‘তবে?’
‘এই ধরুন, ব্রন্টোসরাস, টিরানোসরাস, ডাইনোসরাস, এইসব আর কি!’
‘তার মানে আপনি কি ওদেশেও গেছেন নাকি?’
‘ওই তো ভুল! ওদেশে কেন? আপনার কি ধারণা এসব জিনিস আমাদের দেশে ছিল না?’
‘ছিল নাকি?’
‘ছিল মানে? এই ঠিক এইখানটাতেই ছিল। এই বেঞ্চির পাশটাতেই।’
বদনবাবুর মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শিহরণ খেলে গেল।
আগন্তুক বললেন, ‘গঙ্গা নামেনি তখনও। এইসব জায়গায় তখন ছিল এবড়ো-খেবড়ো পাথরের ঢিপি, আর লতাপাতা গাছপালার জঙ্গল। সে দৃশ্য ভুলব না। ওই জেটির জায়গাটায় একটা শেওলাভরা ডোবা। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। একটা আলেয়া ধক করে জ্বলে উঠে মিনিটখানেক দুলে দুলে নিভে গেল। তারই আলোয় দেখলাম দুটো ভাঁটার মতো চোখ। চাইনিজ ড্রাগনের ছবি দেখেছেন তো? এও ঠিক তাই। বইয়ে ছবি দেখা ছিল। বুঝলাম এই সেই স্টেগোসরাস। কীসের জানি পাতা চিবুতে চিবুতে জলার উপর দিয়ে ছপছপ করে এগিয়ে আসছে। মানুষ খাবে না জানি, কারণ এরা উদ্ভিদজীবী, কিন্তু তাও দেখি ভয়ে ঢোক গিলতে পারছি না। বর্তমানে ফিরে আসার সুইচটা টিপতে যাব, এমন সময় আমার মাথার উপর হঠাৎ একটা ঝটাপট শব্দ শুনে চমকে চেয়ে দেখি একটা টেরোড্যাকটিল–সে না পাখি, না জানোয়ার, না বাদুড়-জন্তুটার দিকে গোঁত খেয়ে ধাওয়া করে গেল। এ আক্রোশের কারণ বুঝলাম হঠাৎ আমার পাশেই পাথরের ঢিবিটার দিকে চোখ পড়াতে। পাথরের গায়ে একটা বেশ বড় ফাটলে দেখি একটা সাদা গোল চকচকে ডিম। টেরোড্যাকটিলের ডিম। দেখে ভয়ের মধ্যেও লোভ সামলাতে পারলুম না। ওদিকে লড়াই বেধেছে, আর এদিকে আমি দিব্যি ডিমটি বগলস্থ করে নিয়ে…হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ।’
বদনবাবুর কিন্তু হাসি পেল না। গল্পের জগতের বাইরে হয় নাকি এসব?
‘যন্ত্রটা আপনাকে পরীক্ষা করতে দিতাম, কিন্তু—’
বদনবাবুর কপালের শিরা দপদপ করে উঠল। ঢোক গিলে বললেন, ‘কিন্তু কী?’
‘ফল পাবার সম্ভাবনা খুবই কম।‘
‘কে-কেন?’
‘তবু একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। লাভ না-হলেও ক্ষতির সম্ভাবনা তো নেই।’
বদনবাবু গলা বাড়িয়ে দিলেন। জয় মা জগত্তারিণী! নিরাশ কোরো না মা!
আগন্তুক নলের মুখ দুটি বদনবাবুর দু’ কানে গুঁজে দিয়ে সুইচটা টিপে খপ করে তাঁর ডান হাতের কবজিটা ধরে ফেললেন।
‘নাড়িটা দেখতে হবে।’
বদনবাবু বলির পাঁঠার মতো কাঁপতে কাঁপতে মিহি গলায় বললেন, ‘অতীত, না ভবিষ্যৎ?’
আগন্তুক বললেন, অতীত। সিক্স থাউসেন্ড বি. সি. চোখটা চেপে বন্ধ করুন।
বদনবাবু অধীর উৎকণ্ঠায় মিনিটখানেক চোখ বুজে বসে থেকে বললেন, ‘কই, কিছু হচ্ছে না তো।’
আগন্তুক যন্ত্রটা খুলে নিলেন।
হবার সম্ভাবনা ছিল কোটিতে এক।
‘কেন?’
