.
আস্তে-আস্তে চোখ খোলে জীবন। অপর্ণা গাড়ির ছোট্ট ফাঁকটুকু দিয়ে মেঝের ওপর পড়ে গেছে। ছোট্ট ছাইরঙা একটা পুঁটলির মতো দেখাচ্ছে তাকে। জীবন আপন মনে হাসে, দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায়। এখনও সকালের মতো নরম রোদ, ধান কেটে নিয়ে যাওয়া খেত। জীবন হাত-পা ছড়িয়ে একটু দাঁড়ায়, তারপর এসে দরজা খুলে অপর্ণাকে বের করে, মাঠের ওপর শুইয়ে দেয়। আস্তে আস্তে ঝাঁকুনি দেয় তাকে ‘অপর্ণা, এই অপর্ণা…’ গালে থুতনিতে তীব্র জ্বালা টের পায় সে। গলায় ডেলা পাকানো ব্যথা। মাথা এখনও অল্প ধোঁয়াটে। অপর্ণা চোখ খোলে, অনেকক্ষণ জীবনের দিকে অর্থহীন চেয়ে থাকে। জীবন হাসে ‘ওঠো। উঠে বোসো। আমরা বেঁচে আছি।’
অপর্ণার চোখ জীবনের মুখ থেকে সরে আকাশের ওপর কয়েক মুহূর্তের জন্য উড়ে যায়। তারপর আঁচল সামলে সে উঠে বসে। তার মুখের কঠিন, একটু নিষ্ঠুর অথচ সুন্দর পাথরের মতো প্রোফাইল ঘাসের সবুজ পশ্চাৎভূমিতে জেগে ওঠে। জীবনের মন গুন গুন করে ওঠে ‘ঝরনা, তোমার স্ফটিক জলের স্বচ্ছ ধারা…’ অপর্ণা দাঁড়িয়ে বলে ‘এবার, তাহলে?’ জীবনের দিকে চায় ‘তোমার মুখের ডানদিক কী ভীষণ ফুলে লাল হয়ে আছে, কেটে গেছে অনেকটা!’ জীবন হাতে অবহেলার ভাব ফুটিয়ে বলে ‘ও কিছু না।’ রাস্তা থেকে জমি পর্যন্ত এমন কিছু ঢালু নয়। জীবন ভেবে দেখে সে একাই গাড়িটা ঠেলে তুলতে পারবে। কয়েকজন পথ চলতি লোক দাঁড়িয়ে গেছে, মাঠের ওপর দিয়ে দূর থেকে দৌড়ে আসছে কয়েকটা কালো কালো ছেলেমেয়ে। জীবন অপর্ণাকে বলে ‘তুমি একা পারবে কেন?’ ‘পারব।’ অপর্ণা মাথা নাড়ে ‘তা হয় না।’ পরমুহূর্তেই একটু অদ্ভুত নিষ্ঠুর হাসি হাসে সে ‘এক সঙ্গেই মরতে যাচ্ছিলুম দুজনে। তা ছাড়া আমি তো তোমার সহধর্মিনীও, অনেক কিছুই ভাগ করে নেওয়ার কথা আমাদের।’ বলতে-বলতে সে কোমরে আঁচল জড়ায়, গাড়িতে ‘হেইয়ো’ বলে ঠেলা দেয়, রাস্তার লোকেরাও কয়েকজন নেমে আসে। ‘কোথায় যাবে এটাকে নিয়ে!’ জীবন চিন্তিত মুখে বলে কিছু দূরেই বোধহয় একটা পেট্রল পাম্প আছে।’ যারা ঠেলছিল তাদের একজন সায় দেয়, ‘হাঁ, আছে।’
.
বুড়ো মেকানিক খোলা বনেটের ভিতর থেকে মুখ তুলে জীবনের দিকে তাকায় ‘কই! কিছু পাচ্ছি না তো! কোনও গোলমাল নেই ইঞ্জিনে।’ জীবন চিন্তিত মুখে তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে ‘আমি জানি যে কোনও গোলমাল নেই।’ মেকানিক ঝাড়নে হাত মোছে ‘চালিয়ে দেখব?’ জীবন মাথা নাড়ল না।’ বলল ‘বোধহয় হর্নটায় একটু…’, মেকানিক বলল , ‘কানেকশনের গোলমাল? আচ্ছা দেখছি’ কয়েক মিনিটেই কাজ সারা হয়ে গেল। অপর্ণা পেট্রল পাম্পের অফিস ঘরে বসে ছিল। জীবন ডাকতেই উঠে এসে গাড়ির কাছে একটু থমকে দাঁড়াল। জীবন তাকিয়ে ছিল। একটুও দ্বিধা না করে অপর্ণা গাড়িতে উঠে বসল। জীবন গাড়ি স্টার্ট দেয়।
সারা রাস্তায় আর কথা হয় না দুজনে।
.
