পুলিনবিহারীর বয়স তেষট্টি, মাথায় কাঁচাপাকা চুল, শক্ত গড়ন। গায়ে ঘেমো ময়লা একখানা পলিয়েস্টারের পাঞ্জাবি, আধময়লা ধুতি, চোখে চশমা। মাতব্বর লোক। একটা খবর একটু ঝুঁকেই পড়ছিল। জম্পেশ খবরই হবে। দুনিয়ায় খবরের অভাব কী? খবরের কাগজ হল কুচুটে মেয়েছেলের মতো, যত রাজ্যের গালগল্প ফেঁদে বসে মানুষের কাছে।
ট্রেন চলছে বটে, কিন্তু জানলা দিয়ে তেমন হাওয়া আসছে না। যা আসছে তা যেন কামারশালায় হাপরের ফু। জানলার ধারটা পাওয়া যায়নি। ওদিকে দুটো লোক। বাকি দুজন সে আর পুলিনবিহারী। তিনজনের সিটে চারজন। এটাই নিয়ম। ঠাসন্ত ভিড়। ওপরে পাখা-টাখা ছিল এককালে। কে খুলে নিয়ে গেছে।
বদরী আলালের ঘরের দুলাল নয়। গরমও সয়, শীতও সয়। তবে মাঠে-ঘাটে খোলামেলা থাকার একটা রকম আছে। এই যে খাঁচায় পোরা অবস্থা, এটা তার অভ্যেস নেই।
ট্রেনটা একটা আঘাটায় দাঁড়াল। তা এরকম দাঁড়ায়। পুলিনবিহারীর বাঁ-হাতে ঘড়ি। দেখে নিয়ে বলল, চারটেয় পৌঁছোতে পারলে ফেরার শেষ ট্রেনটা পেয়ে যাব।
ফিরতেই হবে। কচি মেয়েটাকে রেখে এসেছি।
আহা, অত উতলা হলে চলে? জলে তো আর ফেলে আসিসনি। পিসির কাছেই তো আছে। বিলাসী বুক দিয়ে আগলে রাখে।
না ফিরলে চিন্তা করবে। রাতে পিসির কাছে থাকতে চায় না। তার ওপর বিলাসীর যা গন্ধমাদন ঘুম। রাতে ভয় খেয়ে পিসিকে ডাকলেও উঠবে না।
ঘড়িটা আবার দেখে পুলিন বলল, আর চারটে স্টেশন। তারপরই নেমে পড়ব। মেরেকেটে তিন মাইল রাস্তা। মনে হচ্ছে হয়ে যাবে। ফেরার শেষ ট্রেন সাড়ে নটায়।
যারা দাঁড়িয়েছিল তাদের মধ্যে একজন বলল, নটা-কুড়ি, যাবেন কোথা?
মৌলবির বাজার।
অ। দূর আছে।
পুলিন পাঞ্জাবিটা তুলে ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে পেট চুলকোল। চশমাটা ঘামে পিছলে নাকের ডগায় নেমে এসেছে। সামনের দুটো দাঁত নেই। বলল, আর দেরি না করলেই হল।
এদিককার ট্রেন এরকমই চলে। দাঁড়ায়, জিরোয়, ঘুমিয়েও পড়ে। ট্রেন নড়ছে না।
বদরীর একটা আঁকুপাঁকু লাগে। গরম, ঘাম, ভিড় সব সহ্য হয়, কিন্তু দেরিটা ভোগাবে। তেমনি দেরি হলে–বদরী ঠিক করেই রেখেছে–দাঁইহাট স্টেশন থেকেই ফিরতি ট্রেন ধরবে। বিলাসী শ্বশুরবাড়ি থেকে মোটে আসতে চায় না। সেখানে বিরাট সংসার। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আনিয়েছে। কাল-ই তার রওনা হওয়ার কথা। তার মেয়ে নন্দরানির বয়স মোটে তিন। বিলাসীর তিনটে মেয়ে একটা ছেলে। দিনের বেলাটা নদু ওদের সঙ্গে বেশ থাকবে। তবে রাত হলে তার বাপকে চাই। মা-মরা মেয়ে, বাপের বড্ড নেই-আঁকড়া। বাপের দিক থেকে একটা একরকমের ভাবনা থাকে। আবার মেয়ের দিক থেকেও আর একরকমের ভাবনা আছে। এমন হতে পারে, মেয়ে বাপের কথা তেমন ভাবছে না। যেমনটা মেয়ে ভাবছে বলে মনে করছে, তেমনটা নয়।
পুলিনদা, কী হবে?
