এখন অনেকটা সুস্থ বোধ করছি, বললেন ভদ্রলোক। গত কদিনের ধকল আমাকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। আমি আর পেরে উঠছিলাম না। আমার পক্ষে এ এক চরম বিভীষিকা। একদিন যে-মিউজিয়ম আমারই জিম্মায় ছিল, সেই মিউজিয়মের ঘরেই আমাকে ধরা দিতে হল চোরের মতো! অথচ আপনাকেই বা দোষ দেব কী করে? আপনি আপনার কর্তব্য পালন করেছেন। আমি শুধু এটাই চেয়েছিলাম যে, কেউ টের পাবার আগে আমি যেন আমার কাজটা শেষ করতে পারি। সেটা আজ রাত্রেই হয়ে যেত, কিন্তু…।
আপনি ভিতরে ঢুকলেন কী করে? প্রশ্ন করল মর্টিমার।
আপনি যে দরজা ব্যবহার করেন, সেই দরজা দিয়ে, বললেন প্রোফেসর অ্যাড্রিয়াস। কাজটা অত্যন্ত গর্হিত, কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ সৎ। সেখানে কোনও দোষ ধরতে পারবে না কেউ। আসল ঘটনাটা জানলে আপনিও আমাকে আর গাল দেবেন না। আপনার বাসস্থানের দরজার একটা চাবি আর মিউজিয়মে ঢোকার একটা চাবি আমার কাছে ছিল। চাকরি ছাড়ার সময় সেগুলি ফেরত দিইনি। মিউজিয়ম থেকে দর্শকের দল বাইরে বেরোনো মাত্র আমি হলঘরে ঢুকে মমি-কেসটার ভিতর লুকিয়ে পড়তাম। তার পর নিরাপদ বুঝে বেরিয়ে এসে যা করার তা করতাম। যতবার সিম্পসনের পায়ের শব্দ পেতাম, তত বারই আমাকে মমি-কেসের ভিতর আশ্রয় নিতে হত। তারপর কাজ শেষ হলে, যেভাবে ঢুকেছি সেই পথেই বেরিয়ে আসতাম।
তার মানে আপনি একটা মস্ত ঝুঁকি নিয়েছিলেন?
নিতেই হয়েছিল।
কিন্তু কেন? কোন উদ্দেশ্যে আপনাকে এরকম একটা জঘন্য কাজ করতে হল? পাশেই। টেবিলের উপর রাখা কবচটার দিকে হাত দেখিয়ে বলল মর্টিমার।
এ ছাড়া কোনও রাস্তা ছিল না। অনেক ভেবেও আর কোনও উপায় খুঁজে পাইনি। এ না করলে লোকমুখে আমার বদনাম ছড়িয়ে পড়ত আর সেইসঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনেও আমাকে গভীর শোক ভোগ করতে হত। আমি যা করেছি তা মঙ্গলের জন্যই, যদিও আপনার পক্ষে এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আমি চাই আমার কথা সত্য প্রমাণ করার সুযোগ আপনি দেবেন।
আপনার কী বলার আছে শোনার পর আমি আমার কর্তব্য স্থির করব, দৃঢ়স্বরে বলল মর্টিমার।
আমি কিছুই গোপন রাখব না, সব কথা অকপটে আপনাকে বলব। তারপর আপনি কী করেন, সেটা আপনার মর্জি।
আসল ব্যাপারটা তো আর আমাদের জানতে বাকি নেই।
আসল ব্যাপার আপনি কিছুই জানেন না। প্রথমে কয়েক সপ্তাহ আগের একটা ঘটনায় ফিরে যেতে দিন, তারপর আমি সব বুঝিয়ে বলব। এটুকু বিশ্বাস করুন যে, আমি যা বলছি তার মধ্যে একবর্ণ মিথ্যে নেই।
যে ব্যক্তি ক্যাপ্টেন উইলসন বলে নিজের পরিচয় দেন, তার সঙ্গে আপনাদের আলাপ হয়েছে। আমি এইভাবে বলছি, কারণ আমি এখন জানতে পেরেছি যে, এটা তার আসল পরিচয় নয়। ওর সঙ্গে আমার কী করে আলাপ হল, কী করে সে আমার বিশ্বাসের পাত্র হয়ে উঠল, এবং কী করে সে আমার মেয়ের ভালবাসা আদায় করল, এসব বুঝিয়ে বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। সে এখানে আসার সময় বিদেশের অনেক জ্ঞানী-গুণীর কাছ থেকে প্রশংসাপত্র নিয়ে এসেছিল; তাই তাকে আমার আমল দিতে