কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়।
পুলিশে ডায়রি ইত্যাদি যা করবার সে তো হলই। এখানে বলে রাখি যে শেষ পর্যন্ত ইনস্পেক্টর যশোবন্ত সিং এবং তাঁর দলের লোকেরা জাহাঙ্গীরের লকেট সমেত চোরাই মালের অধিকাংশই উদ্ধার করেছিলেন, ডাকাতদলের সাতজন ধরা পড়েছিল, তবে টোটা সিং উধাও। কিন্তু এ সবের আগে আমাকে জড়িয়ে যে ঘটনাটা ঘটল তার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।
ডাকাতির দুদিন পরের সন্ধেবেলা।
ছাত্র পড়ানোর ঘরে গেছি যথারীতি সাতটার সময়, সরবতও খাওয়া হয়ে গেছে, এমন সময় অনুভব করলাম মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। ছাত্র তখনও আসেনি, এদিকে ক্রমেই বুঝতে পারছি যে চোখের সামনের জিনিসগুলো দেখতে যেন রীতিমতো কষ্ট করে দৃষ্টি ফোকাস করতে হচ্ছে।
কী যে হল কিছুই বুঝতে পারছি না, শুধু এটুকু বুঝছি যে এ অবস্থায় পড়ানো অসম্ভব।
এমন সময় শ্রীমান মহাবীর সিং-এর প্রবেশ। তার হাতে একটা হলদে কাগজ–হ্যান্ডবিলের মতো।
অবাক হয়ে দেখলাম তাতে আমারই ছবি।
টোটা সিং, বলল মহাবীর, তার চোখ জ্বল জ্বল করছে।
টোটা সিং? কী বলছে ছেলেটা পাগলের মতো। স্পষ্ট দেখছি যে আমার ছবি–সেই গোঁফ, সেই জুলফি, নেই নাক, সেই চোখ!
টোটা সিং, আবার বলল মহাবীর। ঠিক তোমার মতন দেখতে। রাস্তার দেয়ালে দেয়ালে ছবি আটকে দিয়েছে আজই দুপুরে। ধরে দিতে পারলে দু হাজার টাকা পুরস্কার।
আমি সেই অবস্থাতেই কাগজটা ওর হাত থেকে নিয়ে চোখের একেবারে সামনে এনে নীচের লেখাটা পড়ার চেষ্টা করলুম। বড় করে লেখা টোটা সিং-এর নামটা পড়তে কোনও অসুবিধা হল না। আর সেই সঙ্গে ছবির মাথার উপরে লেখা রিওয়ার্ড রুপিজ ২০০০।
পুলিশ তোমায় ধরতে আসবে, বলল মহাবীর সিং। কিষণলাল বলল ও পুলিশে বলে দেবে তুমি এখানে থাক। ও দেখেছে দেয়ালের ছবি।
কিষণলাল শেঠজির দোকানের একজন কর্মচারী। লোকটা খুব সুবিধের নয় সেটা আমারও কয়েকবার মনে হয়েছে।
তোমার জেল হবে,বলে চলেছে মহাবীর সিং। আমার জেল হলে সে যেন রেহাই পায় এমনই তার ভাব। এই অদ্ভুত প্রায়-বেহুঁশ অবস্থাতে বুঝতে পারলাম যে এ ছেলেকে আমি বশ করতে পারিনি। সে আমার প্রতি যেমনি বিরূপ ছিল তেমনিই রয়ে গেছে।
আমি আর চোখ খুলে রাখতে পারছিলাম না। জিভও জড়িয়ে আসছিল। তার মধ্যেই বুঝতে পারছি যে একটা বিশ্রী অবস্থায় পড়ে গেছি। চেহারায় যখন এতই মিল তখন গঙ্গারামও আমাকে উদ্ধার করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। শেষটায় হাতে হাতকড়া।
ঘর থেকে বেরিয়ে টলতে টলতে উঠোন পেরিয়ে কোনও মতে আমার শিসমহলে বিছানায় শুয়ে পড়লাম, আর শোয়ামাত্র অঘোরে ঘুম!
.
