দুর্ভিক্ষ? অমিত চমকে ওঠে। বড় হওয়ার পর সে আর দুর্ভিক্ষের কথা ভাবেনি। ধারণা ছিল, দুর্ভিক্ষ এখন আর হয় না। ভারতবর্ষে গম চাল না হলে আমেরিকায় হবে, থাইল্যান্ড, বার্মায়, অস্ট্রেলিয়ায় হবে। পৃথিবী থেকে মানুষ দুর্ভিক্ষ তাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন করে আবার বুক খামচে ধরছে একটা ভুলে যাওয়া ভয়।
পর মহূর্তেই ভয়টা ঝেড়ে ফেলে দিতে পারে সে। ওই তো মেট্রোর আলো জ্বলছে। দপদপিয়ে উঠছে নানা বিজ্ঞাপনের নিওন সাইন। কত দামি–দামি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে দামাল, উত্তেজিত, আনন্দিত কলকাতা! ভিখিরির তুলনায় ভ ভদ্রলোক বহু গুণ বেশি।
জায়গাটা পেরিয়ে যায় অমিত দুটি নয়া ছুঁড়ে দিয়ে। কুড়িয়ে নেবে তো! না কি মরে গেছে ওরা? আত্মহত্যা করেনি তো? না-না, তা করেনি ঠিক। ভিখিরিরা কতরকম অভিনয় করে তার কি শেষ আছে। এটাও একটা কায়দা!
একটু দোটানার মধ্যে থেকে ভারী মনে অমিত বাস স্টপে এসে দাঁড়ায়। বড্ড ভিড়। সে ঠিক এই সব ভিড়ে এখনও অভ্যস্ত নয়। দাঁড়িয়েই থাকে।
দুটো বাড়ন্ত যুবা কথা বলে বাসস্টপে। একজন বলে–কলকাতায় এই যে লোকে বাসে উঠতে পারে না, ঘণ্টার–পর–ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে অফিস টাইমে, কিংবা ঝুলে–ঝুলে যায়; ঠিক সময়ে কোথাও পৌঁছতে পারে না। এর জন্যই দেখিস একদিন বিপ্লব শুরু হয়ে যাবে। দুমদাম ভদ্রলোকেরা প্যান্ট গুটিয়ে কাছা মেরে ইট পাটকেল ছুঁড়তে লাগবে বেমক্কা, ভাঙচুর করে সব উলটেপালটে দেবে একদিন।
অন্যজন হাসে।
অমিত হাসে না। তার মনে একটা ভয়ের প্রলেপ পড়ে। চারিদিকে কী যেন একটা ধনুকের টান–টান ছিলার মতো ছিড়বার অপেক্ষায় আছে। যেন এক্ষুনি ছিড়বে এবং হুড়মুড় করে পৃথিবীটা ভেঙে পড়বে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ? নাকি পৃথিবী জোড়া খরা, দুর্ভিক্ষ? নাকি মহাপ্লাবন আবার? কিংবা ছুটে আসবে অন্য একটি গ্রহ পৃথিবীর দিকে যেরকম একটা গল্প সে পড়েছিল ইন্টারমিডিয়েটের ইংরেজি র্যাকপিডে।
রাতে শোওয়ার পর নিজস্ব মেয়ে মানুষটাকে হাঁটকায় অমিত, হাঁটকায় কিন্তু যা ভুলতে চায় ভুলতে পারে না। কিছুই ভুলতে পারে না। ইভা তার বুক থেকে অমিতের হাত সরিয়ে দিয়ে বলে, সারাদিন কত খাটুনি যায় বোঝ না তো, ঘুমোতে দাও।
পাশ ফিরে শোয় ইভা।
একটামাত্র মেয়েমানুষ থাকার ওই একটি দোষ। সে দিলে দিল, দিলে উপোস থাক! অমিত এর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় ভেবে পেল না। লাথি মারবে? মেরে দেখেছে অমিত, লাভ হয় না। লাভ নেই। খুব রাগ হয় অমিতের, কিন্তু রাগ চেপে শুয়ে থাকে। কিন্তু তখন বুকে একটা চাপ–বাঁধা কষ্ট হতে পারে। পৃথিবীর মাটি শুকিয়ে গেছে খরায়। বুড়িয়ে গেছে ফলনের পর ফলনে, এবার কালো এক দুর্ভিক্ষ এসে যাবে।
সে স্বপ্নে দেখতে পায়, কাৎ হয়ে শুয়ে থাকা মরা মেয়েমানুষের স্তন ঝুলে সেই মরা মাটি ছুঁয়ে আছে। আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকে সে। আকাশ থেকে পয়সা বৃষ্টি হচ্ছে। শুকনো পয়সা ঠন ঠন শব্দে ছড়িয়ে পড়ছে চারধারে। কেউ কুড়িয়ে নিচ্ছে না।
তাকে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগাল ইভা। বলল –ফিরে শোও। বোবায় ধরেছে।
অমিত ফিরে শুল। আর তখন হঠাৎ দুখানা হাতে তাকে কাছে টানল ইভা। চুমু খেল। বলল –এসো।
.
