আমার আগে থেকেই ফন্দি আঁটা ছিল। ভাঁড়ারঘর থেকে লুকিয়ে এক চিমটে চিনি এনে কাগজে মুড়ে আমার বালিশের পাশে রেখে দিয়েছিলাম। তার থেকে একটা বেশ বড় দানা বার করে জানলার উপরে রাখলাম।
পিঁপড়েটা হঠাৎ থমকে থেমে গেল। তারপর আস্তে আস্তে দানাটার কাছে এগিয়ে গিয়ে সেটাকে বার কয়েক এদিক থেকে ওদিক গুঁতিয়ে দেখল। তারপর হঠাৎ কী জানি ভেবে বোঁ করে ঘুরে নর্দমার ভিতর চলে গেল।
আমি ভাবলাম, বা রে বা, এমন সুন্দর খাবার জিনিসটা দিলাম, আর পিঁপড়েভায়া সেটা ফেলেটেলে উধাও? তা হলে আসবারই কী দরকার ছিল?
কিছুক্ষণ পরেই ডাক্তারবাবু এলেন। এসে আমার নাড়ি দেখলেন, জিভ দেখলেন, আর বুকে পিঠে স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে দেখলেন। দেখেটেখে বললেন যে তেতো, ওষুধটা আরও দুবার খেতে হবে, আর খেলে নাকি দুদিনের মধ্যেই জ্বর ছেড়ে যাবে।
আমার তো শুনে মনই খারাপ হয়ে গেল। জ্বর ছাড়া মানেই ইস্কুল, আর ইস্কুল মানেই দুপুরটা মাটি। দুপুরবেলাই যে যত পিঁপড়ে আসে আমার জানলা দিয়ে।
যাই হোক, ডাক্তারবাবু ঘর থেকে বেরোনোমাত্র আবার জানলার দিকে চাইতেই আমার মন আবার ভাল হয়ে গেল।
এবার একটা নয়, একেবারে সারবাঁধা পিঁপড়ের দল বেরিয়ে আসছে নর্দমা দিয়ে। নিশ্চয়ই সামনের পিঁপড়েটা আমার চেনা পিঁপড়ে, আর নিশ্চয়ই ও-ই গিয়ে চিনির খবরটা দিয়ে অন্য পিঁপড়েগুলোকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।
একটুক্ষণ চেয়ে থাকতেই পিঁপড়ের বুদ্ধির নমুনাটা নিজের চোখেই দেখলাম। পিঁপড়েগুলো সবাই একজোটে চিনির দানাটাকে ঠেলতে ঠেলতে নর্দমার দিকে নিয়ে চলল। সে যে কী মজার ব্যাপার তা না দেখলে বোঝা যায় না। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম, আমি যদি পিঁপড়ে হতাম তা হলে নিশ্চয়ই শুনতাম ওরা বলছে–মারো জোয়ান, হেঁইও! আউর ভি থোড়া, হেঁইও! চলে ইঞ্জিন, হেঁইও!
.
জ্বর ছাড়ার পর প্রথম কয়েক দিন ইস্কুলে খুব খারাপ লাগত। ক্লাসে বসে খালি খালি আমার জানলার কথা মনে হত। না-জানি কত রকম পিঁপড়ে সেখানে আসছে আর যাচ্ছে। অবিশ্যি আমি আসার আগে রোজই দু-তিনটে চিনির দানা জানলায় রেখে আসতাম, আর বিকেলে ফিরে গিয়ে দেখতাম সেগুলো আর নেই।
ক্লাসে আমি বেশিরভাগ দিন বসতাম মাঝখানের একটি বেঞ্চিতে। আমার পাশে বসত শীতল। একদিন পৌঁছতে একটু দেরি হয়েছে, আর গিয়ে দেখি শীতলের পাশে ফণী বসে আছে। আমি আর কী করি, পিছনের দিকে দেয়ালের সামনে একটা খালি জায়গা ছিল, সেখানেই বসলাম।
টিফিনের আগের ক্লাসটা ছিল ইতিহাসের। হারাধনবাবু তাঁর সরু গলায় হ্যানিবলের বীরত্বের কথা বলছিলেন। হ্যানিবল নাকি কার্থেজ থেকে সৈন্য নিয়ে পুরো আল্পস পাহাড়টা ডিঙিয়ে ইতালি আক্রমণ করেছিলেন।