‘আমার মাথার আর আপনার মাথার চুলের সংখ্যা যদি এক হত তা হলেই আপনার ক্ষেত্রে যন্ত্রটা কাজ করত।’
বদনবাবু ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেলেন। হায় হায় হায়! এমন সুযোগটা এভাবে নষ্ট হল?
আগন্তুক আবার থলির ভিতর হাত ঢোকালেন।
চাঁদের আলোয় এখন চারিদিক বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
‘একবার হাতে নিয়ে দেখতে পারি?’ বদনবাবু কথাটা জিজ্ঞেস করার লোভ সামলাতে পারলেন না।
আগন্তুক সাদা গোল চকচকে জিনিসটা এগিয়ে দিলেন।
বেশ ভারী। আর আশ্চর্য মসৃণ।
‘দিন। এবার উঠতে হয়। রাত হল।‘
বদনবাবু ডিমটা ফিরিয়ে দিলেন। আরও কত অভিজ্ঞতা আছে এঁর কে জানে! বললেন, কাল আবার আসছেন তো এইখানে?
‘দেখি। কাজ তো পড়ে আছে অনেক। বইয়ে লেখা ঐতিহাসিক তথ্যগুলো তো এখনও কিছুই যাচাই করা হয়নি। কলকাতার গোড়াপত্তনের ব্যাপারটাও দেখতে হবে একবার। চার্নক বাবাজিকে নিয়ে বড় বেশি বাড়াবাড়ি করেছে এরা।…আজ আসি। জয় গুরু!
.
ট্রামে উঠে বদনবাবুকে একটা বাজে অজুহাতে আবার নেমে যেতে হল। কারণ পকেটে হাত দিয়েই তিনি চোখে অন্ধকার দেখলেন।
।মানিব্যাগটা উধাও।
বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বুঝেছি। যখন চোখ বন্ধ করেছিলাম, আর লোকটা হাত ধরল নাড়ি দেখতে…ইস, ছি ছি ছি! কী বেকুবই না বনেছি আজ।
.
বাড়ি যখন পৌঁছলেন তখন আটটা।
বাবাকে দেখে বিলটুর মুখটা হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
এতক্ষণে কিন্তু বনবাবুও অনেকটা হালকা বোধ করছেন।
জামার বোতাম খুলতে খুলতে বললেন, ‘আজ তোকে একটা ভাল গল্প বলব।’
‘সত্যিই তো? অন্যদিনের মতো নয় তো?”
‘না রে! সত্যিই।’
‘কীসের গল্প বাবা?’
‘টেরোড্যাকটিলের ডিম। আর তা ছাড়া আরও অনেক। একদিনে ফুরোবে না।’
সত্যি বলতে কী, বিলটুর খুশির খোরাক আজ একদিনে যত পেয়েছেন তিনি, তার দাম কি অন্তত পঞ্চান্ন টাকা বত্রিশ নয়া পয়সাও হবে না?
সন্দেশ, ফাল্গুন ১৩৬৮
টেলিফোন
ক্রিং-ক্রিং…ক্রিং ক্রিং…ক্রিং ক্রিং…
বীরেশবাবু বিরক্ত হয়ে খাটের পাশের টেবিলের ওপর রাখা টেলিফোনটার দিকে দেখলেন। টেলিফোনের পাশেই ঘড়ি, তাতে বারোটা বাজে। রাত বারোটা। বীরেশবাবু সবে হাতের বইটা বন্ধ করে ঘরের বাতিটা নেভাতে যাচ্ছিলেন। এদিকে টেলিফোনটা বেজেই চলেছে। বীরেশবাবু রিসিভারটা তুলে নিলেন।
হ্যালো—
ফোর সিক্স ফাইভ ওয়ান সেভেন সিক্স?
ইয়েস—
বীরেশবাবু আছেন? বীরেশচন্দ্র নিয়োগী?
কথা বলছি।
ও। নমস্কার।
নমস্কার।
এত রাত্রে ফোন করছি বলে কিছু মনে করবেন না।
ঠিক আছে। কী ব্যাপার?
আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা ছিল।
আপনি কে বলছেন জানতে পারি কি?
