গদি থেকে বাড়ির ভিতর ঢুকে একটা প্রকাণ্ড উঠোন পেরিয়ে একটা প্যাসেজের মধ্যে দিয়ে আরেকটা উঠোনে পৌঁছলাম। তারই পাশে বারান্দার ধারে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে আমাকে হাজির করল মহাবীর। বোঝাই যাচ্ছে এটা শিসমহল জাতীয় একটা কিছু ছিল, কারণ ঘরের সারা দেয়াল আয়নার টুকরো দিয়ে মোড়া।
আমাকে পৌঁছে দিয়েই মহাবীর যে কেন চম্পট দিল সেটা মিনিট খানেকের মধ্যেই বুঝতে পারলুম।
ঘরের মেঝেতে দুটি এবং খাটের উপর একটি জ্যান্ত বিছে অবস্থান করছে। মেঝের দুটি তেঁতুলে, আর খাটের ওপরেরটি একেবারে খোদ কাঁকড়া বিছে। শেষেরটি আপাতত খাটের মধ্যিখান থেকে বালিশ লক্ষ্য করে এগুচ্ছে। আমি জানি মেঝের দুটি চেহারাতেই যা ভয়ের উদ্রেক করে, কামড়ে বিষ নেই। তবে বিছানার উপরে যেটি, তার ল্যাজের ডগায় বাঁকানো হুলটির ছোবল একেবারে মারাত্মক।
বিচ্ছু বিশেষণের তাৎপর্য যে এই ভাবে প্রথম দিনই বোঝা যাবে সেটা ভাবিনি।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে মহাবীর বলে একটা হাঁক দিলুম। তাতে উত্তর না পেলেও, ডাকের ফলে উলটো দিকের বারান্দায় স্বয়ং শ্রীমানের আবির্ভাব হল। হেলতে দুলতে সে এসে দাঁড়াল একটা থামের পাশে। আমি তাকে ডাকলুম।
ইধার আও।
বিচ্ছু এগিয়ে উঠোনের মাঝ বরাবর এসে আবার থামলেন।
হাত দিয়ে বিচ্ছু তুলতে পার? জিজ্ঞেস করলুম আমি।
শ্রীমান নিরুত্তর।
এসো। দেখে যাও কী করে তোলে।
এবার শ্রীমানের কৌতূহল হল। এখানে বলে রাখি আমি নিজেও কোনওদিন হাত দিয়ে কাঁকড়া বিছে তুলিনি। তবে সেটা যে সম্ভব তা জানি, কারণ ছেলেবেলায় গণশা বলে আমাদের একটা চাকর ছিল তাকে এ জিনিস করতে দেখেছি। খপ করে ঠিক হুলের তলাটা ধরে তুলে ফেললে হুল ফোঁটাবার আর মওকা পায় না বিছে।
মহাবীর আমার ঘরের দরজার মুখটাকে এসে দাঁড়াল।
আমি দম টেনে এক বুক সাহস নিয়ে দুগ্না বলে এক ছোবলে খাটের উপর থেকে বিছেটাকে ল্যাজ ধরে তুললুম। তারপর সেটা দু আঙুলে ঝুলিয়ে মহাবীরের মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে বললুম, বিছেগুলোকে বাইরে ফেলে আসার জন্য একটা পাত্র নিয়ে এসো। আর দেখছই তো আমার যখন ভয় নেই, তখন আমাকে ভয় দেখিয়ে কোনও মজা নেই।
মহাবীর এক মিনিটের মধ্যেই একটা কাঁচের বৈয়াম নিয়ে এল। তার ভেতরের দেয়ালে লাড়ুর গুঁড়োও লেগে রয়েছে। তারই মধ্যে প্রথমে কাঁকড়া বিছেটাকে, তারপর তেঁতুলে বিছে দুটো ফেলে বললুম, এগুলোকে বাড়ির পাঁচিলের বাইরে ফেলে এসো।
মহাবীর গেল, তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে রিপোর্ট করে গেল যে সে আমার আজ্ঞা পালন করেছে।