পুলিন একটা ময়লা রুমালে নাক মুছল। চশমাটা ফের নাকে বসিয়ে বলল, অত ভাবছিস কেন? খবরের কাগজটা ভাঁজ করে একটু হাওয়া খাওয়ার চেষ্টা করল পুলিন। পুলিনবিহারীর পিছুটান তেমন নেই। গাঁয়ের মাতব্বর হলে কী হয়, বাড়িতে বিরাট সংসারে তেমন পোঁছে না কেউ। ছেলেরা লায়েক হয়েছে, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে, পুলিনবিহারীও নানা কাজে বারমুখো। যেখানে সেখানে দেহখানা রাখলেই হয়। দু-চার দিন তার খোঁজও হবে না।
পুলিন বলল, কাজটা আসল, না ফেরাটা আসল?
ভারি তো কাজ! বলে বদরী মুখ ফিরিয়ে নিল।
কে একজন বিড়ি ধরিয়েছে, তার ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে এদিকে। এই দমবন্ধ অবস্থায় বিড়ির গন্ধ যেন, আরও গরম করে দিল কামরাখানা। চারদিকে অনড় ভিড়। তবে গোলমালটা কম। গরমে হাঁফিয়ে গিয়ে লোকের আর কথা বলার মতো দম নেই। শুধু শালা, সুমুন্ধির পুত, রেল কোম্পানির ইয়ে করেছে, গোছের কয়েকটা কথা কানে এল।
গাড়ি একটা স্তিমিত ভোঁ দিয়ে অবশেষে ছাড়ল। পুলিন ঘড়ি দেখে বলল, হয়ে যাবে।
কী হয়ে যাবে?
সময় থাকবে হাতে। ভাবিসনি।
আরও চারটে স্টেশন, তার মধ্যে কত কী হয়ে যেতে পারে!
পুলিন মুখটা কুঁচকে বাইরের দিকে চেয়ে রইল। আজ রোদটাও উঠেছে।
চারদিকটা যেন স্টিলের বাসনের দোকান হয়ে আছে।
পরের স্টেশনটা কাছেই ছিল। থামতেই কিছু লোক নামায় কামরাটা কিছু হালকা হল। জানলার দিকের দুটো লোক উঠল বটে, কিন্তু বদরী ওদিকে এগোল না। তেরছা হয়ে রোদ পড়ছে জানলা দিয়ে।
ঝালমুড়ি, শসা আর দাঁতের মাজনে ফিরিওয়ালারা হেদিয়ে পড়ে নেমে গেছে। একটা বাচ্চা চা-ওয়ালা উঠে হাঁক মারছিল।
পুলিন বলল, চা খাবি?
ও বাবা, এ গরমে চা!
বিষে বিষক্ষয়।
আমার দরকার নেই। তুমি খাও।
পুলিন চা নিল। চুমুক মেরে বলল, আগে অটোরিকশা সব যেত। রাস্তাটা দু-বছর আগে এমন ভাঙল যে, আর কিছুই যায় না।
দেশের অবস্থা যে ক্ৰমে খারাপ হচ্ছে এটা জানে বদরী। তবে তাতে তার বিশেষ আসেও না, যায়ও না। সে উদয়াস্ত খেতে পড়ে থাকে। শরীরখানা পাত করে, তবে অন্ন জোটে বরাবর। এ ব্যবস্থার ভালোও নেই, মন্দও নেই। চলে যায়। খরা, বন্যা হলেই যা বিপদ।
পরের স্টেশনে দুড়দাড় লোক নামতে লাগল দেখে, বদরী একটু অবাক হল। পুলিন বলল, আজ হরিপুরের হাট। চৈত্র-সংক্রান্তির মেলাও বসেছে ক-দিন হল। হরিপুরের জন্যই ভিড়, নইলে এ ট্রেন ফাঁকা যায়।
বড্ডই ফাঁকা হয়ে গেল। গরমটাও যেন খানিক উড়ে গেল খোলা বাতাসে। পুলিন চায়ের ভাঁড়টা এতক্ষণ ফেলেনি, হাতে ধরেছিল। এবার সেটা জানলার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, তোর কপালটা ভালো, বুঝলি! বিয়েটা যদি লেগে যায়, দেখবি কপাল খুলে যাবে।
