ভালোর তো লক্ষণ দেখছি না। যাত্রাটাই খারাপ হল। ট্রেন যা লেট মারছে স্টেশন থেকেই না ফিরতে হয়। কথাটা গ্রাহ্য করল না পুলিন। বলল, স্বয়ং কাত্যায়নীর সংসার, বুঝলি তো? এক ছটাক বাড়িয়ে বলা নয়। এ-তল্লাটের সবাই জানে। অজাপুর থেকে বউ এল, তেরো বছর সবে বয়স। একেবারে লক্ষ্মীপ্রতিমা। গাঁয়ে ঢুকতেই দু-বছরের খরা কেটে বৃষ্টি নামল। গাছে গাছে ফলন। বউ যেখান দিয়ে যায় যেন লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ পড়ে। ভাসুরকে ভাত দিতে গিয়ে বিপত্তি, ঘোমটা পড়ে গেল। দু-হাত জোড়া। কী করে? সবাই দেখতে পেল, বউ আর এক জোড়া হাত বের করে ঘোমটাটা তুলে দিল মাথায়।
ও গপ্পো আগে শুনেছি।
বলেছি নাকি তোকে?
তুমি বলোনি। অন্য এক বউ সম্পর্কে এরকম আর একজন কেউ বলেছিল।
ও যে এই বউয়ের-ই গল্প। পাঁচমুখে ছড়িয়েছে। এ তল্লাটে সবাই জানে।
তা নয় হল, কিন্তু সে তো পুরোনো কাসুন্দি। তোমার খুড়োর মেয়ে তো আর সে নয়।
ওরে ওনারা যে-পরিবারে আসেন, সেই পরিবারটাই জাতে উঠে যায় কিনা। ওর একটা ধারা থাকে।
কতকাল আগেকার কথা সব। ওর ধারা আর নেই গো পুলিনদা।
তা এক-দেড়শো বছর হবে। এমন কিছু বেশিদিনের কথা নয়। ধরো আমার বাবার বয়েস।
ধরলাম। কিন্তু তাতেও সুবিধে হচ্ছে না। যদি সেই ধারাই হবে, তাহলে আমাকে পাত্তর ঠাওরাচ্ছ কেন?
পুলিন গোঁফের ফাঁকে একটু হাসল, কেন তুই কি খারাপ পাত্তর? পনেরো বিঘে জমি, দু-বিঘে মাছের পুকুর, বাড়িতে অতগুলো ফলন্ত গাছের বাগান।
পাত্তরের আর কিছু লাগে-না বুঝি?
আর কী লাগে?
কেন, চরিত্তির, পেটে বিদ্যে, বংশগৌরব।
তোর কী চরিত্তির খারাপ? বিদ্যেও ধরা, বাংলাটা জানিস, ইংরিজিতে নাম-সই কম নাকি? হারাধন বিশ্বাসের নাতি–বংশই কি ফেলনা?
স্টেশনগুলো পটাপট পেরিয়ে এল তারা।
পুলিন একটু হুটোপাটা করে উঠল, ওরে নাম নাম। সামনের স্টেশনটাই। গাড়ি বিইয়ে এল।
নেমে পড়ল তারা। পুলিন ঘড়ি দেখে একগাল হেসে বলল, দেরি করেনি রে। চারটে বেজে পাঁচ মিনিট। হেসেখেলে সাড়ে-নটার গাড়ি পাব।
তোমার তিন মাইল যদি চার বা পাঁচে দাঁড়ায় তাহলে অন্য কথা।
ওরে না না। অত নয়।
উদোম মাঠের ভেতর দিয়ে পথ। পাকা না হলেও রাস্তাটা পাথরকুচির ছিল বটে। তবে বহুকাল সারানো হয়নি। ভেঙে-টেঙে একশা।
পুলিন বলল, এইবার রাস্তাটা স্যাংশন হয়েছে। সারানো হবে। সামনের বছর যখন জামাইষষ্ঠীতে আসবি, তখন পাকা রাস্তা দিয়ে অটোয় চেপে হাসতে হাসতে গোঁফে তা দিতে দিতে আসবি। বুঝলি?
গাছে এখন কাঁঠালের ফুলটিও আসেনি গো, গোঁফে তা দিয়ে হবে কী? দ্বিতীয়বার ছাদনাতলায় বসার ইচ্ছে নেই গো মোটে। তুমি ধরে নিয়ে এলে বলে আসা। নদুকে আমি সৎমায়ের হাতে দেব ভেবেছ নাকি?
