এই সামান্য কারণেও যে ব্রাউনি হেসেছে তাতে অসমঞ্জবাবুর বেশ অবাক লাগল। তিনি দেখলেন যে পোস্টাপিসে কাজের ফাঁকে ফাঁকে বার বার ব্রাউনির কৌতুকভরা দৃষ্টি আর হাসির ফিক শব্দটা মনে পড়েছে। অল অ্যাবাউট ডগস-এ কুকুরের হাসির কথা না থাকলেও, কুকুরের এনসাইক্লোপিডিয়া গোছের একটা বই জোগাড় করতে পারলে তিনি নিশ্চয়ই এ বিষয় কিছু জানতে পারতেন।
ভবানীপুরের চারটে বইয়ের দোকান, আর তারপর নিউ মার্কেটের সবকটা বইয়ের দোকান খুঁজেও যখন তিনি ওই জাতীয় কোনও এনসাইক্লোপিডিয়া পেলেন না, তখন মনে হল রজনী চাটুজ্যের কাছে গেলে কেমন হয়? তাঁর পাড়াতেই থাকেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রজনী চাটুজ্যে। কী বিষয়ে অধ্যাপনা করতেন ভদ্রলোক সেটা অসমঞ্জবাবু জানেন না, কিন্তু তাঁর বৈঠকখানাটি যে ভারী ভারী বইয়ে ঠাসা সেটা তাঁর বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেই দেখা যায়।
এক রবিবার সকালে দুগা বলে রজনী চাটুজ্যের বাড়ি গিয়ে হাজির হলেন অসমঞ্জবাবু। দূর থেকে ভদ্রলোককে দেখেছেন অনেকবার, কিন্তু তাঁর গলার স্বর যে এত ভারী, আর ভুরু যে এত ঘন সেটা জানা ছিল না। রাগি মানুষ হলেও দরজা থেকে ফিরিয়ে দেননি, তাই খানিকটা ভরসা পেয়ে অসমঞ্জবাবু অধ্যাপকের মুখোমুখি সোফাটায় বসে একবার ছোট্ট করে কেশে গলাটা ঝেড়ে নিলেন। রজনীবাবু হাতের ইংরিজি পত্রিকাটি চোখের সামনে থেকে সরিয়ে তাঁর দিকে দৃষ্টি দিলেন।
আপনাকে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে?
আজ্ঞে আমি এ পাড়াতেই থাকি।
অ।… কী ব্যাপার?
আপনার বাড়িতে একটা কুকুর দেখেছি, তাই…
তাই কী? আছে তো কুকুর। একটা কেন, দুটো আছে।
ও। আমারও আছে।
আপনারও আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। একটা।
বুঝলাম।–তা আপনি কি কুকুর-পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে আসছেন?
অসমঞ্জবাবু সরল মানুষ, তাই শ্লেষটা ধরতে পারলেন না। বললেন, আজ্ঞে না। একটা জিনিসের খোঁজ করতে আপনার কাছে এসেছি।
কী জিনিস?
আপনার কাছে কি কুকুরের এনইক্লোপিডিয়া আছে?
না, নেই।…ও জিনিসটার দরকার হচ্ছে কেন?
না, মানে–আমার কুকুর হাসে। তাই জানতে চাইছিলাম কুকুরের হাসিটা স্বাভাবিক কিনা। আপনার কুকুরও হাসে কি?
রজনীবাবুর দেয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে আটটা বাজতে যতটা সময় লাগল, ততক্ষণ একটানা তিনি অসমঞ্জবাবুর দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, কখন হাসে আপনার কুকুর? রাত্তিরে কি?
হ্যাঁ, তা রাত্তিরেও…
রাত্তিরে আপনি করকম নেশা করেন? শুধু গাঁজায় তো হয় না এ জিনিস। তার সঙ্গে ভাঙ, চরস, আফিং–এসবও চলে কি?
অসমঞ্জবাবু বিনীতভাবে জানালেন যে একমাত্র ধূমপান ছাড়া তাঁর আর কোনও নেশা নেই, আর সেটাও তিনি কুকুর আসার পর থেকে হপ্তায় চার প্যাকেট থেকে তিন প্যাকেটে নামিয়েছেন, কারণ খরচে কুলোয় না।
তাও বলছেন আপনার কুকুর হাসে?