সন্ধেবেলায় জীবন বসবার ঘরে সোফায় জানালার দিকে মুখ রেখে এলিয়ে পড়ে ছিল। মধু আর মিঠু আতরের সঙ্গে বেড়াতে গেছে পার্কে। জীবন মনে মনে ওদের জন্যেই অপেক্ষা। করছিল। অপর্ণা এসে সামনেই দাঁড়াল। জীবন একবার চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
অপর্ণা জানালার থাকের ওপর বসে বলে ‘তোমার সঙ্গে একটা কথা ছিল।’
জীবন দু’আঙুলে কপাল টিপে রেখে বলে ‘বলো।’
অপর্ণার মুখ খুবই গম্ভীর ‘যখন পেট্রল পাম্পে বসে ছিলুম, তখন ওখানকার লোকটার সঙ্গে কথা হল আমার। আমি গাড়ির কিছুই বুঝি না, কিন্তু লোকটাকে যখন আমাদের গাড়ির গোলমালের কথা বললুম, তখন সে খুব অবাক হয়ে বলল অত গোলমাল এক সঙ্গে একটা গাড়ির হতে পারে না। গাড়ি থামাবার অনেক উপায় নাকি ছিল।’
জীবন হাসে ‘ঠিক। সে কথা ঠিক।’
‘তবে গাড়ি থামেনি কেন?’
জীবন মাথা নাড়ে গাড়ি থামেনি গাড়ি থামানো হয়নি বলে।’
‘কেন? তুমি কি ঠিক করেছিলে আমাকে নিয়ে সহমরণে যাবে! না কি এ তোমার খেলা? “
জীবন অস্থির চোখে অপর্ণাকে দেখে, ‘খেলা! পরমুহূর্ততেই মুখ নীচু করে মাথা নাড়ে আবার ‘কি জানি কেন আমি গাড়ি থামাতে পারিনি। থামানো সম্ভব ছিল না-এইমাত্র।’
‘কেন?’
‘কেন!’ জীবন শূন্য চোখে চারপাশে চায়, ভেবে দেখার চেষ্টা করে, তারপর অসহায়ভাবে বলে, ‘কেন, তা তুমি বুঝবে না।’
ভ্রূ কোঁচকায় অপর্ণা, ‘বুঝব না কেন? বোঝাও! আমি বুঝবার জন্য তৈরি।’
জীবন অপর্ণার চোখ এড়িয়ে যায়, কী একটা কথা যেন বলবার ছিল কিন্তু তা খুঁজে পাচ্ছে না। সে, তবু সে ম্লান হেসে হালকা গলায় বলে ‘তুমি কোনওদিন আমাকে সুন্দর দেখোনি, তাই না! কিন্তু আজ যখন ওই ভিড়ের রাস্তায় প্রতি মুহূর্তে অ্যাকসিডেন্টের ওই ভয়ের মধ্যেও আমি ঠিক পঁচিশ মাইল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলুম–আমার মনে হয়–তখন আমাকে সুন্দর দেখাচ্ছিল। তুমি দ্যাখোনি।’
জীবন মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখে অপর্ণার মুখ রাগে ঝলমল করে উঠল ‘সুন্দর! কীসের সুন্দর! তুমি জানতে না তোমার সংসার আছে? দুটো বাচ্চা শিশু মেয়ে তোমার? তোমার নিজের হাতে তৈরি কারখানা যা অনেক কষ্টে তৈরি করতে হয়েছে? কতগুলো মানুষ তোমার ওপর নির্ভর করে আছে, সে কথা তুমি কী করে ভুলে যাও?’
জীবন বুঝতে পারে সে অপর্ণার সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে, বস্তুত তার কোনও যুক্তিই নেই, তবু হাসি ঠাট্টার সুর বজায় রাখবার চেষ্টায় সে বলে ‘বোধ হয় তোমার কাছে একটু বাহবাও পেয়ে চেয়েছিলুম। তুমি তা দাওনি। কিন্তু মনে রেখো রাস্তার ওই ভিড়, পর পর অত বিপদের মধ্যেও আমি ঠিক পঁচিশ মাইল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে গেছি, একবারও থামিনি। মনে রেখো, একবারও থামিনি।’
