.
মালি দুঃখীরাম যখন বেলঘরিয়া থানা থেকে ইনস্পেক্টর বসাককে তার মনিবের মৃতদেহ দেখতে নিয়ে এল তখন প্রায় রাত বারোটা। বসাক অবশ্য জেলিজাতীয় কোনও পদার্থর চিহ্ন দেখতে পাননি। শশাঙ্কর মৃতদেহ ছাড়া যে জিনিসটি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল সেটি হল শশাঙ্কর নোটবুকের পাতায় শশাঙ্করই হস্তাক্ষরে একটি স্বীকারোক্তি–
আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী আমারই বিবেক।
শারদীয়া আশ্চর্য: ১৩৭২ (১৯৬৫)
মহারাজা তারিণীখুড়ো
আজ আপনার কপালে ভ্রূকুটি কেন খুড়ো? জিজ্ঞেস করল ন্যাপলা। এটা অবিশ্যি আমিও লক্ষ করেছিলাম। খুড়ো তক্তপোশের উপর বাবু হয়ে বসে ডান হাতটা পায়ের পাতায় রেখে অল্প অল্প দুলছেন, তাঁর কপালে ভাঁজ।
খুড়ো বললেন, এই বাদলার সন্ধ্যায় গরম চা যতক্ষণ না পেটে পড়ছে ততক্ষণ ভ্রূকুটি থাকতে বাধ্য।
খুড়ো আসার সঙ্গে সঙ্গেই চা অর্ডার দেওয়া হয়েছে, বেশি দেরিও হয়নি, তাও আমি আর একবার। চাকরের নাম ধরে হাঁক দিলাম।
আপনার গল্প ফাঁদা হয়ে গেছে? ন্যাপলা জিজ্ঞেস করল। সত্যি, ওর সাহসের অন্ত নেই!
গল্প আমি ফাঁদি না, দাঁত খিঁচিয়ে বললেন খুড়ো। আমার অভিজ্ঞতার স্টক অঢেল। সে ফুরোতে ফুরোতে তোদের গোঁফ-দাড়ি গজিয়ে যাবে।
চা এল। খুড়ো একটা সশব্দ চুমুক দিয়ে বললেন, এক দিন কা সুলতানের গল্প তোরা হয়তো শুনেছিস। সেটা ঘটেছিল হুমায়ুনের যুগে। সেরকম আমাকে পাঁচদিনের মহারাজা হতে হয়েছিল একটা নেটিভ স্টেটে, সে গল্প তোদের বলেছি কি?
আমরা সকলে একসঙ্গে না বলে উঠলাম।
আপনাকে সিংহাসনে বসতে হয়েছিল? ন্যাপলা জিজ্ঞেস করল।
আজ্ঞে না, বললেন খুড়ো। নাইনটিন সিক্সটি ফোরের ঘটনা। তখন রাজারা আর সিংহাসনে বসে; ভারত অনেকদিন হল স্বাধীন হয়ে গেছে। তবে রাজা গুলাব সিং-এর তখনও খুব খাতির। রাজ্যের সব লোকেরা তাঁকে মহারাজ বলে সম্বোধন করে। যাকগে–গল্পটা বলি শো।
খুড়ো কাপে আর-একটা চুমুক দিয়ে তাঁর গল্প শুরু করলেন :
আমি তখন ব্যাঙ্গালোরে। মাদ্রাজে দু বছর একটা হোটেলের ম্যানেজারি করে আবার ভবঘুরে। সেই সময় একদিন খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। অদ্ভুত বিজ্ঞাপন; ঠিক তেমনটি আর কখনও চোখে পড়েছে বলে মনে পড়ে না। বিজ্ঞাপনের মাথায় একজন লোকের ছবি। তার নীচে বড় হরফে লেখা ১০,০০০ টাকা পুরস্কার। তারপর ছোট হরফে লিখছে যে, ছবির চেহারার সঙ্গে আদল আছে এমন লোক যদি কেউ থাকে, সে যেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় অ্যাপ্লাই করে তার নিজের ছবি সমেত। যাদের চেহারা মিলবে তাদের ইন্টারভিউতে ডাকা হবে। ঠিকানা হল–ভার্গব রাও, দেওয়ান, মন্দের স্টেট, মাইসোর। মন্দের নামে যে একটা নেটিভ স্টেট আছে সেটা টক করে মনে পড়ে গেল। কিন্তু বিজ্ঞাপনে যাঁর ছবি রয়েছে তিনি যে কে সেটা বুঝতে পারলুম না। নাইবা বুঝি; এটুকু বুঝি যে, এই চেহারার সঙ্গে আমার নিজের চেহারার বিলক্ষণ মিল। আমি যদি আমার গোঁফটাকে একটু সরু করে ছাঁটি তা হলে দুই চেহারায় তফাত করা মুশকিল হবে।
গোঁফ হেঁটে ভিক্টোরিয়া ফোটো স্টোর্সে গিয়ে একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি তুলিয়ে অ্যাপ্লাই করে দিলুম। দশ হাজার টাকার লোভ সামলানো কি সহজ কথা?
