মুহূর্তের জন্য স্টিয়ারিঙের ওপর হাত ঢিলে হয়ে যায় জীবনের। গাড়ি টাল খায়। দুর্বল সময়টুকু আবার সামলে নেয় জীবন, বলে ‘কেঁদো না, কাঁদলে আমার মাথা ঠিক থাকবে না। একটু ভুল হয়েছে তোমার, এই রাস্তার মোড় নিতে বললে, কিন্তু রাস্তায় বড় ভিড়।’ গাড়ি খুব জোরে চলছে না, জীবন চারদিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছিল। অপর্ণা চোখের জল মুছে শক্ত থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করে বলে ‘যেমন করে হোক বাসার দিকে গাড়ি ঘোরাও।’ জীবন স্থির গলায় বলে তাতে লাভ কী! বাসার সামনে গেলেই কি গাড়ি থামবে!’ অপর্ণা জোরে মাথা নাড়ে, ‘না থামুক। মধু আর মিঠু হয়তো এখনও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে।’ জীবনের ঘাড় টন টন করছিল ব্যথায়, সহজ ভঙ্গিতে না বসে সে অনেকক্ষণ তীব্র উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসে আছে। বাঁ-দিকে পর পর কয়েকটা সরু নোংরা গলি, মোড় ফেরা গেল না। সামনেই চৌরাস্তা, দূর থেকেই দেখল জীবন ট্র্যাফিক পুলিশ অবহেলার ভঙ্গিতে হাত তুলে তার সোজা রাস্তা আটকে দিল। অপর্ণা হঠাৎ জোরালো গলায় বলল ‘ডান দিকে মোড় নাও, ওদিকে ফাঁকা। রাস্তা, তারপর রেইনি পার্ক…’ কিন্তু জীবন মোড় নিতে পারল না, গাড়িটা অল্পের জন্য এগিয়ে গিয়েছিল, তারপর সহজ নিশ্চিন্তভাবে ট্যাফিক পুলিশটাকে লক্ষ্য করেই ছুটছিল। লোহার হাতে স্টিয়ারিং সোজা রাখে জীবন, পুলিশটার হাতের তলা দিয়ে তার গাড়ি ছোটে। বাঁকের মুখে নীল রঙের একটা ফিয়াট তার গাড়ির বাফারের ধাক্কায় নড়ে উঠে থেমে কাঁপতে থাকে। ফিরেও তাকায় না জীবন, দুটো লরি পর পর কাটিয়ে নেয়। পিছনের পুলিশটা চেঁচিয়ে গাল দিচ্ছে। সামনেই হাজরার মোড়, লাল বাতি জ্বলছে, অনেক গাড়ি পর পর দাঁড়িয়ে। কিছুই ভাবতে হয় না। জীবনকে, সে থেমে থাকা গাড়িগুলোকে বাঁয়ে রেখে অবহেলায় এগিয়ে যায়, আবার একটা ডবল ডেকার, পিছনে লম্বা ট্রাম আড়াআড়ি রাস্তা জুড়ে যাচ্ছে, জীবন শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলে ‘আজ কেবলই লাল বাতি, রোজ এমন হয় না তো!’ অপর্ণা বাঁ-হাত বাইরে বের করে মোড় নেওয়ার ইঙ্গিত দেখায় ডবলডেকারটার মুখ কোনওক্রমে এড়িয়ে জীবন গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারল। রাস্তা ফাঁকা নয়, কিন্তু অনেকটা সহজ। বাঁয়ে মনোহরপুকুরের মুখ, একটু দ্বিধাগ্রস্ত হাতে গাড়ি ঘোরাবে কিনা ভাবতে-ভাবতে জীবন সোজাই চলতে থাকে। কালীঘাটের স্টপে গোটা চার পাঁচ স্টেট