এবার যে দশ বছর বাদে ত্রিদিববাবু রাঁচি যাচ্ছেন, এটা বিশ্রামের জন্য নয়। রাঁচিতে লাক্ষার ব্যবসা একটা বড় ব্যবসা। এই ব্যবসায়ে কোনও সুবিধা হতে পারে কিনা সেইটে যাচাই করে দেখার জন্যই রাঁচি যাওয়া। পৈতৃক বাড়িতেই থাকবেন ত্রিদিববাবু, এবং দুদিনের মধ্যেই কাজ হয়ে যাবার কথা। প্রশান্ত সরকারকে তিনি চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছেন আসছেন বলে। সে-ই তাঁর বাড়িতে গিয়ে চাকরদের বলে সব ব্যবস্থা করে রাখবে। প্রশান্ত তাঁর বাল্যবন্ধু। রাঁচির এক মিশনারি স্কুলে মাস্টারি করে। ত্রিদিববাবুর সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই বললেই চলে, যদিও পুরনো বন্ধুর জন্য তিনি এতটুকু করতে রাজি হবেন এটা ত্রিদিববাবু বিশ্বাস করেন।
আশ্চর্য! এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে ত্রিদিববাবুর ঘুম এসে গেল এটা তিনি নিজেই জানেন না। তাঁরও যে অন্য তিনজন যাত্রীর মতো নাক ডাকে সেটাও কি তিনি জানেন?
.
রাঁচি এক্সপ্রেস আসার টাইম সকাল সোয়া সাতটা। প্রশান্ত সরকার তাঁর ছেলেবেলার বন্ধুকে স্বাগত জানাতে দশ মিনিট আগেই হাজির হয়েছেন স্টেশনে। ইস্কুলে থাকতে ত্রিদিব চৌধুরী ওরফে মণ্টির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল ঘনিষ্ঠ। ত্রিদিব যখন কলকাতায় কলেজে পড়ত তখনও দুজনের মধ্যে নিয়মিত চিঠি লেখালেখি চলত। কলেজ ছাড়ার পরে এখন দুজনের মধ্যে ব্যবধান এসে পড়ে। এর জন্য দায়ী অবশ্য ত্রিদিববাবুই। বাপ-মা বেঁচে থাকতে তিনি মাঝে মাঝে রাঁচিতে এসেছেন, কিন্তু প্রশান্তকে না জানিয়ে। ফলে অনেকবার এমন হয়েছে দুজনের মধ্যে দেখাই হয়নি। কেন যে এরকম হচ্ছে সেটা প্রশান্ত সরকার বুঝতেই পারেননি। তারপর খবরের কাগজ থেকে জেনেছেন যে, ত্রিদিব চৌধুরী এখন একজন ডাকসাইটে ব্যবসায়ী, অর্থাৎ তিনি এখন প্রশান্তর নাগালের বাইরে। সেটা আরও স্পষ্ট হয় এই সেদিনের। পাওয়া চিঠিটা থেকে। চার লাইনের সংক্ষিপ্ত শুকনো চিঠিতে দুজনের মধ্যে দূরত্বটাই ফুটে ওঠে।
বন্ধুর এই পরিবর্তনে প্রশান্তবাবু খুশি হতে পারেননি। ইস্কুলের সেই সরল হাসিখুশি মন্টুর সঙ্গে এই লাখপতি ত্রিদিব চৌধুরীর যেন কোনও মিল নেই। মানুষ কি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এতই বদলে যায়? ত্রিদিব চৌধুরীর যে অভাবনীয় আর্থিক উন্নতি হয়েছে সেটা অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু টাকার গরমটাকে কোনওদিনই বিশেষ আমল দেন না প্রশান্ত সরকার। তাঁর চরিত্রের এই বিশেষ দিকটা তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া। প্রমথ সরকার ছিলেন গান্ধীভক্ত আদর্শবাদী পুরুষ। প্রশান্তর নিজের জীবনে। তেমন কোনও উত্থান পতন ঘটেনি। একজন ইস্কুল মাস্টারের জীবনে কতই বা রকমফের হবে? তাই আজ তাঁকে দেখলে ছেলেবেলার প্রশান্ত ওরফে পানুকে চিনতে কোনও অসুবিধা হয় না। কিন্তু ত্রিদিব চৌধুরী সম্বন্ধে সেকথা বলা চলে কি? সেটা জানার জন্যই প্রশান্ত সরকার উগ্রীব হয়ে আছেন। ছেলেবেলার বন্ধু আজ লক্ষপতি হয়ে যদি দেমাক দেখাতে আসে তা হলে সেটা বরদাস্ত করা মুশকিল হবে।