পরদিন ঘুম ভাঙল পুরুষ মানুষের গলার শব্দে। ভারী গলায় কে যেন ইংরিজি-হিন্দি মিশিয়ে কথা বলছেন আমার ঘরের কাছেই।
আমাদের ডেফিনিট ইনফরমেশন আছে এ বাড়িতে সে লোককে দেখা গেছে। আমরা সার্চ করে দেখতে চাই। ছাব্বিশটা ঘর এই হাভেলিতে। লুকোবার জায়গার কি অভাব আছে?
আমি প্রমাদ গুনলাম। কথার সঙ্গে সঙ্গে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে আমারই ঘরের দিকে।
এবার গঙ্গারামের কাতর কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
এ বাড়িতে টোটা সিং লুকিয়ে থাকবে আমার অজানতে। এটা কী করে সম্ভব হয় ইনস্পেক্টর সাহেব?
দরজার বাইরে লোক। আমি বিছানায় কনুইয়ে ভর করে আধশোয়া। আমার গলা শুকিয়ে গেছে, বুকের ভিতর ধড়ফড়ানি। এখনও মাথা ভার; কাল যে কী হল এখনও বুঝতে পারছি না।
চৌকাঠ পেরিয়ে এক পা ঢুকে এলেন উর্দি পরা দারোগা। আমার দিকে এক ঝলক দৃষ্টি দিয়ে সরি বলে বেরিয়ে গেলেন। পায়ের শব্দ এবং কণ্ঠস্বর বারান্দার ডান দিক দিয়ে মিলিয়ে এল।
আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। তা হলে কি কালকের ছবিটাও মহাবীরের আরেকটা বিচ্ছুমি? শুধু আমার মনে একটা প্যানিক সৃষ্টি করার জন্য?
আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম।
দেয়ালের দিকে চোখ গেল।
দেয়ালের সর্বাঙ্গে আয়নার টুকরো। তাতে আমার মুখের ছায়া পড়েছে। একটা নয়, অগুনতি।
কিন্তু এ মুখ যে বদলে গেছে।
আপনা থেকেই আমার হাতটা মুখের উপর চলে এল।
কোথায় আমার টোটা-মার্কা তাগড়াই গোঁফ? আমি যে ক্লিন-শেভন!
আর আমার মাথার চুলের এ কী দশা? এ যে প্রায় কদমছাঁট!
দোর গোড়ায় এখন দাঁড়িয়ে মহাবীর সিং–তার চোখে মুখে শয়তানি হাসি।
কাল সরবতে কী ছিল? সে জিজ্ঞেস করল।
কী ছিল?
বাবার চারটে ঘুমের বড়ি। তুমি ঘুমোলে পর দাদার খুর দিয়ে আমি তোমার গোঁফ কামিয়ে দিই, কাঁচি দিয়ে চুল ঘেঁটে দিই। নাহলে তোমায় ধরে নিয়ে যেত। এখন ওরা বুদ্ধ বনে যাবে।
আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম মহাবীরের দিকে। এমন ফন্দির কি তারিফ না করে পারা যায়? আর সে যে সত্যি আমার বন্ধু, তার এর চেয়ে বড় প্রমাণ কি আর আছে?
সাবাস, মহাবীর, আমি এগিয়ে গিয়ে বন্ধুর পিঠ চাপড়ে বললাম, জিতে রহে।
সন্দেশ, কার্তিক ১৩৮৯
সদানন্দের খুদে জগৎ
আজ আমার মনটা বেশ খুশি-খুশি, তাই ভাবছি এইবেলা তোমাদের সব ব্যাপারটা বলে ফেলি। আমি জানি তোমরা বিশ্বাস করবে। তোমরা তো আর এদের মতো নও। এরা বিশ্বাস করে না। এরা। ভাবে আমার সব কথাই বুঝি মিথ্যে আর বানানো। আমি তাই আর এদের সঙ্গে কথাই বলি না।
এখন দুপুর, তাই এরা কেউ আমার ঘরে নেই। বিকেল হলেই আসবে। এখন আছি কেবল আমি আর আমার বন্ধু লালবাহাদুর। লালবাহাদুর সিং! উঃ কাল কী ভাবনাটাই ভাবিয়েছিল ও আমাকে! ও যে আবার ফিরে আসবে তা ভাবতেই পারিনি। ওর ভীষণ বুদ্ধি, তাই ও পালিয়ে বেঁচেছে। আর কেউ হলে এতক্ষণে মরে ভূত হয়ে যেত।