শুনতে শুনতে হঠাৎ কীরকম জানি মনে হল যে, হ্যানিবলের সৈন্য এই ঘরের মধ্যেই রয়েছে আর আমার খুব কাছ দিয়েই চলেছে।
এদিক-ওদিক চাইতেই আমার পিছনের দেয়ালে চোখ পড়ল। দেখলাম একটা বিরাট লম্বা পিঁপড়ের লাইন দেয়াল বেয়ে নেমে আসছে। ঠিক সৈন্যের মতো সারি সারি অসংখ্য কালো কালো খুদে খুদে পিঁপড়ে, একটানা একভাবে চলেছে তো চলেইছে।
নীচের দিকে চেয়ে দেখি মেঝের কাছে দেয়ালে একটা ফাটল, আর সেই ফাটল দিয়ে পিঁপড়েগুলো বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে।
টিফিনের ঘণ্টা পড়তেই দৌড়ে চলে গেলাম বাইরে, আমাদের ক্লাসের পিছন দিকটায়। গিয়ে সেই ফাটলটা খুঁজে বার করলাম। দেখলাম পিঁপড়েগুলো ফাটল দিয়ে বেরিয়ে ঘাসের ফাঁক দিয়ে সোজা চলেছে পেয়ারা গাছটার দিকে।
পিঁপড়ের লাইন ধরে গিয়ে পেয়ারা গাছের গুঁড়ির কাছেই যে জিনিসটা বেরোলো, সেটাকে দুর্গ ছাড়া আর কী বলব?
স্পষ্ট দেখলাম একটা দুর্গের মতো উঁচু মাটির ঢিবি, তার তলার দিকে একটা গেট, আর সেই গেট দিয়ে সার বেঁধে ভিতরে ঢুকছে পিঁপড়ের সৈন্যদল।
আমার ভীষণ ইচ্ছে হল দুর্গের ভিতরটা একটু দেখি।
পকেটে আমার পেনসিলটা ছিল, তার ডগাটা দিয়ে ঢিবির উপরের মাটিটা আস্তে আস্তে একটু একটু করে সরাতে লাগলাম।
প্রথমে কিছুই বেরোল না, কিন্তু তারপর যা দেখলাম তাতে সত্যিই আমি অবাক! দুর্গের ভিতর, অসংখ্য ছোট ছোট খুপরি আর সেই খুপরির একটা থেকে আরেকটায় যাবার জন্য অসংখ্য কিলবিলে সুড়ঙ্গ। কী আশ্চর্য, কী অদ্ভুত! এই খুদে খুদে হাত-পা দিয়ে এরকম ঘর বানাল কী করে এরা? এত বুদ্ধি হল কী করে এদের? এদেরও কি ইস্কুল আছে, মাস্টার আছে? এরাও কি লেখাপড়া শেখে, অঙ্ক কষে, ছবি আঁকে, কারিগরি শেখে? তা হলে কি মানুষের সঙ্গে এদের কোনওই তফাত নেই, খালি চেহারা ছাড়া? কই, বাঘ ভাল্লুক হাতি ঘোড়া এরা তো নিজের বাড়ি নিজেরা তৈরি করতে পারে না। এমনকী ভুলোর মতো পোষা কুকুরও পারে না।
অবিশ্যি পাখিরা বাসা করে। কিন্তু তাদের একটা বাসাতে আর কটা পাখি থাকতে পারে? এদের মতো দুর্গ বানাতে পারে পাখি, যাতে হাজার হাজার পাখি একসঙ্গে থাকবে?
দুর্গের খানিকটা ভেঙে যাওয়াতে পিঁপড়েদের মধ্যে খুব গোলমাল পড়ে গিয়েছিল। আমার খুব কষ্ট হল। মনে মনে ভাবলাম, এদের যখন ক্ষতি করেছি, তখন এবার উলটে কোনও উপকার করতে হবে। তা না হলে আমাকে ওরা শত্রু বলে ভাববে, আর আমি সেটা মোটেই চাই না। আসলে তো আমি ওদের বন্ধু!
তাই পরদিন ইস্কুল যাবার সময় মা আমাকে যে সন্দেশটা খেতে দিয়েছিলেন তার অর্ধেকটা খেয়ে বাকিটা একটা শালপাতায় মুড়ে প্যান্টের পকেটে নিয়ে নিলাম।
