ভদ্রলোক নিজের সুটকেস নিজেই হাতে করে নেমে একটি কুলিকে হাঁক দিয়ে ডাকলেন। কুলির সঙ্গে সঙ্গে অরূপবাবুও এগিয়ে গেলেন।
আপনি মিস্টার মৌলিক না?
ভদ্রলোক যেন একটু অবাক হয়েই অরূপবাবুর দিকে ফিরে ছোট্ট করে মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ। কুলি সুটকেসটা মাথায় চাপিয়েছে। এছাড়া মাল রয়েছে অরূপবাবুর কাঁধে একটি ব্যাগ ও একটি ফ্লাস্ক। তিনজনে গেটের দিকে রওনা দিলেন। অরূপবাবু বললেন–
আমি আপনার বই পড়েছি। কাগজে আপনার পুরস্কারের কথা পড়লাম, আর ছবিও দেখলাম।
ও।
আপনি সি-ভিউতে উঠছেন?
অমলেশ মৌলিক এবার যেন আরও অবাক ও খানিকটা সন্দিগ্ধভাবে অরূপবাবুর দিকে চাইলেন। অরূপবাবু মৌলিকের মনের ভাবটা আন্দাজ করে বললেন, সি-ভিউয়ের ম্যানেজার আপনার একজন ভক্ত। তিনিই খবরটা রটিয়েছেন।
ও।
আপনি আসছেন শুনে এখানকার অনেক ছেলেমেয়েরা উদগ্রীব হয়ে আছে।
উঁ।
লোকটা এত কম কথা বলে কেন? তার হাঁটার গতিও যেন কমে আসছে। কী ভাবছেন ভদ্রলোক?
অমলেশ মৌলিক এবার একদম থেমে গিয়ে অরূপবাবুর দিকে ফিরে বললেন, অনেকে জেনে গেছে?
সেইরকমই তো দেখলাম। কেন, আপনার কি তাতে অসুবিধে হল?
না, মানে, আমি আবার একটু একা থাকতে পপ্—পপ্–পপ্–
পছন্দ করেন?
হ্যাঁ।
তোতলা। অরূপবাবুর মনে পড়ে গেল অষ্টম এডওয়ার্ড হঠাৎ সিংহাসন ত্যাগ করার ফলে তাঁর পরের ভাই জর্জ ভারী চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন তোতলা, অথচ তাঁকেই রাজা হতে হবে, আর হলেই বক্তৃতা দিতে হবে।
কুলি মাল নিয়ে গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে দেখে দুজনে আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
একেই বলে খ্যাখ–খ্যাতির বি–ইড়ম্বনা।
অরূপবাবু কল্পনা করতে চেষ্টা করলেন এই তোতলা সাহিত্যিকের সঙ্গে আলাপ করে ঝুনি পিন্টু চুমকি শান্তনু বাবুন প্রসেনজিৎ আর নবনীতার মুখের অবস্থা কীরকম হবে। কল্পনায় যেটা দেখলেন সেটা তাঁর মোটেই ভাল লাগল না।
একটা কাজ করবেন?–গেটের বাইরে এসে অরূপবাবু প্রশ্ন করলেন।
কী?
আপনার ছুটিটা ভক্তদের উৎপাতে মাঠে মারা যাবে এটা ভাবতে মোটেই ভাল লাগছে না।
আমারও না।
আমি বলি কি আপনি সি-ভিউতে যাবেন না।
তাৎ-তা হলে?
সি-ভিউয়ের খাওয়া ভাল না। আমি ছিলাম সাগরিকায়। এখন আমার ঘরটা খালি। আপনি সেখানে চলে যান।
ও।
আর আপনি নিজের নামটা ব্যবহার করবেন না। সবচেয়ে ভাল হয় যদি আপনি গোঁফটা কামিয়ে ফেলতে পারেন।
গোঁ-গোঁ–?
