রাস্তার একটা ন্যাংটো পাগলের দিকে লোকে যেভাবে তাকায়, সেভাবেই অপর্ণা জীবনের দিকে এক পলক চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়, তারপর এই প্রথম সে জীবনকে নাম ধরে ডাকে ‘জীবন, তুমি ছিলে রাস্তার ছেলে, প্রায় ভিখিরি। তোমার সঙ্গে কোনও ব্যাপারেই আমার মিল নেই। ভাগ্য তোমাকে এত দূর এনেছে। তবু আজ ওই কাণ্ড করে তুমি সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিতে চেয়েছিলে। ডোবাতে চেয়েছিলে নিজেকে, আমাদেরও। এর জন্যই কি তুমি বাহবা চাও?’
জীবনের মাথার ভিতরে ঘোলা জল টলমল করে ওঠে। অপর্ণার কথার ভিতরে কোথায় যেন একটু সত্য ছিল, কিন্তু জীবন তা ধরতে পারে না। তার প্রাণপণ ইচ্ছে হয় অপর্ণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলে–তুমি ঠিক বলছ অপর্ণা। ঠিক বলছ। এই ঘর–বাড়ি–সংসার আমার নিজের বলে মনে হয় না। এখানকার খাবারে আমি এক কণা স্বাদ পাই না। আমার কেবলই ইচ্ছে এই সব কিছুর বুকের ওপর দিয়ে একবার জোরে চালিয়ে দিই, আমার গাড়ি। কিন্তু সেসব কিছুই বলে না। জীবন, মুখে মৃদু হাসি টেনে আনে, তেমনই ঠাট্টার সুরে বলল , ‘জীবনে সে কয়টি মুহূর্তই দামি যে সব মুহূর্তে মানুষ মানুষকে সুন্দর দেখে। জন্ম থেকে তুমি কি কেবলই শিখেছ কী করে নিরাপদে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকা যায়?’
মাথার ভিতরে, বুকের ভিতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা বোধ করে জীবন। অপর্ণা নিষ্ঠুর ধারাল চোখে কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে চেয়ে থাকে, তারপর সামান্য বিদ্রুপের মতো করে বলে যায়, আমাদের কাবলি বেড়ালটারও সেই দামি মুহূর্ত বোধ হয় কাল রাতে এসেছিল যখন তাকে তুমি সুন্দর দেখেছিলে। আমি, আর তোমার দুই মেয়েও তো সুন্দর জীবন, তাদের জন্য এবার একটা বড় দেখে ফ্রিজ কেননা, দোহাই, জোরে গাড়ি চালিয়ে নাটক কোরো না।’
হঠাৎ তীব্র এক অসহায়তা সঙ্গীহীন জীবনকে পেয়ে বসে। তার মাথার ভিতরে কল চলবার শব্দ, বুকের ভিতরে কেবলই একটা রবারের বল লাফিয়ে ওঠে। তবু তার এই কথা বলবার ইচ্ছে হয়–ঠিক, তুমি ঠিকই বলছ অপর্ণা। আমার ওই রকমই মনে হয়। এই সব ভেঙেচুরে শেষ করে। দিয়ে আমার আবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে ছেলেবেলার সেই চায়ের দোকানের উনুনের পাশে, চট আর ছেঁড়া শতরঞ্জির বিছানায়, যেখানে দুঃখী রোগা এক মায়াবী বেড়াল আমার শিয়রের কাছে শুয়ে থাকবে সারা রাত। কিংবা ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই মোটর সারাই কারখানায়, যেখানে লোহার জোড় মেলাতে মেলাতে আমি কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল দেখে গান গাইব আবার। হ্যাঁ, অপর্ণা, আমি এখনও ছোটলোক, ভিখিরি। মুখে মৃদু হাসল জীবন, তার মুখ সাদা দেখাচ্ছিল, কোনওক্রমে সে গলার স্বরে এখনও সেই ঠাট্টার সুর বজায় রাখছিল, ‘কে জানে তোমার কাবলি বেড়ালটাও আত্মহত্যা করেছিল কি না!’
অপর্ণা কী বলতে যাচ্ছিল, হাত তুলে জীবন বলে ‘চুপ, অপর্ণা!’ তারপর লিত গলায় বলে, ‘তুমি সহমরণের কথা বলছিলে না! ধরে নাও আজ আমি তোমাকে সহমরণেই নিতে যেতে চেয়েছিলুম। তুমি বুঝবে কি এসব অপর্ণা?’