ট্রেন এল দশ মিনিট লেটে। মাত্র তিনদিনের জন্য আসা, তাই ত্রিদিববাবু সঙ্গে একটা ছোট সুটকেস আর একটা ফ্লাস্ক ছাড়া আর কিছুই আনেননি। সুটকেসটা প্রশান্তবাবু একরকম জোর করেই নিজের হাতে তুলে নিলেন। তারপর দুজনে রওনা দিলেন স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাক্সির উদ্দেশে।
অনেকক্ষণ ওয়েট করতে হল নাকি? ত্রিদিব চৌধুরী প্রশ্ন করলেন হাঁটতে হাঁটতে।
এই মিনিট কুড়ি।
তুমি যে আবার স্টেশনে আসবে সেটা ভাবতেই পারিনি। কোনও দরকার ছিল না। আমি তো আর এই প্রথম আসছি না রাঁচিতে।
প্রশান্তবাবু মৃদু হাসলেন, কোনও মন্তব্য করলেন না। চিরকালের অভ্যাস মতো তিনি বন্ধুকে তুই বলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু বন্ধু তুমি বলাতে সেটা আর হল না।
এখানে সব খবর ভাল তো? জিজ্ঞেস করলেন ত্রিদিববাবু।
হ্যাঁ, সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। অ্যাদ্দিন বাদে বাবু আসছেন জেনে তোমার মালি আর চিন্তামণি খুব একসাইটেড।
চিন্তামণি হল একাধারে রসুয়ে আর চৌকিদার। বাড়িটা বাসযোগ্য আছে তো এখনও? না কি ভূতের বাসায় পরিণত হয়েছে?
প্রশান্তবাবু আবার মৃদু হেসে একটু চুপ থেকে বললেন, ভূতের বাসার কথা জানি না, কিন্তু একটা কথা তোমাকে জানানো দরকার। আমি সেদিন রাত্রে তোমার বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় বাগানে একটি বছর দশেকের ছেলেকে খেলতে দেখেছি।
রাত্রে মানে?
বেশ বেশি রাত। সাড়ে এগারোটা। দেখে চমকে গিয়েছিলাম। মনে হল যেন দশ বছরের মন্টু আবার ফিরে এসেছে।
এনিওয়ে–ভূত যে নয় সে তো বোঝাই যাচ্ছে। বাড়ি তো আমার বাবার তৈরি–ওতে কে মরেছে মরেছে সে তো আমার জানা আছে। কথা হল–বাড়িটাকে ঝেড়ে পুঁছে রেখেছে তো?
একেবারে তকতকে। আমি কাল গিয়ে দেখে এসেছি। ভাল কথা–তোমার কাজটা কখন, কোথায়?
আমার নামকাম যেতে হবে আজই দুপুরে, আফটার লাঞ্চ। মহেশ্বর জৈন বলে এক লাক্ষা ব্যবসায়ী থাকেন ওখানে। আড়াইটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
বেশ তো, আমরা যে ট্যাক্সিটা এখন নিচ্ছি সেটাই তোমার জন্য ঠিক করা আছে। এখন তোমাকে পৌঁছিয়ে দুপুরে খেয়ে আবার দুটোর মধ্যে তোমার কাছে চলে আসবে। নামকাম যেতে মিনিট দশেকের বেশি লাগবে না।
ট্যাক্সিতে উঠে রওনা হবার পরে প্রশান্ত সরকার জরুরি কথাটা পাড়লেন–তাও সরাসরি নয়, একটু ভণিতা করে।
