হেলানো চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আধঘণ্টার মধ্যেই তিনি অনুভব করলেন যে, সারাদিনের সমস্ত অবসাদ চলে গিয়ে তিনি আশ্চর্য হালকা ও শান্ত বোধ করছেন। বাইরে ফিরে চাঁদের আলো, বাগানের একটা নেড়া শিরীষ গাছের ছড়ানো কালো ডালগুলোর দিকে তাঁর দৃষ্টি। ত্রিদিববাবু বুঝতে পারলেন যে তিনি নিজের নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। সমস্ত বিশ্বচরাচরে যেন সেটাই একমাত্র শব্দ।
তাই কি?
না, তার সঙ্গে আরেকটা শব্দ যোগ হল। একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর। সেটা কোত্থেকে আসছে বলা কঠিন।
মনোযোগ দিয়ে শুনে ত্রিদিববাবু বুঝলেন যে, সেটা কোনও অল্পবয়স্ক ছেলের গলায় আবৃত্তির শব্দ। কবিতাটা তাঁর ভীষণ চেনা।
ক্ষীণ হলেও কণ্ঠস্বর স্পষ্ট, প্রত্যেকটি কথা পরিষ্কার।
–রথের দিনে খুব যদি ভিড় হয়
একলা যাব, করব না ত ভয়–
মামা যদি বলেন ছুটে এসে
হারিয়ে যাবে, আমার কোলে চড়ো
বলব আমি, দেখছ না কি মামা
হয়েছি যে বাবার মতো বড়ো–
আমায় দেখে মামা বলবে, তাই-তো,
খোকা আমার সে খোকা আর নাই তো।–
এতদিন যেন ত্রিদিব চৌধুরীর স্মৃতির কোণে লুকিয়ে ছিল কবিতাটা; আজ শুনে আবার নতুন করে মনে পড়ছে।
আবৃত্তি ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। ত্রিদিববাবু উঠে পড়লেন চেয়ার থেকে। মনটাকে পিছনের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া কোনও কাজের কথা নয়। আসল হল ভবিষ্যৎ; অতীত নয়। তিনি জানেন ভবিষ্যতে তাঁকে আরও অনেক উপরে উঠতে হবে, লাখপতি থেকে কোটিপতি হতে হবে। অতীত মানে তো যা ফুরিয়ে গেছে, শুকিয়ে গেছে, শেষ হয়ে গেছে। অতীতের চিন্তা মানুষকে দুর্বল করে, আর ভবিষ্যতের আশা তাকে সবল করে, সক্রিয় করে।
নিজের শোয়ার ঘরে গিয়ে ত্রিদিববাবু ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন। শহরে এখন লোডশেডিং, খাটের পাশে টেবিলের উপর একটা মোমবাতি টিমটিম করে জ্বলছে, তার মৃদু আলোতেই তিনি স্পষ্ট দেখলেন যে, বিছানাটা ভাল করে পাতা হয়নি, চাদর বালিশ দুটোই কুঁচকে আছে। হাত দিয়ে চাপড় মেরে সেগুলোকে টান করে দিয়ে, পাঞ্জাবি খুলে আলনায় রেখে ত্রিদিববাবু খাটে শুয়ে পড়লেন। মোমবাতিটা জ্বলবে কি? কোনও দরকার নেই। একফুঁয়ে সেটাকে নিভিয়ে দিলেন ত্রিদিববাবু। পোড়া মোমের উগ্র গন্ধ কিছুক্ষণ বাতাসে ঘোরাফেরা করে মিলিয়ে গেল। পশ্চিমের জানলা দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। রাতের আকাশ চাঁদের আলোয় ফিকে। পায়ের দিকে ঘরের দরজা। দরজা দিয়ে বাইরে বারান্দা ও বাঁয়ে সিঁড়ির মুখটা দেখা যাচ্ছে। সিঁড়ির দিকে দৃষ্টি যাবার কথা নয়, কিন্তু ত্রিদিববাবুর মনে হল তিনি যেন একটা পায়ের আওয়াজ পাচ্ছেন। খালি পায়ে থপথপ করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার শব্দ।
কিন্তু কেউ এল না। শব্দটা যেন মাঝর্সিড়িতে থেমে গেল।
