ভাণ্ডারকার উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে এমন দৃষ্টি এর আগে কখনও দেখিনি।
আমার কণ্ঠস্বর যথাসাধ্য সংযত করে বললাম, ভাণ্ডারকার, তুমি নেশা করেছ কিনা জানি না। কিন্তু তোমার কথার তীব্র প্রতিবাদ না করে আমি পারছি না। এতগুলো ছাত্রের ভবিষ্যৎ হাতে নিয়েও যার এমন। মতিভ্রম হতে পারে, তাকে আমি বন্ধু বলে মানতে রাজি নই। আমার এখনও একটা ক্ষীণ আশা আছে যে, এটা তোমার একটা রসিকতা; যদিও তাই বা হবে কেন জানি না, কারণ আজ তো পয়লা এপ্রিল নয়।
ভাণ্ডারকার এক পা পিছিয়ে গিয়ে বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল, অবনীশ, তোমাদের মতো লোকের সারা জীবনটাই হল পয়লা এপ্রিল, কারণ তোমরা বোকা বনেই আছ। আমিও তোমাদের দলেই ছিলাম এতদিন, কিন্তু এখন আর নেই। আমার চোখ খুলে গেছে। আমার ছাত্ররা যাতে আমার পথে চলতে পারে, এখন থেকে সেটাই হবে আমার লক্ষ্য। আমি ওদের বুঝিয়ে দেব যে, আজকের দিনেও যে কথাটা সত্যি সেটা হল সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের কথা–সারভাইভ্যাল অফ দি ফিটেস্ট। যারা সবল, তারা যদি তাদের শক্তি প্রয়োগ করে দুর্বলদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে, তবেই জগতের মঙ্গল।
যে শক্তির কথা আমি বলছি সেটা অল্পদিনের মধ্যেই পৃথিবীর লোকে অনুভব করবে–তুমিও করবে। বিশ্ব-মৈত্রীর ধোঁয়াটে অবাস্তব বুলিতে যারা বিশ্বাস করে, তাদের দিন ফুরিয়ে এসেছে, অবনীশ। কিন্তু আমরা
আছি, আমরা থাকব। আর আমাদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে, এবং বাড়বে। আমরাই হব পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি। আমি চললুম। গুড বাই।
কথা শেষ করে উলটোদিকে ঘুরে দৃপ্ত পদক্ষেপে গ্রিনহাউসের দরজার দিকে এগিয়ে যাবার সময়, একটা সাধারণ ফণীমনসার গায়ে ভাণ্ডারকারের বাঁ হাতটা ঘষে গেল।
একটা অস্ফুট আজাদ করে ভাণ্ডারকার তার কোটের পকেট থেকে একটা রুমাল বার করে হাতের ওপর চেপে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ করলাম রুমালে রক্তের ছোপ লেগেছে। ভাণ্ডারকারও দেখল সে রক্ত, তারপর তার বিস্ফারিত দৃষ্টি আমার দিকে মুহূর্তের জন্য নিক্ষেপ করে সে ঝড়ের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সে রক্তের কথা আমি কোনওদিনও ভুলব না, কারণ তার রঙ ছিল সবুজ।
ভাণ্ডারকার চলে যাবার পর আমি যে কতক্ষণ গ্রিনহাউসে বসে ছিলাম জানি না। কাল সারারাত ঘুমোতে পারিনি। আজ সকালে আমার প্রিয় সবুজ ঘরে গিয়ে যে দৃশ্য দেখেছি, তারপর আমার আর বেঁচে থাকার কোনও সার্থকতা আছে বলে মনে হয় না।
গিয়ে দেখি, আমার গাছপালার একটিও আর বেঁচে নেই। শুধু তাই নয়, প্রাণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সবুজ রঙটিও যেন কে শুষে নিয়েছে। যা রয়েছে, সেটা পাংশুটে–ভস্মের রঙ।…