তারপর থেকে মনে হত যে প্রাইভেট টিউটরের প্রতি তার যে স্বাভাবিক বিরাগ সেটা মহাবীর কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে। কতটা কাটিয়েছে সেটা জানা মুশকিল, কারণ এমনিতে সে অত্যন্ত চাপা। পেটে বোমা মারলেও মনের আসল ভাব সে প্রকাশ করবে না। কিন্তু ছেলেটি অত্যন্ত চৌকস, কাজেই লেখাপড়ায় যাতে তার মন বসে সে চেষ্টা আমাকে করতেই হবে, তাতে সফল হই বা না হই। দুষ্টুমি বন্ধ করার চেষ্টা
আমি করিনি, কারণ জানি সেটা মাঠে মারা যাবে। ত্যাঁদড়ামোর দৌড় যে কতখানি সেটা এক দিনের। ঘটনা বললেই বুঝতে পারবে।
গঙ্গারামের বাড়িতে চারটে ঘোড়া, ছটা উট। একদিন সকালে মনিবের চিঠি টাইপ করছি গদিতে বসে, এমন সময় হঠাৎ সমস্বরে অনেকগুলো উটের আর্তনাদ শুনে আঁতকে উঠলুম। উটের ডাকের মতো অমন বীভৎস ঘড়ঘড়ে ডাক আর কোনও জানোয়ারের নেই।
কৌতূহল হওয়াতে বাইরে বেরিয়ে দেখি জোড়া জোড়া উট বোধহয় পরস্পরের দিকে পিঠ করে বসেছিল, কোন এক ফাঁকে গিয়ে শ্রীমান এর-ওর ল্যাজ গাঁটছড়ার মতো করে বেঁধে দিয়ে এসেছে। বসা
উট দাঁড়িয়ে উঠতে ল্যাজে টান পড়ার ফলেই এই বিকট চিৎকার।
গঙ্গারাম এ ব্যাপারে ভয়ংকর আপসেট হয়ে পড়াতে তাকে বুঝিয়ে বললুম যে এ ধরনের দুষ্টুমির বয়সটা মানুষের খুব দীর্ঘস্থায়ী হয় না; তোমার ছেলের যথেষ্ট বুদ্ধি আছে; সে পড়াশুনোয় ভাল হবে এ গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি, তুমি চিন্তা কোরো না।
এত বলার পর বাপ স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
মহাবীরকে পড়ানোর টাইম ছিল সন্ধ্যা সাতটা থেকে নটা। একতলার পিছন দিকে আমার ঘরের উলটোদিকে একটা ঘরে বসে পড়াশুনা হত। আমি গিয়ে বসলেই বেয়ারা এক গেলাস সরবত দিয়ে যেত। সেটা যে কীসের সরবত তা কোনও দিন ঠাহর করতে পারিনি, তবে বলতে পারি এমন সুস্বাদু সুগন্ধী সরবত আর কোনওদিন খাইনি। সরবত শেষ হতে না হতেই ছাত্র এসে পড়তেন।
একদিন দেখি ছেলে আর আসে না। আমি ঘড়ি দেখছি থেকে থেকে; বিশ মিনিট হয়ে গেল, পঁচিশ মিনিট, এক ঘণ্টা, তবু সে আসে না। দেরির কী কারণ হতে পারে বুঝতে পারছি না, এমন সময় হঠাৎ শ্রীমান এসে হাজির।
কী ব্যাপার বলো তো? জিজ্ঞেস করলাম তাকে। এত দেরি কেন?
তোমায় একটা জিনিস, দেখাব তাই, বললেন শ্রীমান। বাবার নেশা পুরোপুরি না হলে ট্যাঁক থেকে চাবি বার করতে পারছিলাম না।
সর্বনাশ! বাবার ট্যাঁক থেকে চাবি? শেঠজি যে গাঁজা জাতীয় একটা কিছু সেবন করেন সন্ধ্যাবেলা সেটা জানতাম।
কীসের চাবি? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
সিন্দুকের, বললেন শ্রীমান বিচ্ছু।
তারপর পকেট থেকে একটা জিনিস বার করে টেবিলের উপর রাখল। ল্যাম্পের আলোয় সেটার চোখ ধাঁধানো ঝলসানি আমায় থমকে দিল।