বাস একসঙ্গে থেমে আছে। দূর থেকেই জীবন দেখে প্রথম বাসটা ধীর–স্থির ভাবে স্টপ ছেড়ে যাচ্ছে, সে পৌঁছবার আগে আর বাসগুলো যে ছাড়বে না তা নিশ্চিত। ওখানে বাস স্টপের পাশেই একটা পাবলিক ইউরিনাল। আগে থেকেই জীবন তাই ট্রামের ট্র্যাকে তুলে দিল তার গাড়ি। অপর্ণা কী বলতে গিয়ে থেমে যায়। কিছু লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের গাড়িটাকে এবার অনেকের নজরে পড়ছে। জীবন কালীঘাট পেরিয়ে ট্রামের ট্রাকে ঘাসমাটির জমির ওপর দিয়েই চলতে থাকে। লোকজন দূর থেকে চেঁচিয়ে কী বলছে। জীবন একটু ঘোলাটে চোখে অপর্ণার দিকে চায়; ‘অপর্ণা…’ অপর্ণা অর্থহীন চোখে তার মুখের দিকে তাকায়। জীবন বলে ‘আমার কেমন ঘুম পাচ্ছে।’ অপর্ণা বুঝতে না পেরে বলে ‘কী বলছ?’ জীবন মাথা নাড়ে, ‘চোখের সামনে আঁশ–আঁশ জড়ানো একটা ভাব। অনেকক্ষণ সিগারেট না খেলে আমার একরকম হয়। আমি অনেকক্ষণ সিগারেট খাইনি।’ অপর্ণার চোখে জল টলমল করছে, রুমালের ঘষায় চোখের আশেপাশের জায়গা লাল, বড় সুন্দর দেখায় তাকে। কপালের সিঁদুর অল্প মুছে গেছে। সে তৎপর গলায় বলে ‘কোথায় তোমার সিগারেট? জীবন তার দিকে চেয়ে বলে ‘পকেটে।’ অপর্ণা বলে ‘বের করে দাও।’ এবার সামনের মোড়ে সবুজ বাতি জ্বলছে, বালিগঞ্জের ট্রাম দাঁড়িয়ে আছে বাঁকা হয়ে, ট্রাম ট্র্যাকের পাশে-পাশে কয়েকটা গাছ, স্টপে লোকের ভিড়। তাদের গাড়িটা কাছে আসতেই লোকে চেঁচাচ্ছে ‘এই কী হচ্ছে…!’ জীবন ক্রমান্বয়ে হর্ন দিয়ে ট্রামের ট্র্যাক থেকে রাস্তায় নামে। সামনেই একটা নয় নম্বর। এটা ট্রলি বাস–প্রকাণ্ড বড়, আস্তে-আস্তে রাস্তা জুড়ে চলে। জীবন হর্ন দেয়, বাসটাকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা বৃথা–জায়গা নেই। ট্রাম ট্রাকের দিকে আবার মুখ ঘোরাতে গিয়ে জীবন দেখে তিন-চারজন লোক রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে। আছে, ভীষণ ঝাঁকুনি দিয়ে বাঁয়ে স্টিয়ারিং চেপে ধরে জীবন। কংক্রিটে প্রবল ধাক্কা দিয়ে গাড়িটা সোজা ফুটপাতে উঠে যায়। এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের গাড়িবারান্দার তলা থেকে একেবারে শেষ মুহূর্তে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে কয়েকজন তোক সরে যায় জীবনের গাড়ির মুখ থেকে। জীবন গালাগাল শুনতে পায় ‘এই শুয়োরের বাচ্চা, হারামি…’ ছোট আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখে কয়েকজন তার গাড়ির পিছু নিয়ে দৌড়োতে–দৌড়োতে পিছিয়ে পড়তে থাকে। তারা দূর থেকে হাত নেড়ে শাসায়। মুক্ত অঙ্গনের সামনে জীবন ফুটপাথ ছেড়ে আবার রাস্তার নামে। একটা ঢিল এসে পিছনের কাঁচে চিড় ধরিয়ে দিল। এতক্ষণ উত্তেজনায় অপর্ণাকে দেখেনি জীবন, এখন দেখে অপর্ণা গাড়ির দরজায় ঢলে চোখ বুজে আছে। কপালে একটু জায়গা কাটা, একটা রক্তের ধারা খুঁতনি পর্যন্ত নেমে এসেছে। জীবন চেঁচিয়ে ডাকে ‘অপর্ণা।’ আস্তে চোখ খোলে অপর্ণা, কেমন বোধ ও যন্ত্রণাহীন দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ জীবনের মুখের দিকে তাকায়, হঠাৎ তীব্র আক্রোশে বলে ‘তুমি ছোটোলোক। তুমি বরাবর ঘোটলোক, ভিখিরি ছিলে। তুমি কখনও আমার উপযুক্ত ছিলে না।’ ঠিক। সে কথা ঠিক। জীবন জানে। ফাঁকা সুন্দর রাস্তার দিকে চেয়ে সে বলে ‘আমার ঘুম পাচ্ছে অপর্ণা। আমি রাস্তা ভালো দেখছি না।’ অপর্ণা তেমনই আক্রোশের গলায় বলে ‘ভেবো না, তুমি মরলেও আমার কিছু যায় আসে না। আমি দরজা খুলে এক্ষুনি লাফিয়ে পড়ব।’ বলতে-বলতেই দরজার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দেয় অপর্ণা, আধখোলা দরজার দিকে ঝুঁকে পড়ে, দ্রুত হাত বাড়িয়ে অপর্ণার কনুইয়ের ওপর বাহুর নরম অংশ চেপে ধরে তাকে টেনে আনে জীবন। বলে ‘কপালটা কী করে কাটল! দরজায় ঠুকে গিয়েছিল, না! রুমালে ওটা মুছে ফেল, বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে।’ বলতে-বলতে লেকের দিকে গাড়ির মুখ ফেরায় জীবন, বলে ‘গাড়ির স্পিড পঁচিশের মতো। এখন লাফিয়ে পড়লেও তুমি বাঁচবে না। যা নরম শরীর তোমার! কোনওকালে তো শক্ত কোনও কাজ করোনি। বলতে বলতে হাসে জীবন। অপর্ণা রুমালে মুখ চেপে ফোঁপায়, ‘কেমন অসম্ভব…অসম্ভব লাগছে…এমন সুন্দর সকালটা ছিল…মিঠু মধু আর এখন! দুজনেই হয়তো মরে যাব।’ জীবন প্যান্টের বাঁ-পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বের করে গাড়ির সিট-এর ওপরে রাখে, বলে ‘একটা সিগারেট আমার মুখে লাগিয়ে দাও তো। আর ধরিয়ে দাও।’ অপর্ণা কাঁপা হাতে জীবনের ঠোঁটে সিগারেট লাগায়। লেকের হাওয়া দিচ্ছে, অপর্ণা অনভ্যাসের হাতে দেশলাই ধরাতে গিয়ে পর পর কাঠি নষ্ট করে। জীবন মাথা নাড়ে ‘হবে না, ওভাবে হবে না।’ বলতে-বলতে ঠোঁটের সিগারেট নিয়ে অপর্ণার দিকে বাড়িয়ে দেয় ‘তুমি নিজে ধরিয়ে দাও। গাড়ির মধ্যে নীচু হয়ে বসে ধরাও।’ অপর্ণা প্রায় আর্তনাদ করে বলে ‘তার মানে? আমাকে মুখে দিতে হবে?’ জীবন একবার তার দিকে চেয়েই চোখ ফিরিয়ে নেয় ‘তাড়াতাড়ি করো। আমার বিশ্রী ঘুম পাচ্ছে।’ অপর্ণা একটু দ্বিধা করে, তারপর গাড়ির মধ্যে ঝুঁকে পড়ে মুখে লাগিয়ে সিগারেটটা ধরানোর চেষ্টা করে। ধরায়, তারপর সিগারেট জীবনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আবার বলে ‘ছোটলোক, তুমি ছোটলোক ছিলে। কোনও দিন তুমি সুন্দর কোনও কিছু ভালোবাসোনি। ভেবো না আমি টের পাইনি। কাল রাতে যখন তুমি প্যাসেজ দিয়ে আসছিলে তখন আমি ফ্রিজ-এর দরজা খোলার আর বন্ধ করার শব্দ পেয়েছিলুম।’ স্টিয়ারিং হুইলের ওপর জীবনের হাতের পেশি ফুলে ওঠে তার মানে?’ অপর্ণা হিসহিসে গলায় বলে ‘ওই বেড়ালটা, ওই সুন্দর কাবলি বেড়ালটা…তুমি কোনওদিন ওটাকে সহ্য করতে পারোনি।’ লেক-এর চারধারে ফাঁকা রাস্তায় জীবন গাড়ি ঘুরপাক খাওয়াতে থাকে। হাওয়া দিচ্ছে, প্রবল হাওয়ায় তার কপালের ঘাম শুকিয়ে যেতে থাকে, আর তার আবছা মনে পড়ে…হ্যাঁ মনে পড়ে…সে ফ্রিজ-এর দরজা খুলেছিল কাল রাতে। অপর্ণা ঠিক বলছে। অপর্ণাই ঠিক বলছে। তার গাড়ি টাল খায়, ঘুড়ি ওড়াতে–ওড়াতে একটা ছেলে রাস্তার ওপর এসে দাঁড়িয়েছে, আকাশের দিকে চোখ। জীবন তার দিকে সোজা এগিয়ে যেতে থাকে, অপর্ণা চিৎকার করে ওঠে ‘এই এই–ই…’ ছেলেটা চমকে উঠে তাকায়, তারপর দৌড়ে রাস্তা পার হয়। ঘুড়ির সুতো গাড়ির উইন্ডক্রিনে লেগে দু’ভাগ হয়ে যায়। ভোকাট্টা। জীবন হাসে। অপর্ণা হাঁপাতে-হাঁপাতে বলে ‘আমাদের পিছনে একটা পুলিশের গাড়ি…’ জীবন আয়নায় তাকিয়ে একটা কালো গাড়ি দেখতে পায়। সঙ্গে-সঙ্গে ডানদিকের প্রথম রাস্তা দিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নেয় সে, অল্পক্ষণ পরেই তার গাড়ি লেক পার হয়ে ঢাকুরিয়া ওভারব্রিজ-এর ওপর উঠে আসে। ব্রিজ-এর নীচে একটা পুলিশ দু হাত দুদিকে ছড়িয়ে তার গাড়িতে থামবার ইঙ্গিত করে। গ্রাহ্য না করে জীবন বেরিয়ে যেতে থাকে। অপর্ণা পিছু ফিরে দেখে বলে ‘তোমার নম্বর টুকে নিল।’ বলতে-বলতেই আবার কেঁদে ফেলে অপর্ণা, ‘তোমার ফাঁসি হওয়া উচিত। তোমার অনেক বছর জেল হওয়া উচিত।’ জীবন কথা বলে না। সামনেই যাদবপুরের ঘিঞ্জি বাস ট্রার্মিনাস, বাজার দোকানপাট। একটা লরি দাঁড়িয়ে আছে, পিছনের চাকার কাছে একটা লোক বসে ঠিকঠাক করে কী যেন ঠিক করছে, একটা সাইকেল রিকশা মুখ ফেরাল। জীবন সোজা রাখে তার গাড়ি, রিকশার সামনের চাকা আর লরির পিছনের চাকায় সেই লোকটার মাঝখান দিয়ে যাওয়ার সময় সে স্পষ্ট টের পায় কিছু একটায় তার গাড়ির ধাক্কা লাগল, একটা চিৎকার শোনা যায়। সে মুখ না ফিরিয়ে জিগ্যেস করল, ‘দেখো তো লোকটা মরে গেছে কি না!’ কিন্তু অপর্ণা কী বলল শুনতে পেল না জীবন। তার কান মাথা চোখ জুড়ে দপ দপ করে চমকে উঠল একটা রগ। সে জিগ্যেস করল ‘কী বলছ?’ অপর্ণা অস্ফুট উত্তর দিল। শোনা গেল না। সামনে লোক, অজস্র লোক, সরু রাস্তা, রিকশা লাইন, নীচু দোকান ঘর–এইসব হিজিবিজি ছবির মতো তার চোখে দুলে–দুলে উঠছিল।… একটা বেড়াল…কাল রাতে একটা বেড়াল ফ্রিজ-এর মধ্যে সমস্ত রাত…না মনে পড়ে না, মনে পড়ে না…জীবন দেখল ব্যালকনিতে মধু আর মিঠু দাঁড়িয়ে, মিঠু আর বাবার মতো, মধু তার মায়ের মতো–তারা হাত নাড়ছে, টা–টা, দুর্গা দুর্গা বাবা। অপর্ণা কিছু বলছে? ‘কী বলছ তুমি?’ সে জিগ্যেস করে, অপর্ণা –কুঁচকে তার দিকে তাকায়, হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে স্টিয়ারিং সোজা রাখাবার চেষ্টা করে। জীবন ঝাঁকুনি খেয়ে আবার ধোঁয়াটে ভাবটুকু কাটিয়ে নেয়। অপর্ণা কাঁদে কী হচ্ছে…এবার তুমি মাথা খারাপ করছ। চারজনকে ধাক্কা দিলে পর পর। ওরা ঢিল ছুড়ছে, গালাগাল দিচ্ছে।’ বাস্তবিক ঢিল এসে পড়ছিল, পিছনে লোক দৌড়ে আসছে, সামনের দিকে একটা লোক বাঁশ তুলে চিৎকার করছে ‘মাইরা ফালামু…।’ জীবন ক্লান্ত গলায় বলল , ‘এত লোক কেন বলো তো! কেন এত অসংখ্য লোক! ইচ্ছে করে খুন করে ফেলি।’ জীবন বাঁশ হাতে লোকটাকে পুরোপুরি এড়াতে পারল না, গাড়ির জানালা দিয়ে লোকটা বাঁশ ঢুকিয়ে দিয়ে সরে গেল। বাঁশের নোংরা ধারালো মুখটা তার গাল আর খুঁতনি কেটে, গলায় ধাক্কা দিয়ে প্রচণ্ড শব্দ করে আবার বাইরে বেরিয়ে গেল। জীবন সিটের ওপর পড়ে গিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে আবার উঠে বসে। মাথা নীচু রাখবার চেষ্টা করে। তার চোখের সামনে। হিজিবিজি, হিজিবিজি দোকানপাট, টেলিগ্রাফের পোস্ট, সিনেমার বিজ্ঞাপন আর অজস্র মানুষের মুখ একটা ধোঁয়াটে আচ্ছন্নতার ভিতরে সরে যেতে থাকে। তার মাথা টলতে থাকে, ঘুড়ির মতো লাট খায়, সে সব ভুলে একবার সিগারেটের জন্য স্টিয়ারিং ছেড়ে হাত বাড়ায়, আবার স্টিয়ারিং চেপে ধরে। অপর্ণা কেবলই কী যেন বলছে, সে বুঝতে পারছে না। এখনও তার ট্যাঙ্ক ভর্তি পেট্রল। সে কলকল শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ক্রমে বাঘাযতীন, বৈষ্ণবঘাটা পেরিয়ে যায় জীবন। গাড়িয়ার পর হু-হু করে রাস্তা। কিন্তু জীবনের কাছে ক্ৰমে সবকিছুই আবছা হয়ে আসছিল। হঠাৎ জীবন যেন শেষ চেষ্টায় ব্রেকে পা দেয়, তারপর স্টিয়ারিং ছেড়ে দু হাত শূন্যে তুলে বলে ‘অপর্ণা, আমি আর পারছি না, পারছি না…’, গাড়ি বেঁকে গেল, রাস্তার ঢাল বেয়ে নেমে এল মাঠের ওপর। উঁচু–নীচু খোয়াইয়ের মতো জমির ওপর দিয়ে কয়েক গজ এগিয়ে কাত হয়ে থেমে পড়ল।
