তা বটে। বললেন ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক।
লাস্টিগ এখনও হাসিমুখে চেয়ে রয়েছে তার দাদু-দিদিমার দিকে। তোমাদের দেখে যে কী ভাল লাগছে!
ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক উঠে পড়লেন।
এবার তা হলে আমাদের যেতে হয়। আপনাদের আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
আবার আসবে তো? বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা একসঙ্গে প্রশ্ন করলেন। রাত্রের খাওয়াটা এখানেই হোক না?
দেখি, চেষ্টা করব। কাজ রয়েছে অনেক। আমার লোকেরা রকেটে রয়েছে, আর
ক্যাপ্টেনের কথা থেমে গেল। তাঁর অবাক দৃষ্টি বাইরের দরজার দিকে। দূর থেকে সমবেত কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। অনেকে সোল্লাসে কাদের যেন স্বাগত জানাচ্ছে।
ব্ল্যাক দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দূরে রকেটটা দেখা যাচ্ছে। দরজা খোলা, ভিতরের লোক সব বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সবাই হাত নাড়ছে আনন্দে। রকেটটাকে ঘিরে মানুষের ভিড়, আর তাদের মধ্য দিয়ে ব্যস্তভাবে ঘোরাফেরা করছে রকেটের তেরোজন যাত্রী। জনতার উপর দিয়ে যে একটা ফুর্তির ঢেউ বয়ে চলেছে, সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
এরই মধ্যে একটা ব্যান্ড বাজতে শুরু করল। তার সঙ্গে ছোট ছোট মেয়েদের সোনালি চুল দুলিয়ে নাচ, হুররে! হুররে! ছোট ঘোট ছেলেরা চেঁচিয়ে উঠল। বুড়োরা এ-ওকে চুরুট বিলি করে তাদের মনের আনন্দ প্রকাশ করল।
এরই মধ্যে মেয়র সাহেব একটি বক্তৃতা দিলেন। তার পর রকেটের তেরোজন প্রত্যেকে তাদের খুঁজে-পাওয়া আত্মীয়-স্বজনকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল।
ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক আর থাকতে পারলেন না। সমস্ত শব্দ ছাপিয়ে তাঁর চিৎকার শোনা গেল, কোথায় যাচ্ছ তোমরা?
ব্যান্ডবাদকেরাও চলে গেল। এখন আর রকেটের পাশে লোক নেই, সেটা ঝলমলে রোদে পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
দেখেছ কাণ্ড, বললেন ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক। রকেটটাকে ছেড়ে চলে গেল! ওদের ছাল-চামড়া তুলে নেব আমি। আমার হুকুম অগ্রাহ্য করে
স্যর, ওদের মাফ করে দিন, বলল লাস্টিগ। এত পুরনো চেনা লোকের দেখা পেয়েছে ওরা।
ওটা কোনও অজুহাত নয়!
কিন্তু জানলা দিয়ে বাইরে চেনা লোক দেখলে তখন ওদের মনের অবস্থাটা কল্পনা করুন!
কিন্তু তাই বলে হুকুম মানবে না?
এই অবস্থায় আপনার নিজের মনের অবস্থা কী হত সেটাও ভেবে দেখুন!
আমি কখনই হুকুম অগ্রাহ্য–
ক্যাপ্টেনের কথা শেষ হল না। বাইরে রাস্তার ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে আসছে একটি দীর্ঘাঙ্গ যুবক, বছর পঁচিশ বয়স, তার অস্বাভাবিক রকম নীল চোখ দুটো হাসিতে উজ্জ্বল।
জন! যুবকটি এবার দৌড়ে এল ক্যাপ্টেন ব্ল্যাকের দিকে।
এ কী ব্যাপার। ক্যাপ্টেন ব্ল্যাকের যেন স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে।
জন! তুই ব্যাটা এখানে হাজির হয়েছিস?
যুবকটি ক্যাপ্টেনের হাত চেপে ধরে তার পিঠে একটা চাপড় মারল।
তুই! অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন এল ক্যাপ্টেন ব্ল্যাকের মুখ থেকে।
তোর এখনও সন্দেহ হচ্ছে?
এডওয়ার্ড! ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক এবার লাস্টিগ ও হিংস্টনের দিকে ফিরলেন, আগন্তুকের হাত তাঁর হাতের মুঠোর মধ্যে।
এ হল আমার ছোট ভাই এডওয়ার্ড। এড–ইনি হলেন হিংস্টন, আর ইনি লাস্টিগ।
দুই ভাইয়ে কিছুক্ষণ হাত ধরে টানাটানির পর সেটা আলিঙ্গনে পরিণত হল।
এড!
