ডাক্তার জে হার্ডকালের ডায়রির শেষ এখানেই।
দি টেরর অফ ব্লু জন গ্যাপ
সন্দেশ, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৪
ভক্ত
অরূপবাবু–অরূপরতন সরকার–পুরী এসেছেন এগারো বছর পরে। শহরে কিছু কিছু পরিবর্তন চোখে পড়েছে–কিছু নতুন বাড়ি, নতুন করে বাঁধানো কয়েকটা রাস্তা, দু-চারটে ছোট-বড় নতুন হোটেল–কিন্তু সমুদ্রের ধারটায় এসে বুঝতে পারলেন এ জিনিস বদলাবার নয়। তিনি যেখানে এসে উঠেছেন, সেই সাগরিকা হোটেল থেকে সমুদ্র দেখা না গেলেও, রাত্তিরে বাসিন্দাদের কলরব বন্ধ হয়ে গেলে দিব্যি ঢেউয়ের শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দ শুনে কাল তো অরূপবাবু বেরিয়ে পড়লেন। কালই তিনি পুরীতে এসেছেন; দিনে কিছু কেনাকাটার ব্যাপার ছিল তাই আর সমুদ্রের ধারে যাওয়া হয়নি। রাত্তিরে গিয়ে দেখলেন অমাবস্যার অন্ধকারেও ঢেউয়ের ফেনা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। অরূপবাবুর মনে পড়ল ছেলেবেলায় কোথায় জানি পড়েছিলেন যে সমুদ্রের জলে ফসফরাস থাকে, আর সেই কারণেই অন্ধকারেও ঢেউগুলো দেখা যায়। ভারী ভাল লাগল অরূপবাবুর এই আলোমাখা রহস্যময় ঢেউ দেখতে। কলকাতায় তাঁকে দেখলে কেউ ভাবুক বলে মনে করবে না। তা না করুক। অরূপবাবু নিজে জানেন তাঁর মধ্যে এককালে জিনিস ছিল। সেসব যাতে কাজের চাপে একেবারে ভোঁতা না হয়ে যায় তাই তিনি এখনও মাঝে মাঝে গঙ্গার ধারে, ইডেন বাগানে গিয়ে বসে থাকেন, গাছ দেখে জল দেখে ফুল দেখে আনন্দ পান, পাখির গান শুনে চিনতে চেষ্টা করেন সেটা দোয়েল না কোয়েল না পাপিয়া। অন্ধকারে অনেকক্ষণ ধরে একদৃষ্টে সমুদ্রের দিকে চেয়ে থেকে তাঁর মনে হল যে, ষোলো বছরের চাকরি জীবনের অনেকখানি অবসাদ যেন দূর হয়ে গেল।
আজ বিকেলেও অরূপবাবু সমুদ্রের ধারে এসেছেন। খানিকদূর হেঁটে আর হাঁটতে মন চাইছে না, কে এক গেরুয়াধারী সাধুবাবা বা গুরুগোছের লোক হনহনিয়ে বালির উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে, তার পিছনে একগাদা মেয়ে পুরুষ চেলা-চামুণ্ডা তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে, অরূপবাবুর কাছে এ দৃশ্য পরম উপভোগ্য বলে মনে হচ্ছে, এমন সময় তাঁর বাঁ দিক থেকে কচি গলায় একটি প্রশ্ন হাওয়ায় ভেসে তাঁর কানে এল–
খোকনের স্বপ্ন কি আপনার লেখা?
অরূপবাবু ঘাড় ফিরিয়ে দেখলেন একটি সাত-আট বছরের ছেলে, পরনে সাদা শার্ট আর নীল প্যান্ট, হাতের কনুই অবধি বালি। সে ঘাড় উঁচিয়ে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে আছে তাঁর দিকে। অরূপবাবুর উত্তরের অপেক্ষা না করেই ছেলেটি বলল, আমি খোকনের স্বপ্ন পড়েছি। বাবা জন্মদিনে দিয়েছিল। আমার…আমার…
বলল, লজ্জা কী, বলো!