চালওয়ালার কপালে আজও ভ্রাম্যমাণ কোন পুরুত চন্দনের ফোঁটা দিয়ে গেছে, কানে বিল্বপত্র! মুখ তুলে হাসল চালওয়ালা।
অমিত ফিসফিস করে জিগ্যেস করে–দর কী হে?
–কমেছে। পুরো তিন। একটু নীচে দু-টাকা আশি। বলে চালওয়ালা পাল্লা হাতে নেয়–কত দেব?
কমেছে! কমেছে! ঠিক বিশ্বাস হয় না অমিতের।
–দশ কেজি। বলে অমিত।
চালওয়ালা মায়া মমতা ভরে চেয়ে হাসে। বলে–এখন কমতির দিকে।
ভারী ফুর্তি লাগে অমিতের। না, না, বাজে কথা ওসব। পৃথিবী জুড়ে দুর্ভিক্ষ আসছে এ কখনও হয়? চালের দাম কমে যাবে ঠিক।
অমিত হাঁটে। দু-হাতে বোঝা। কিন্তু ভারী লাগে না। আজ ইভা বেশি চাল দেখে খুশি হবে। খুব খুশি হবে।
চারদিকে কতরকম চিহ্ন ছড়ানো, দুর্ভিক্ষের আবার প্রাচুর্যেরও। মানুষ কখন কোনটা দেখে ভয় পায় কোনটা দেখে খুশি হয় তার তো কিছু ঠিক নেই।
» ঝড়
একটা মেয়ে হাসি-হাসি মুখ করে একটা বিস্কুট খাচ্ছে–এই হল বিজ্ঞাপন। তা বদরী অনেকক্ষণ খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনটা দেখল। খবরের কাগজ তার নয়, পাশে বসা পুলিনবিহারীর। পুলিন খুব খবরের কাগজ পড়ে। কেন পড়ে কে জানে! বদরী বিজ্ঞাপনটা দেখে ভাবল, তাকেও ওই বিস্কুট খেতে বলা হচ্ছে। বিজ্ঞাপন তো তাই বলে।
এই মেয়েটা যখন বিস্কুটটা খাচ্ছে, তখন তোমারও বাপু খাওয়া উচিত। কিন্তু কেন খাবে, বদরী এটাই বুঝতে পারে না। কোলে রাখা গামছাটা তুলে সে কপালের ঘাম মুছল। গরমটাও পড়েছে বাপ। একবারে কাঁঠাল পাকানো গরম। যেমন ভ্যাপসা, তেমনি চনচনে। রোদ্দুরের মুখে আবডাল দেওয়ার মতো ছেঁড়া কাঁথাকানির মতো একটু মেঘও নেই। আকাশ একেবারে নিকোনো উঠোন। মাটিতে কোদাল মারলে এখন ঠন করে শব্দ হয়।
বিস্কুট খাওয়ার বিজ্ঞাপনটা চাপা পড়েছে। পুলিনবিহারী পাতা ওলটাল। এবার একটা টিভির বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে। সেখানেও একটা মেয়েছেলে, টিভির ওপর হাতের ভর দিয়ে হেলে দাঁড়ানো, হাসি-হাসি মুখ। মেয়েছেলে ছাড়া দুনিয়ায় যেন কিছু হওয়ার জো নেই! বদরী একটা শ্বাস ফেলল।