জন–হতচ্ছাড়া, তোকে যে আবার কোনও দিন দেখতে পাব–! তুই তো দিব্যি আছিস, এড। কিন্তু ব্যাপারটা কী বল তো? তোর যখন ছাব্বিশ বছর বয়স, তখন তোর মৃত্যু হয়। আমার বয়স তখন উনিশ। কত কাল আগের কথা–আর আজ…
মা অপেক্ষা করছেন, হাসিমুখে বলল এডওয়ার্ড ব্ল্যাক।
মা!
বাবাও!
বাবা! ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক যেন মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন। তাঁর গতি টলায়মান।–মাবাবা বেঁচে আছেন? কোথায়?
আমাদের সেই পুরনো বাড়ি। ওক নোল অ্যাভিনিউ!
সেই পুরনো বাড়ি। ক্যাপ্টেন ব্ল্যাকের দৃষ্টি উদ্ভাসিত।
শুনলে তোমরা? হিংস্টন ও লাস্টিগের দিকে ফিরলেন জন ব্ল্যাক। কিন্তু হিংস্টন আর নেই। সে তার নিজের ছেলেবেলার বাসস্থানের দেখা পেয়ে সেই দিকে ছুটে গেছে। লাস্টিগ হেসে বলল, এইবার বুঝেছেন ক্যাপ্টেন–আমাদের বন্ধুদের আচরণের কারণটা? হুকুম মানার অবস্থা ওদের ছিল না।
বুঝেছি, বুঝেছি! জন ব্ল্যাক চোখ বন্ধ করে বললেন। যখন চোখ খুলব তখন কি আবার দেখব তুই আর নেই? জন চোখ খুললেন। না তো! তুই তো এখনও আছিস। আর কী খোলতাই হয়েছে তোর চেহারা।
আয়, লাঞ্চের সময় হয়েছে। আমি মাকে বলে রেখেছি।
লাস্টিগ বলল, স্যর, আমি আমার দাদু ও দিদিমার কাছে থাকব। প্রয়োজন হলে খবর দেবেন।
অ্যাঁ? ও, আচ্ছা, ঠিক আছে। পরে দেখা হবে।
এডওয়ার্ড জনের হাত ধরে এগিয়ে গেল একটা বাড়ির দিকে।–মনে পড়ছে বাড়িটা?
আরেব্বাস! আয় তো দেখি, কে আগে পৌঁছতে পারে!
দুজনে দৌড়ল। চারপাশের গাছ, পায়ের নীচের মাটি দ্রুত পিছিয়ে পড়ল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এডওয়ার্ডেরই জয় হল। বাড়িটা ঝড়ের মতো এগিয়ে এসেছে সামনে। –পারলি না, দেখলি তো! বলল এডওয়ার্ড। আমার যে বয়স হয়ে গেছে রে, বলল জন। তবে এটা মনে আছে যে কোনও দিনই তোর সঙ্গে দৌড়ে পারিনি।
দরজার মুখে মা, স্নেহময়ী মা, সেই দোহারা গড়ন। মুখে উজ্জ্বল হাসি। তাঁর পিছনে বাবা, চুলে ছাই রঙের ছোপ, হাতে পাইপ।
মা! বাবা!
শিশুর মতো হাত বাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে এগিয়ে গেলেন ক্যাপ্টেন জন ব্ল্যাক।
দুপুরটা কাটল চমৎকার। খাওয়ার পর জন তাঁর রকেট, অভিযানের গল্প করলেন আর সবাই সেটা উপভোগ করলেন। জন দেখলেন যে তাঁর মা একটুও বদলাননি, আর বাবাও ঠিক আগের। মতো করেই দাঁত দিয়ে চুরুটের ডগা ছিঁড়ে কুঞ্চিত করে দেশলাই সংযোগ করছেন। রাত্রে টার্কির মাংস ছিল। টার্কির পা থেকে মাংসের শেষ কণাটুকু চিবিয়ে খেয়ে ক্যাপ্টেন জন পরম তৃপ্তি অনুভব করলেন। বাইরে গাছপালায় আকাশে মেঘে রাত্রির রঙ, ঘরের মধ্যে ল্যাম্পগুলোকে ঘিরে গোলাপি আভা। পাড়ায় আরও অন্য শব্দ শোনা যাচ্ছে–গানের শব্দ, পিয়ানোর শব্দ, দরজা-জানালা খোলা ও বন্ধ করার শব্দ।
