীণ, কিন্তু জার্মান পক্ষিবিদ-এর মন যে তাতে খুঁত খুঁত করবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।
প্লে দ্যাট এগেন প্লিজ! হঠাৎ বলে উঠলেন ইনস্পেক্টর আগাশে। তাঁর শরীরটা টান, আর চোখে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি–শিকারের গন্ধ পেলে যেমন হয় হিংস্র জানোয়ারের।
হেলমার টেপটা ব্যাক করে আবার চালালেন। আগাশে কোমর থেকে শরীরটা ভাঁজ করে কানটা নিয়ে গেছেন একেবারে স্পিকারের সামনে।
ততক্ষণে অবিশ্যি আমিও বুঝে গেছি আগাশে কী ভাবছেন।
শব্দটা শুনে প্রিন্টিং মেশিনের কথা মনে হয়। ছোট, পায়ে-চালানোর কল। যাকে বলে ট্রেল মেশিন।
এইরকম যন্ত্রই সাধারণত ব্যবহার হয়ে থাকে নোট জাল করার কাজে।
শব্দটা কাসলের ভিতর থেকেই আসছে না অন্য কোথাও থেকে আসছে সেটা অবিশ্যি বোঝার কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু আগাশে স্থির করলেন যে কনওয়ে কাসূলে পুলিশের রেড হবে। আগাশের হুমকিতে নাকি কিছু কস্টেবল রাজি হয়েছে অভিশপ্ত দুর্গে প্রবেশ করতে। এমনি খোশমেজাজ হলে কী হবে, অফিসার হিসেবে নাকি ভদ্রলোক অত্যন্ত কড়া।
আমি কিঞ্চিৎ নিরাশ বোধ করছি। জালিয়াতরা যেখানে আস্ত। না গেড়েছে সেখানে ভূত থাকার কোনও সম্ভাবনা আছে কি? মনে তো হয় না।
পরদিনই রাত্তিরে রেড, আড্ডার সকলে ফলাফলের জন্য উদগ্রী, এমন সময় ইনস্পেক্টর সাহেব এসে হাজির।
সেকী, তোমাদের তো আজই রেড হবার কথা।
আমাদের হয়ে আপ্টেই বিস্ময় প্রকাশ করলেন।
আগাশে একটা বোকা হাসি হেসে মাথা নেড়ে সোফায় বসে পড়লো।
ভাবতে পার? আজ বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সে গ্যাং ধরা পড়েছে।
কোথায়? আমরা সমস্বরে জিজ্ঞেস করে উঠলাম।
নাসিক, বললেন আগাশে।
তা হলে ওই শব্দটা…?
টেপরেকর্ডারেই কোনও গণ্ডগোল হবে। ওটা বাইরের কোনও শব্দ না। কাল মাঝ রাত্তিরে আমি কাসূলের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে কোনও শব্দ পাইনি।
আর কিছু বলবার নেই। সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যে একটা বেলুন চুপসানো ভাব, অথচ তার কোনও কারণ নেই। জালিয়াতের দল ধরা পড়েছে এ তো ভাল কথা; শুধু পুনার কনওয়ে কাসূলে ধরা না পড়ে পড়েছে অন্য শহরের অন্য জায়গায়। কিন্তু তাও বলতে হবে যা ঘটেছে তার মধ্যে যেন নাটকের অভাব।
অবিশ্যি পরমুহূর্তেই মনে হল–জালিয়াত যখন নেই, তখন ভূত থাকতে বাধা কী? কনওয়ে কাসূলে একবার হানা দিলে দোষ কী?
চা-টা শেষ করে আমিই কথাটা পেড়ে বসলাম, কে কে যেতে রাজি আছ বলো।
যোশী গোড়াতেই বললে তার ধুলোয় অ্যালার্জি, তাই ওই পোড়ো বাড়িতে যাওয়া সম্ভব নয়। হরিহরণ বললেন, আমি যাব, কিন্তু আপ্টে সাহেবেরও যাওয়া চাই। ভূত যদি থাকে তো সেটা ওঁর চাক্ষুষ দেখা উচিত। আমাদের কথা উনি মানতে নাও পারেন।