সাতদিনের মধ্যে উত্তর এসেছিল। ইন্টারভিউ-এর জন্য ডাক পড়েছে। যাতায়াতের খরচ বিজ্ঞাপনদাতারাই দেবেন, বোর্ড অ্যান্ড লজিংও তাঁদের দায়িত্ব, আমি যেন অবিলম্বে মন্দোর রওনা। দিই। এও বলা ছিল চিঠিতে যে, আমি যেন সঙ্গে দিন দশেকের মতো জামাকাপড় নিয়ে নিই।
পরের দিনই একটা টেলিগ্রাম ছেড়ে দিয়ে রওনা দিয়ে দিলুম। হুবলি ছাড়িয়ে দুটো স্টেশন পরেই মন্দোর, আমার জন্য স্টেশনে লোক থাকার কথা। অনেকখানি রাস্তা, ভাবতে ভাবতে গেলুম এ বিজ্ঞাপনের কী মানে হতে পারে। যে ভদ্রলোকের ছবিটা দেওয়া হয়েছিল বিজ্ঞাপনে তিনি যে সম্রান্ত বংশের লোক তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু তাঁর জোড়া কেন দরকার হবে তা আমার মাথায় ঢুকল না।
মন্দোর স্টেশনে সুটকেস নিয়ে নেমে এদিক-ওদিক দেখছি, এমন সময় এক বছর ষাটেকের ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে এলেন।
ইউ আর মিস্টার ব্যানার্জি? আমার দিকে ডান হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক। তিনি যে রীতিমতো অবাক হয়েছেন সেটা আর বলে দিতে হয় না।
আমি বললুম, হ্যাঁ, আমিই মিস্টার ব্যানার্জি।
আমার নাম ভার্গব রাও, বললেন ভদ্রলোক। আমি মন্দোরের দেওয়ান। আমাদের বিশেষ সৌভাগ্য যে আপনার মতো একজন ক্যানডিডেট পেয়েছি।
কীসের ক্যানডিডেট?
আগে গাড়িতে উঠুন। পথে যেতে যেতে সব কথা হবে। আমাদের এখন রাজবাড়ি যেতে হবে, এখান থেকে সাত কিলোমিটার। পথে আপনার সব প্রশ্নের জবাব দিতে পারব বলে বিশ্বাস করি।
একটা পুরনো মডেলের সুপ্রশস্ত আর্মস্ট্রং সিডনি গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। দেওয়ান সাহেব পিছনে আমার পাশেই বসলেন। জানলা দিয়ে দেখছি দূরে পাহাড়ের লাইন–ভারী মনোরম দৃশ্য।
গাড়ি রওনা হবার পর দেওয়ান রহস্য উদঘাটন করতে শুরু করলেন।
মিস্টার ব্যানার্জি, আমাদের এখানে হঠাৎ একটা দুর্ঘটনা ঘটায় একটা জটিল পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। আমাদের মহারাজা গুলাব সিং-এর হঠাৎ মস্তিষ্কের বিকার দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা চলেছে, মাইসোর থেকে বড় ডাক্তার এসেছেন, কিন্তু খুব শিগগির আরোগ্যের কোনও সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। অথচ আর তিনদিনের মধ্যে মহারাজার কাছে এক অতি সম্মানিত গেস্ট আসছেন আমেরিকা থেকে–ক্রোড়পতি মিস্টার অস্কার হোরেনস্টাইন। উনি প্রাচীন শিল্পদ্রব্য সংগ্রহ করেন এবং তার পিছনে লাখ লাখ ডলার খরচ করেছেন। আমাদের রাজারও সংগ্রহে অনেক পুরনো জিনিস আছে। তাঁর ইচ্ছা ছিল হোরেনস্টাইনকে কিছু জিনিস বিক্রি করা। তার একটা কারণ অবশ্য এই যে, আমাদের তহবিলে অর্থাভাব দেখা দিয়েছে বেশ কিছুদিন থেকেই। আমাদের কম্পাউন্ডে ছোট বড় মাঝারি প্রায় গোটা ছয়েক প্রাসাদ রয়েছে, রাজা তাদের মধ্যে একটিকে হোটেলে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মন্দোরে দেখবার জিনিসের অভাব নেই। লেক আছে, পাহাড় আছে, জঙ্গলে বাঘ হাতি হরিণ আছে; তা ছাড়া এখানকার আবহাওয়া স্বাস্থ্যকর। ঠিকমতো বিজ্ঞাপন দিলে হোটেলের ব্যবসা মার খাবে বলে মনে হয় না। কিন্তু তার আগে কিছু নগদ টাকা পাবার সম্ভাবনা ছিল এই হোরেনস্টাইনের কাছে। সেই জন্য তাঁকে আর আমরা আসতে বারণ করিনি, বা রাজার অসুখের কথা বলিনি। বুঝতেই পারছেন–।