আচ্ছা আচ্ছা, আগে দেখ তো। কাকা বলে ভাবিসনি যে বুড়ো। বাবার পিসির ছেলে। বয়েস আমার চেয়েও পাঁচ বছর কম। তারই দ্বিতীয়পক্ষের কনিষ্ঠা। পনেরো-ষোলোর বেশি হবে না।
সবই জানে বদরী। পুলিন একবার নয়, বহুবার বলেছে। বলে বলে কান ঝালাপালা করে দিয়েছে। তাই বাঁচার জন্য আসা। একবার দেখে নাকচ করে দিলেই হবে। বিয়ে করতে বড়ো বয়েই গেছে বদরীর। মেয়েটার জন্য গাঁয়ের শোভাখুড়ির সঙ্গে বন্দোবস্ত হয়ে আছে। বদরী যখন মাঠে যায়, খুড়ি এসে দেখে। বছর পাঁচেক বয়স হলে তখন আর খবরদারির তেমন দরকারও হবে না। পাঁচটা গাঁয়ের মেয়ের সঙ্গে খেলবে-ধুলবে, বড়ো হয়ে যাবে। বদরীর তখন ঝাড়া হাত-পা। বিয়ে আর নয়। ত্রিশ-বত্রিশ বয়স হল তার। আর দরকার কী বিয়ের?
পুলিনবিহারী আগডুম বাগড়ম, বলতে বলতে পথ হাঁটছে আগে আগে। পেছনে বদরী।
ঘরটাও পাওয়া গেছে পালটি। একেবারে যেন তোর জন্য পাঠিয়েছেন ভগবান।
বদরী জবাব দিচ্ছে না। হাঁ করলেই গলা বুক শুকিয়ে যাচ্ছে, এমন গরম।
প্রথম গাঁ গোবিন্দপুর, দ্বিতীয় সোনাডাঙা, তিন নম্বর মৌলবির বাজার। আন্দাজ আছে বদরীর। তিন মাইলই হবে।
মৌলবির বাজার যেন মরুভূমির মধ্যে একখানা দ্বীপ বড় গাছপালা চারদিকে। ধূলিধূসর ভাবটা নেই।
কেন জানিস তো? সাতাশখানা পুকুর আছে, একখানা দিঘি। তার ওপর ইরিগেশনের খাল। এ-গাঁ একেবারে লক্ষ্মীমন্ত। হবে-না? স্বয়ং কাত্যায়নী লীলা করে গেছেন।
বদরীর একটু ভয় ভয় করছে। কেন কে জানে!
ঘাবড়াচ্ছিস নাকি?
না, ঘাবড়াব কেন?
মৌলবির বাজার যে লক্ষ্মীমন্ত গাঁ এটা মনে মনে স্বীকার করতে হল বদরীনাথকে। গাছপালা আছে। পাড়ায় পাড়ায় পুকুর। গাঁও বিশাল। মেলা লোকের বাস। রোজ বাজার বসে। হপ্তায় দু-দিন হাট।
পুলিনবিহারী দূর থেকে দেখাল, ওই যে শিবমন্দির দেখছিস, ওর পিছনেই বাড়ি।
বাড়িখানা পুরোনো হলেও ভালোই। পাকা দেয়াল, মেঝে, ওপরে টিনের চাল। মস্ত উঠোন, তিনটে ধানের গোলা, সবজি বাগান, নারকেল আর সুপুরির গাছ আছে।
পুলিনবিহারী হাঁক মারল, কই রে, কোথায় গেলি সব?
হাঁক-ডাকের দরকার ছিল না। দাওয়াতেই একধারে দুজন লোক বসে গ্যাঁজালি করছিল। রোগা কালোপানা একজন লোক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ও বাবা, ভাইপো যে!
এই কাকা, বুঝলি? এর-ই মেয়ে।
কাকার কপালে রসকলি, গলায় কন্ঠি, গায়ে গেঞ্জি, পরনে ধুতি। মুখখানায় ধূর্তামি আছে। বদরী ভালো করে দেখে নিল।
পুলিন বারান্দায় উঠে বলল, হাতে মোটেই সময় নেই। রাত সাড়ে নটায় ফিরতি ট্রেন। বুঝেছ তো?