এক্ষুনি। ওয়েটিং রুমে চলে যান, দশ মিনিটের মামলা। এটা করলে আপনার নির্ঝঞ্ঝাট ছুটিভোগ কেউ রুখতে পারবে না। আমি বরং কাল কলকাতায় ফিরে আপনার নামে সি-ভিউতে একটা টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দেব আপনি আসছেন না।
প্রায় বিশ সেকেন্ড লাগল অমলেশ মৌলিকের কপাল থেকে দুশ্চিন্তার রেখাগুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে। তারপর তাঁর ঠোঁটের আর চোখের দুপাশে নতুন রেখা দেখা দিল। মৌলিক হাসছেন।
আপনাকে যে কি কি বলে ধ–ধ-ধ–
কিছু বলতে হবে না। আপনি বরং এই বইগুলোতে একটা করে সই দিন। আসুন এই নিমগাছটার পিছনে–কেউ দেখতে পাবে না।
গাছের আড়ালে গিয়ে ভক্তের দিকে চেয়ে একটা মোলায়েম হাসি হেসে পকেট থেকে লাল পাকার কলমটি বার করলেন অমলেশ মৌলিক। প্রাইজ পাবার দিনটি থেকে শুরু করে অনেক কাগজ অনেক কালি খরচ করে তিনি একটি চমৎকার সই বাগিয়েছেন। পাঁচটি বইয়ে পাঁচটি সই। তিনি জানেন যে তাঁর জিভ তোতলালেও কলম তোতলায় না।
সন্দেশ, শারদীয়া ১৩৮১
ভূতো
নবীনকে দ্বিতীয়বার হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হল। অক্রূরবাবুর মন ভেজানো গেল না। উত্তরপাড়ার একটা ফাংশনে নবীন পেয়েছিল অক্রূর চৌধুরীর আশ্চর্য ক্ষমতার পরিচয়। ভেট্রিলোকুইজম। খেলার নামটা নবীনের জানা ছিল না। সেটা বলে দেয় দ্বিজপদ। দ্বিজুর বাবা অধ্যাপক, তাঁর লাইব্রেরিতে নানান বিষয়ের বই। দ্বিজু নামটা বলে বানানটাও শিখিয়ে দিল। ভি-ই-এন-টি-আর-আই-এল-ও-কিউ-ইউ-আই-এস-এম। ভেনট্রিলোকুইজম। অক্রূর চৌধুরী মঞ্চে একা মানুষ, কিন্তু তিনি কথা চালিয়ে যাচ্ছেন আর-একজন অদৃশ্য মানুষের সঙ্গে। সেই মানুষ যেন হলের সিলিংএর কাছাকাছি কোথাও শুন্যে অবস্থান করছে। অক্রবাবু তাকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করেন, তারপর উত্তর আসে উপর থেকে।
হরনাথ, কেমন আছ?
আজ্ঞে আপনার আশীর্বাদে ভালই আছি।
শুনলাম তুমি নাকি আজকাল সংগীতচর্চা করছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন।
রাগ সংগীত?
আজ্ঞে হ্যাঁ, রাগ সংগীত।
গান করো?
আজ্ঞে না।
যন্ত্র সংগীত?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কী যন্ত্র? সেতার?
আজ্ঞে না।
সরোদ?
আজ্ঞে না।
তবে কী বাজাও?
আজ্ঞে গ্রামোফোন।
হাসি আর হাততালিতে হল মুখর হয়ে ওঠে। প্রশ্নটা উপর দিকে চেয়ে করে উত্তরটা শোনার ভঙ্গিতে মাথাটা একটু হেঁট করে নেন অক্রূরবাবু, কিন্তু তিনি নিজেই যে উত্তরটা দিচ্ছেন সেটা বোঝার কোনও উপায় নেই। ঠোঁট একদম নড়ে না।
নবীন তাজ্জব বনে গিয়েছিল। এ জিনিস শিখতে না পারলে জীবনই বৃথা। অক্রূর চৌধুরী কি ছাত্র নেবেন না? নবীনের পড়াশুনোয় আগ্রহ নেই। হাইয়ার সেকেন্ডারি পাশ করে বসে আছে বছর তিনেক। আর পড়ার ইচ্ছে হয়নি। বাপ নেই, কাকার বাড়িতেই মানুষ সে। কাকার একটা প্লাইউডের কারখানা আছে; তাঁর ইচ্ছে নবীনকে সেখানেই ঢুকিয়ে দেন, কিন্তু নবীনের শখ হল ম্যাজিকের দিকে। হাত সাফাই, রুমালের ম্যাজিক, আংটির ম্যাজিক, বলের ম্যাজিক–এসব সে বাড়িতেই অভ্যাস করে বেশ খানিকটা আয়ত্ত করেছে। কিন্তু অক্রূর চৌধুরীর ভেট্রিলোকুইজম দেখার পরে সেগুলোকে নিরামিষ বলে মনে হচ্ছে।