অপর্ণা মাথা নাড়ে না। তার চোখে জল, মুখের প্রতিটি রেখায় রাগ আর আক্রোশ। সে জীবনের দিক থেকে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে উঠে চলে যায়। জীবন বাধা দেয় না। শুধু এতক্ষণ অপর্ণা যে জায়গায় বসেছিল সেইখানে গভীর চোখে চেয়ে থাকে, যেন এখনও অপর্ণা বসে আছে।
ঘরে কেউ ছিল না, তবু হঠাৎ জীবন চমকে উঠে বলে ‘কে?’ তারপর শূন্য চোখে চারদিকে চায়। সিগারেট আর দেশলাইয়ের জন্য চারিদিকে হাতড়ে দেখে। বড় ক্লান্তি লাগে জীবনের। এলোমেলো অনেক কথা তার ভিতর থেকে ঠেলে আসতে চায়। মাথার ভিতরে ঘোলা জল টলমল করতে থাকে। সে ভীষণ অন্যমনস্কর মতে বলে ‘আঃ, অপর্ণা…’ পরমুহূর্তেই চমকে ওঠে ‘কেউ কি আছ?’ কেউ ছিল না, তবু জীবন একবার পরম বিশ্বাসে দুটো হাত আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে শূন্যে তুলে ধরে, যেন ভিক্ষুকের মতো বলতে চায়–আমাকে নাও।
দরজার কাছ থেকে মিঠু ডাকে, ‘বাবা!
অলীক আত্মসমর্পণের এক শূন্যতা থেকে জীবন আবার শব্দ, গন্ধ ও স্পর্শের বাস্তবতার ভিতরে দ্রুত ফিরে আসে।
গঞ্জের মানুষ
রাজা ফকিরচাঁদের ঢিবির ওপর দিনটা শেষ হয়ে গেল। একটা একা শিরীষ গাছ সিকি মাইল লম্বা ছায়া ফেলেছিল। সেই ছায়াটাকে গিলে ফেলল আঁধার রাতের বিশাল পাখির ছায়া। ফকিরচাঁদের সাত ঘড়া মোহর আর বিস্তর সোনাদানা, হিরে-জহরত সব ওই ঢিবির ভিতরে পোঁতা আছে। আর আছে ফকিরচাঁদের আস্ত বসতবাড়িটা। ঢিবির ওপাশ দিয়ে রেললাইন, এপাশ দিয়ে রাস্তা। পাথরকুচি ছড়ানো, গাছগাছালির ছায়ায় ভরা। এখন একটু অন্ধকার মতো হয়ে এসেছে, শীতের থম-ধরা বিকেলে একটু ধোঁয়াটে মতো চারধার। রাস্তার পাথরকুচিতে চটি ঘষটানোর শব্দ উঠছে। রবারের হাওয়াই চটি, এ পর্যন্ত সাতবার ছিঁড়েছে। তবু ফেলে দেয়নি নদীয়াকুমার।
তো এই সন্ধের ঝোঁকে আলো-আঁধারে নদীয়া যায়, না নদীয়ার বউ যায় তা ঠাহর করা মুশকিল। ভেলুরামের চোখে ছানি আসছে। নাতি খেলারাম বীরপাড়া গেছে তাগাদায়। সে এখনও ফেরেনি দেখে চৌপথীতে গিয়ে খানিক দাঁড়িয়ে দেখে এল ভেলু। বীরপাড়ার একটা বাস এসে ছেড়ে গেল। এ-গাড়িতেও আসেনি। আরও খানিক দাঁড়িয়ে থাকলে হত। নাতিটার জন্য বড় চিন্তাভাবনা তার। কিন্তু ভেলুরাম দোকান ছেড়ে বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে ভরসা পায় না। তার ছেলে শোভারাম চোর-চোট্টা-বদমাশ হয়ে গেছে। এক নম্বরের হেক্কোড়। নেশাভাঙ আর আউরাৎ নিয়ে কারবার করে। বহুকাল আগে শোভারামের বউ পালিয়ে গেছে। ভেলু কেবল নাতিটাকে রেখে শোভারামকেও ঘরের বার করেছে। কিন্তু ছেলে মহা হেক্কোড়, দুনিয়ায় কাউকে ভয় খায় না। দরকার পড়লেই এসে ভেলুর দোকানে হামলা করে মালকড়ি বেঁকে নিয়ে যায়। তাই চৌপথী থেকে পা চালিয়ে ফিরছিল ভেলু। রবারের চটির আওয়াজে দাঁড়িয়ে গেল।