এবার একটি মহিলার গলা।
ছেলেটি যেন সাহস পেয়ে বলল, আমার খুব ভাল লেগেছে বইটা।
এবার অরূপবাবু মহিলাটির দিকে দৃষ্টি দিলেন। বছর ত্রিশ বয়স, সুশ্রী চেহারা, হাসি হাসি মুখ করে তাঁর দিকে চেয়ে আছেন, আর এক পা দু পা করে এগিয়ে আসছেন।
অরূপবাবু ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, না খোকা, আমি কোনও বইটই লিখিনি। তুমি বোধহয় ভুল করছ।
ভদ্রমহিলা যে ছেলেটির মা তাতে কোনও সন্দেহ নেই। দুজনের চেহারায় স্পষ্ট আদল আছে, বিশেষ করে খাঁজকাটা থুতনিটায়।
অরূপবাবুর কথায় কিন্তু মহিলার মুখের হাসি গেল না। তিনি আরও এগিয়ে এসে আরও বেশি হেসে বললেন, আমরা শুনেছি আপনি লোকজনের সঙ্গে মিশতে ভালবাসেন না। আমার এক দেওর আপনাকে একটা অনুষ্ঠানে সভাপতি হবার অনুরোধ করে চিঠি লিখেছিল; আপনি উত্তরে জানিয়েছিলেন ওসব আপনার একেবারেই পছন্দ না। এবারে কিন্তু আমরা আপনাকে ছাড়ছি না। আপনার লেখা আমাদের ভীষণ ভাল লাগে। যদিও ছোটদের জন্য লেখেন কিন্তু আমরাও পড়ি।
খোকনের স্বপ্ন বইয়ের লেখক যিনিই হন না কেন, মা ও ছেলে দুজনেই যে তাঁর সমান ভক্ত সেটা বুঝতে অরূপবাবুর অসুবিধা হল না। এমন একটা বেয়াড়া অবস্থায় তাঁকে পড়তে হবে এটা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। এদের ধারণা যে ভুল সেটা জানানো দরকার, কিন্তু সরাসরি কাঠখোট্টাভাবে জানালে এঁরা কষ্ট পাবেন ভেবে অরূপবাবু কিঞ্চিৎ দ্বিধায় পড়লেন। আসলে অরূপবাবুর মনটা ভারী নরম। একবার তাঁর পোপা গঙ্গাচরণ তাঁর একটা নতুন আদ্দির পাঞ্জাবিতে ইস্তিরির দাগ লাগিয়ে সেটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল। অন্য কেউ হলে গঙ্গাচরণকে দু-এক ঘা কিল চড় খেতে হত নির্ঘাত। অরূপবাবু কিন্তু ধোপার করুণ কাঁচুমাচু ভাব দেখে শুধু একটিবার মোলায়েমভাবে ইস্তিরিটা একটু সাবধানে করবে তো বলে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
তাঁর এই দরদী মনের জন্যই আপাতত আর কিছু না বলে বললেন, ইয়ে–আমি যে খোকনের স্বপ্নের লেখক সে-বিষয় আপনি এতটা শিওর হচ্ছেন কী করে?
মহিলা চোখ কপালে তুলে বললেন, বাঃ–সেদিনই যুগান্তরে ছবি বেরোলো না। বাংলাভাষায় বছরের শ্রেষ্ঠ শিশুসাহিত্যিক হিসেবে আপনি আকাদেমি পুরস্কার পেলেন, রেডিওতে বলল, আর তার পরদিনই তো কাগজে ছবি বেরোলো। এখন শুধু আমরা কেন, অনেকেই অমলেশ মৌলিকের চেহারা। জানে।
অমলেশ মৌলিক! নামটা শোনা, কিন্তু ছবিটা অরূপবাবু দেখেননি। এতই কি চেহারার মিল? অবিশ্যি আজকালকার খবরের কাগজের ছাপায় মুখ অত পরিষ্কার বোঝা যায় না।
আপনি পুরীতে আসবেন সে খবর রটে গেছে যে, মহিলা বলে চললেন। আমরা সেদিন সি-ভিউ হোটেলে গেলাম। আমার স্বামীর এক বন্ধু কাল পর্যন্ত ওখানে ছিলেন। তাঁকে হোটেলের ম্যানেজার নিজে বলেছেন যে আপনি বিষুদবার আসছেন। আজই তো বিষুদ। আপনি সি-ভিউতে উঠেছেন তো?
