আশা করি ষোলো তারিখের অভিযানেই এইসব প্রশ্নের জবাব মিলবে।
.
ক্রমে এগিয়ে এল ষোলোই অক্টোবর। পনেরোই রাত্তিরে একটা গানের জলসা থেকে বাড়ি ফিরছি। রাস্তায় দেখা সেই সাহেবের সঙ্গে। বলল, তোমার বাড়িতেই যাচ্ছিলাম তোমাকে মনে করিয়ে দেবার জন্য। আমি বললাম, আমি যে শুধু ভুলিনি তা নয়, অত্যন্ত উদগ্রীব হয়ে আগামীকাল সকালের জন্য অপেক্ষা করে আছি। সাহেব চলে গেল।
ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে ভোর পাঁচটায় উঠে এক কাপ চা খেয়ে গলায় একটা মাফলার চাপিয়ে নিয়ে একটা টাঙ্গা করে বেরিয়ে পড়লাম দিলখুশার উদ্দেশে। শহরের একটু বাইরে দিলখুশা এককালে ছিল নবাব সাদাত আলির বাগান বাড়ি। চারিদিকে ঘেরা প্রকাণ্ড পার্কে হরিণ চরে বেড়াত। কখনও-সখনও জঙ্গল থেকে এক-আধটা চিতাবাঘও নাকি এসে পড়ত বাড়ির ত্রিসীমানায়। এখন সে বাড়ির শুধু খোটাই রয়েছে। তবে তার পাশে একটা ফুলবাগিচা এখনও মেনটেন করা হয়, লোকে সেখানে বেড়াতে যায়।
ছটা বাজতে কুড়ি মিনিটে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে টাঙ্গাওয়ালাকে বললুম, তুমি যদি আধ ঘণ্টা অপেক্ষা কর, তা হলে আমি আবার এই গাড়িতেই বাড়ি ফিরে যেতে পারি। উর্দুটা ভাল জানা ছিল আগেই, তাই বোধহয় খানদানি আদমি ভেবে টাঙ্গাওয়ালা রাজি হয়ে গেল।
গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা এগোতেই একটা অর্জুন গাছের পাশে দেখি সাহেব দাঁড়িয়ে আছে। বললে সেও নাকি মিনিট পাঁচেক হল এসেছে।
লেটস গো দেন।
বললুম, চলো সাহেব–তুমিই তো পথ জান, তোমার পিছু নেব আমি।
মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই একটা খোলা মাঠে এসে পড়লুম। দূরে বিশেষ কিছু দৃষ্টিগোচর হয় না, কারণ চারিদিক একটা আবছা কুয়াশায় ঢাকা। হয়তো ডুয়েলের দিনেও ঠিক এমনি কুয়াশা ছিল।
আগাছা আর কাঁটা ঝোপে ঘেরা একটা পোডড়া বাড়ির কাছে এসে সাহেব থামল। দেখেই বোঝা যায় সেটা প্রাচীনকালে কোনও সাহেবের বাড়ি ছিল। অবিশ্যি আমাদের কারবার এই বাড়িটাকে নিয়ে নয়। সেটাকে পেছনে ফেলে আমরা দাঁড়ালাম পুব দিকে মুখ করে। কুয়াশা হলেও বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সামনে কিছু দূরে রয়েছে একটা তেঁতুল গাছ, আর তার ডাইনে আমাদের থেকে হাত চল্লিশেক দূরে রয়েছে একটা বেশ বড় ঝোঁপ। আর সব কিছুর পিছন দিয়ে বয়ে চলেছে গুমতী নদী। নদীর পিছনে কুয়াশা হলেও, আন্দাজ করা যায় ওদিকটায় বসতি নেই। সব মিলিয়ে অত্যন্ত নিরিবিলি পরিবেশ।
শুনতে পাচ্ছ? সাহেব হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
কান পাততেই শুনতে পেলুম। ঘোড়ার খুরের শব্দ। গাটা যে ছমছম করছিল না তা বলতে পারি না। তবে তার সঙ্গে একটা অভিনব অভিজ্ঞতার চরম প্রত্যাশা।