হয়। তা ছাড়া তার নিজেরও যে গুণ নেই, তা নয়। তাই শেষ পর্যন্ত আমি খুশি হয়েই তাকে নিয়মিত আমার বাড়িতে আসতে দিই। যখন জানলাম যে আমার মেয়ে এই যুবকের প্রতি আকৃষ্ট, তখন মনে হয়েছিল যে ঘটনাটা যেন একটু বেশি দ্রুত ঘটে গেল। কিন্তু আমি অবাক হইনি, কারণ উইলসনের স্বভাব আর কথাবার্তায় এমন একটা মাধুর্য ছিল যে, সমাজের উঁচু স্তরে নিজের জন্য একটা জায়গা করে নেওয়া তারপক্ষে ছিল সহজ ব্যাপার।
প্রাচ্যের প্রাচীন শিল্পবস্তু সম্পর্কে তার উৎসাহ ছিল, এবং এ বিষয়ে জ্ঞানও ছিল যথেষ্ট। অনেক সময় সন্ধ্যাবেলা আমাদের বাড়িতে সময় কাটাতে এসে সে আমার অনুমতি নিয়ে মিউজিয়মে গিয়ে একা ঘুরে ঘুরে সব দেখত। বুঝতেই পারছেন, এ ব্যাপারে আমি নিজে উৎসাহী হওয়াতে তার অনুরোধে খুশি হয়েই সম্মত হতাম, আর আমার বাড়িতে তার ঘন ঘন আগমনে কোনও বিস্ময় বোধ করতাম না। এলিজের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ পাকাঁপাকি হয়ে যাবার পর প্রায় প্রতি সন্ধ্যা ছেলেটি আমার বাড়িতে কাটাত, এবং তার মধ্যে ঘণ্টাখানেক কাটাত মিউজিয়মে। সেখানে সে অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করত। এমনকী আমি যেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি থাকতাম না, সেদিনও সে এসে মিউজিয়মে কিছুটা সময় কাটিয়েছে। এই অবস্থার অবসান হয় তখনই, যখন আমি চাকরি ছেড়ে নরউডে চলে যাই, এবং নানা বিষয় নিয়ে বই লেখার তোড়জোড় শুরু করি।
চাকরি ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই আমি যে লোককে নির্দ্বিধায় আপন করে নিয়েছিলাম, তার আসল চেহারাটা বুঝতে পারি। আমার বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া কয়েকটা চিঠি থেকে আমি জানতে পারি যে, যেসব পরিচয়পত্র উইলসন আমাকে দেখিয়েছিল, তার অধিকাংশই জাল। অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, এই ধাপ্পাবাজির পিছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে। সে যদি অর্থলোভী হয়ে থাকে তা হলে আমাকে দিয়ে তার কোনও কাজ হবে না, কারণ আমি ধনী নই। তা হলে সে এল কেন? তখন আমার খেয়াল হল যে, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান পাথরের বেশ কিছু রয়েছে আমার জিম্মায়, এবং নানান অজুহাতে একা মিউজিয়মে গিয়ে সেসব পাথরের কোষ্টা কোথায় আছে সেটা উইলসন দেখে এসেছে। অর্থাৎ সে হচ্ছে এক অতি ধূর্ত ব্যক্তি, যে আমার মিউজিয়মে চুরির সুযোগ খুঁজছে। এই অবস্থায়, তাকে অন্ধের মতো ভালবাসে আমার যে মেয়ে, তাকে কষ্ট না দিয়ে কী করে আমি উইলসনকে জব্দ করব? আমি অনেক ভেবে যে-পস্থা স্থির করলাম, সেটা বেয়াড়া তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কার্যকরী কোনও পস্থা আমার মাথায়। এল না। আমি যদি আপনাকে নিজের নামে চিঠি লিখতাম, তখন আপনি নিশ্চয়ই আমাকে নানা খুঁটিনাটি প্রশ্ন করতেন–যার উত্তর আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব হত না। তাই আমি নাম ছাড়াই চিঠি লিখে আপনাকে সতর্ক করে দিই।