হঠাৎ ত্রিদিববাবুর মনে হল তিনি অনর্থক ছেলেমানুষি কল্পনাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। সব ভৌতিক চিন্তা এক ঝটকায় মন থেকে দূর করে দিয়ে তিনি শক্ত করে চোখ বন্ধ করে ঘুমোবার চেষ্টায় প্রবৃত্ত হলেন। একতলায় খাবার ঘরের জাপানি ঘড়িতে ঢং ঢং করে এগারোটা বাজল। ঘড়িটা এতদিন বন্ধ ছিল। আজই সকালে ত্রিদিববাবু আবার সেটাকে চালু করে দিয়েছেন।
ঘড়ির শেষ ঢং মিলিয়ে যাওয়ায় নৈঃশব্দ্য যেন আরও বেড়ে গেল।
ত্রিদিববাবুর চোখ বন্ধ, এবং সেই বন্ধ চোখেই যেন তিনি টুকরো টুকরো ঝাঁপসা ছবি দেখতে শুরু করেছেন। তিনি জানেন যে এটা ঘুমের পূর্বাভাস। ওই টুকরো ছবিগুলো আসলে স্বপ্নের টুকরো। মানুষ গান করার আগে যেমন গুনগুন করে সুর ঠিক করে নেয়, এই টুকরো ছবিগুলো হল আসলে স্বপ্ন শুরু হবার আগে স্বপ্নের গুনগুনানি।
কিন্তু স্বপ্নের সময় এখনও আসেনি। চোখ বন্ধ অথচ সম্পূর্ণ সজাগ অবস্থাতেই ত্রিদিববাবু তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করলেন যে ঘরে যেন কে ঢুকেছে। না, শুধু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নয়, শ্রবণেন্দ্রিয়ও বটে। ত্রিদিববাবু নিশ্বাসের শব্দ পাচ্ছেন। কেউ যেন দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়ে পড়ে দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে।
লোক দেখতে পাবেন এই দৃঢ় বিশ্বাসে চোখ খুলে ত্রিদিববাবু বুঝলেন যে, তিনি ভুল করেননি।
দরজার মুখে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, বছর দশেক বয়স, আর ডান হাতটা আলতো করে দরজার উপর রাখা, বাঁ পা-টা একটু সামনের দিকে এগোনো। ছেলেটি যেন ঘরে ঢুকতে গিয়ে তোক দেখে থেমে গেছে।
ত্রিদিববাবু অনুভব করলেন একটা ঠাণ্ডা ভাব তাঁর পা থেকে শুরু করে মাথার দিকে উঠে আসছে শিরদাঁড়া বেয়ে। প্রশান্ত বলেছিল একটি ছেলেকে দেখেছে, বাগানে…খেলছিল…ছেলেবেলার মন্টু…
ছেলেটি নিঃশব্দে আরও তিন পা এগিয়ে এল। এখন সে খাট থেকে চার হাত দূরে। ছেলেবেলার মন্টু…
ত্রিদিববাবুর হাত পা বরফ, মাথা ঝিমঝিম করছে। তিনি বুঝতে পারছেন এবার তিনি চোখে অন্ধকার দেখবেন, তাঁর আতঙ্ক চরমে পৌঁছেছে।
ছেলেটি আরেক পা এগোল। বেগুনি শার্ট…এই শার্ট তো…
সংজ্ঞা হারাবার ঠিক আগের মুহূর্তে ত্রিদিববাবু রিনরিনে গলায় প্রশ্ন শুনলেন।
আমার বিছানায় কে শুয়ে?
.
তাঁর কখন জ্ঞান হয়েছিল, বা আদৌ হয়েছিল কিনা, আর তারপর কখন তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন, এসব কিছুই জানেন না ত্রিদিববাবু। সকালে যথারীতি সাড়ে ছটায় ঘুম ভেঙে গেল। প্রশান্ত বলেছে সাড়ে সাতটায় এসে তাঁর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করবে। রাত্রে যা ঘটল, তারপর তিনি মামুলি দৈনন্দিন কাজের কথা ভাবতেই পারছেন না। জীবনে তিনি প্রথম এমন ধাক্কা খেলেন। কাল চাঁদনি রাতে যে আবৃত্তি শুনেছিলেন সেই আবৃত্তি করে তিনি ইস্কুলে প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন। আর দ্বিতীয়? দ্বিতীয় হয়েছিল প্রশান্ত সরকার। তাতে মন্টু খুশি হয়নি। দুজনেই ফার্স্ট প্রাইজ পেলে দারুণ হত, না রে? মন্টু বলেছিল তার প্রাণের বন্ধু পানুকে।