এইবার দেখলুম দুই অশ্বারোহীকে। আমাদের বাঁ দিকে বেশ দূর দিয়ে এসে তেঁতুল গাছটার নীচে দাঁড়াল।
এরা দুজনেই কি লড়বেন? আমি ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলুম।
সাহেব বলল, দুজন নয়, একজন। দুজনের মধ্যে লম্বাটি হলেন জন ইলিংওয়ার্থ, অর্থাৎ যিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। অন্যজন ইলিংওয়ার্থের সেকেন্ড ও বন্ধু, হিউ ড্রামন্ড। ওই দেখ ড্রামন্ডের হাতে সেই মেহগ্যানি বাক্স।
সত্যিই তো! এবার বুঝলুম আমার রক্ত চলাচল দ্রুত হতে শুরু করেছে। আমি যে দেড়শো বছর আগের একটি ঘটনা আজ ১৯৫০ সালে লখনৌ শহরে দাঁড়িয়ে দেখতে চলেছি, সেই চিন্তা আমার হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দিয়েছে।
মিনিট খানেকের মধ্যেই দুটো ঘোড়ায় ক্যাপ্টেন ব্রুস ও তাঁর সেকেন্ড ফিলিপ মক্সন এসে পড়লেন। তারপর ড্রামন্ড বাক্স থেকে পিস্তল দুটো বার করে তাতে গুলি ভরে ব্রুস ইলিংওয়ার্থের। হাতে দিয়ে তাদের যেন কী সব বুঝিয়ে দিলেন।
পিছনের আকাশ গোলাপি হতে শুরু করেছে, গুমতীর জলে সেই রঙ প্রতিফলিত।
ব্রুস ও ইলিংওয়ার্থ এবার পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তারপর মুখ ঘুরিয়ে দুজনেই গুনে গুনে চোদ্দো পা হেঁটে গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে মুখোমুখি হলেন।
এতক্ষণ পর্যন্ত কোনও শব্দ শুনতে পাইনি, কিন্তু এবার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পিস্তল উঁচিয়ে পরস্পরের দিকে তাক করার পর স্পষ্ট কানে এল ড্রামন্ডের আদেশ–
ফায়ার!
পরমুহূর্তেই শুনলাম এক সঙ্গে দুই পিস্তলের গর্জন।
আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যে ব্রুস ও ইলিংওয়ার্থ দুজনের দেহই একসঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
সেই সঙ্গে আরেকটি দৃশ্য আমাকে আরও অবাক করে দিল। যেই ঝোঁপটার কথা বলছিলাম, সেটার পিছন থেকে এক মহিলা ছুটে বেরিয়ে কুয়াশায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
ফলাফল তো দেখলে, বলল সাহেব। এই ডুয়েলে দুজনেরই মৃত্যু হয়েছিল।
বললাম, তা তো বুঝলাম, কিন্তু ঝোঁপের পিছন থেকে একজন মহিলা বেরিয়ে চলে গেলেন, তিনি কে?
দ্যাট ওয়াজ অ্যানাবেলা।
অ্যানাবেলা।
ইলিংওয়ার্থের গুলিতে ক্যাপ্টেন ব্রুস মরবে না এটা অ্যানাবেলা বুঝেছিল–অথচ ওর দরকার ছিল যাতে দুজনেই মরে। তাই সে আর ঝুঁকি না নিয়ে ফায়ার বলার সঙ্গে সঙ্গে নিজেই পিস্তল দিয়ে ব্রুসকে মারে। ইলিংওয়ার্থের গুলি ব্রুসের গায়ে লাগেইনি।
কিন্তু অ্যানাবেলার এই আচরণের কারণ কী?
কারণ সে ওই দুজনের একজনকেও ভালবাসেনি। ও বুঝেছিল ইলিংওয়ার্থ মরবে, এবং ব্রুস বেঁচে থেকে ওকে বিরক্ত করবে। সেটা ও চায়নি, কারণ সে আসলে ভালবাসত আরেকজনকে–যাকে সে পরে বিয়ে করে এবং যার সঙ্গে সে সুখে ঘর করে।