আকাশবাণীর সাহিত্যবাসর অনুষ্ঠানে প্রচারিত।
১৬.২.৬৬, রাত্রি ৮টা।
সহদেববাবুর পোট্রেট
যেটার আগে নাম ছিল ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সেই মিরজা গালিব স্ট্রিটে ল্যাজারাসের নিলামের দোকানে প্রতি রবিবার সকালে সহদেববাবুকে দেখা যেতে শুরু করেছে মাস তিনেক হল।
প্রথম অবস্থায় লোকাল ট্রেনে হেঁয়ালির বই, গোপাল ভাঁড়ের বই, খনার বচনের বই, পাঁচালির বই, এইসব বিক্রি করে, তারপর সাত বছর ধরে নানারকম দালালির কাজ করে কমিশনের টাকা জমিয়ে সেই টাকায় ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করে আজ বছর পাঁচেক হল ইলেকট্রিক কেবলের ব্যবসা। করে সহদেব ঘোষ আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন, সেখানে সদানন্দ রোডে তাঁর একটি ছিমছাম ফ্ল্যাট, একটা ফিয়াট গাড়ি, টেলিফোন, টেলিভিশন, দুটো চাকর, একটা ঠাকুর আর একটা অ্যালসেশিয়ান কুকুর। আগে যারা তাঁর খুব কাছের লোক ছিল, তারা এখন তাঁকে দেখলে চট করে চিনতে পারে না, বা চিনলেও সাহস করে এগিয়ে এসে কথা বলে না। সহদেববাবুরও খুব ইচ্ছে নেই যে তারা তাঁকে চেনে; তাই তিনি গোঁফ রেখেছেন, ঝলপিটা এক ইঞ্চি বাড়িয়েছেন, আর চোখ খারাপ না হওয়া সত্ত্বেও একটা পাওয়ারবিহীন সোনার চশমা নিয়েছেন। অবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নতুন বন্ধু জুটেছে, যাঁরা তাঁর বাড়িতে রোজ সন্ধ্যায় এসে ভাল চা ভাল সিগারেট খান, প্লাস্টিকের তাসে তিন-তাস খেলেন, আর শনি রবিবার টেলিভিশনে হিন্দি বাংলা ছবি দেখেন।
ল্যাজারাসের দোকানে যাওয়ার কারণটা সহদেববাবুর বৈঠকখানায় গেলেই বোঝা যায়। প্রতি রবিবারই তিনি ঘরের শোভা বাড়ানোর জন্য নিলাম থেকে কিছু-না-কিছু শৌখিন জিনিস কিনে আনেন। ঘড়ি, ল্যাম্প, পিতল আর চীনে মাটির মূর্তি, রুপোর মোমবাতিদান, বিলিতি ল্যান্ডস্কেপ ছবি–ঘরের এ সব কিছুই ল্যাজারাসের দোকান থেকে আনা। এ ছাড়া টেবিল, চেয়ার, সোফা, কার্পেট ইত্যাদি তো আছেই।
আজ ল্যাজারাস কোম্পানির মিহিরবাবু কথা দিয়েছেন যে বিলিতি ঔপন্যাসিকদের ভাল এক সেট বই তিনি সহদেববাবুর জন্য ব্যবস্থা করে দেবেন। মিহিরবাবু অভিজ্ঞ লোক, বিশ বছর আছেন ল্যাজারাস কোম্পানিতে। বাঁধাধরা খদ্দেরদের চাহিদাগুলো তিনি আগে থেকে আন্দাজ করতে পারেন। সহদেবাবুর পছন্দও তাঁর ভালভাবেই জানা। এর আগেও অনেক হঠাৎ বড়লোকের চাহিদা তিনি মিটিয়েছেন। এঁরা অনেকেই যে লেখাপড়া বিশেষ না জানলেও ঝলমলে বিলিতি বই দিয়ে আলমারি সাজাতে ভালবাসেন সেটা মিহিরবাবু বিলক্ষণ জানেন।
ষোলোখানা বইয়ের সুদৃশ্য সেট, গাঢ় লাল চামড়ায় বাঁধানো, সহদেববাবুর দেখেই মনটা নেচে উঠেছিল। কিন্তু সেটা দেখার পরমুহূর্তেই, বইগুলো যে-টেবিলের উপর রাখা ছিল, তার পিছনেই দেয়ালে টাঙানো গিলটি করা ফ্রেমে বাঁধানো একটা ছবি দেখে তিনি কেমন যেন হকচকিয়ে গিয়ে বইয়ের কথাটা সাময়িকভাবে ভুলেই গেলেন।