আমি দেখেছি হাসতে। শুনেছি। আওয়াজ করে হাসে।
শুনুন–।
রজনী চাটুজ্যে হাতের পত্রিকাটা বন্ধ করে সোজা হয়ে বসে অসমঞ্জবাবুর দিকে তাকিয়ে একেবারে ষোলো আনা অধ্যাপকের মেজাজে বলেন, আপনার একটি তথ্য বোধহয় জানা নেই; সেটা জেনে রাখুন। ঈশ্বরের সৃষ্ট যত প্রাণী আছে জগতে, তার মধ্যে মানুষ ছাড়া আর কেউ হাসে না, হাসতে জানে না, হাসতে পারে না। এটাই হচ্ছে মানুষ আর অন্য প্রাণীর মধ্যে প্রধান পার্থক্য। কেন এমন হল সেটা জিজ্ঞেস করবেন না, কারণ সেটা জানি না। শুনেছি ডলফিন নামে শুশুক জাতীয় একরকম প্রাণীর নাকি রসবোধ আছে, তারা হাসলেও হাসতে পারে, কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও প্রাণী হাসে না। মানুষ যে কেন হাসে সেটার কোনও স্পষ্ট কারণ জানা নেই। বাঘা বাঘা দার্শনিকরা অনেক ভেবে এর কারণ নির্দেশ করতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাঁদের মতের মিল হয়নি।–বুঝেছেন?
অসমঞ্জবাবু বুঝলেন, আর এও বুঝলেন যে এবার তাঁকে উঠতে হবে, কারণ রজনী চাটুজ্যের দৃষ্টি কথা শেষ করেই চলে গেছে তাঁর হাতের পত্রিকার দিকে।
.
ডাঃ সুখময় ভৌমিক–যাঁকে কেউ কেউ ভৌ-ডাক্তার বলেন কলকাতার একজন নামকরা কুকুরের ডাক্তার। সাধারণ লোকে তাঁর কথা হেসে উড়িয়ে দিলেও একজন কুকুরের ডাক্তার সেটা করবে না এই বিশ্বাসে অসমঞ্জবাবু খোঁজ খবর নিয়ে টেলিফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে গোখেল রোডে ভৌমিকের বাড়ি গিয়ে হাজির হলেন। গত চার মাসে সতেরো বার হেসেছে ব্রাউনি। এটা অসমঞ্জবাবু লক্ষ করেছেন যে মজার কথা শুনলে ব্রাউনি হাসে না, কেবল মজার ঘটনা দেখলেই হাসে। যেমন বোম্বাগড়ের রাজা শুনে ব্রাউনির মুখে কোনও পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু আধসেদ্ধ আলুর দমের আলু যখন অসমঞ্জবাবুর আঙুলের চাপে পিছলে ছিটকে দইয়ের মধ্যে পড়ল, আর সেই দইয়ের ছিটে যখন অসমঞ্জবাবুর নাকের ডগায় লাগল, তখন ব্রাউনির প্রায় বিষম লাগার জোগাড়। রজনী চাটুজ্যে ঈশ্বরসৃষ্ট প্রাণী-টানি বলে তো তাঁকে বিস্তর জ্ঞান দিলেন, কিন্তু অসমঞ্জবাবুর চোখের সামনে যে অধ্যাপকের কথা মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে তার কী হবে?
এই সব ভেবে-টেবে বিশ টাকা ফি জেনেও অসমঞ্জবাবু গেলেন ভৌ-ডাক্তারের কাছে। কুকুরের হাসির কথা শোনার আগেই তার চেহারা দেখে ডাক্তারের চোখ কপালে উঠল।
অনেক মংগ্রেল দেখিচি মশাই, কিন্তু এমনটি তো দেখিনি।
ডাক্তার দুহাতে ব্রাউনিকে তুলে তাঁর টেবিলের উপর দাঁড় করালেন। ব্রাউনি তার পায়ের সামনে পিতলের পেপারওয়েটটাকে একবার শুকে নিল।
