লজ্জা পেলাম। গম্ভীর মুখে শুধু বললাম–হুঁ।
সোনামন হঠাৎ বলল –তুমি অত সিগারেট খাও বলেই নার্ভ অত ইরিটেটেড হয়।
অবাক গলায় বললাম–দূর!
সে মাথা নাড়ল–ঠিকই বলছি। ট্যাক্সিতে ওঠার আগে তুমি যখন সিগারেট কিনতে গেলে আমাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে, তখন আমি ট্যাক্সিওয়ালাকে বলেছিলাম যেন সে তোমার কথা না শোনে, যেন একটু ঘুরে-ঘুরে যায়। আমি মফসসলের মেয়ে, ট্যাক্সিতে চড়ে কলকাতা দেখতে আমার ভালো লাগে।
দাঁড়িয়ে পড়ে আমি বললাম–সত্যি বলছ?
–সত্যি। সে মাথা নাড়ল–কে জানত তুমি রেগে গিয়ে ওই কাণ্ড করে বসবে মানিকসোনা। আমি তোমাকে বলবার সময়ই পেলাম না। তার আগেই তুমি মারতে শুরু করেছ। মাগো! ওর মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল!
অনেকক্ষণ চুপ করে হাঁটতে-হাঁটতে আমি শুধু বললাম–ট্যাক্সির ভাড়াটা দেওয়া হল না।
এ কথা ঠিক যে, উত্তেজনা বেশি হলে আমার ব্যথা বাড়ে। গলা বুক জুড়ে বিষাক্ত টক জল কলকল করতে থাকে। কোনও কিছুতেই তখন আর স্বস্তি পাওয়া যায় না। ওই উত্তেজনার পর সেই বিকেলে আমার ব্যথা বাড়তে লাগল। যখন সুইন–হো স্ট্রিটে আমার ছোট্ট একটেরে ঘরটার তালা খুলছি তখনও আমার মনে হচ্ছে একটু বমি হয়ে গেলে স্বস্তি পাব। সঙ্গে সোনামন না থাকলে বাথরুমে গিয়ে আমি তাই করতুম। কিন্তু পাছে তার কাছে আমার অসুখ ধরা পড়ে যায়, আর সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে, সেই ভয়ে আমি সামান্য কষ্টে আমার যন্ত্রণা চেপে রাখলাম। কিন্তু যে। ভালোবাসে তার কাছে গোপন করা বড় শক্ত। আমাকে ঘিরে সোনামনের সমস্ত অনুভূতিগুলো বড় সচেতন। অনেক সময় সোনামন ঠিকঠাক বলে দেয় আমি কী ভাবছি। কিংবা আমার মন মেজাজ কখন কেমন থাকে বা থাকতে পারে তাও মাত্র আট-ন মাসের পরিচয়ে সে বুঝে গেছে। নির্জন রাস্তা তোমার ভালো লাগে, না গো? ওঃ, তোমার হাই উঠছে, একটু চা খাবে, না? অনেকক্ষণ খাওনি। তুমি খোলা জায়গায় প্রায়ই আমার মুখ আড়াল করে রাখতে চেষ্টা করো, যাতে কেউ না আমার মুখ দেখতে পায়, তাই না, বলো! ইস, কী বোকা! সোনামন এরকম অজস্র। বলে যায়। ধরা পড়ে গিয়ে আমি আর লজ্জা পাই না। তবু আমি বহুদিন আমার ব্যথাটার কথা গোপন রাখতে পেরেছিলাম। সেদিন ঘরে ঢুকতে–ঢুকতে আমি প্রবল ব্যথাটাকে কষ্টে চেপে রাখছিলাম। আমার ঘরে যখন সোনামন আসে তখন আমি দরজা হাট খোলা রাখি, মাঝখানে একটা টেবিল, তার দুধারে বসি দুজনে যাতে খারাপ কেউ না ভাবে। সেরকমভাবেই বসেছিলাম দুজনে। কথা হচ্ছিল। আমার ব্যথাটার চরিত্র এই যে, শরীর কুঁজো করে কুঁকড়ে রাখলে সামান্য স্বস্তি লাগে। সাধারণত আমি সোজা এবং সহজভাবে বসি। সেদিন আমার শরীর দুবার কি তিনবার ঝাঁকুনি দিয়ে কুঁকড়ে গেল। ভেবেছিলাম অত সামান্য অস্বাভাবিকতা ও লক্ষ করবে না। কিন্তু তিনবারের বার ও কথা থামিয়ে চুপ করে আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি হাসছিলাম। ও আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বলল তোমার শরীর ভালো নেই?
প্রশ্ন নয়, ঘোষণা।
শরীর সহজ করে নিয়ে হেসে বলি–কোথায় কী! শরীর ঠিক আছে।
ও মাথা নাড়ল–বাজে বোকো না। তোমার ব্যাপারে আমি বোকা নই। সব বুঝি।
–কী বোঝো?
–তোমার একটা কিছু যন্ত্রণা হচ্ছে।
–কই!
–হচ্ছে, আমি জানি। তোমার মুখ আবার সাদা দেখাচ্ছে।
তুমি লুকোচ্ছ। হাসলাম–বেশ! কিন্তু বলো তো কোথায় যন্ত্রণা?
ও একটু থমকে গেল। দাঁতে সামান্য ঠোঁট চেপে রেখে বলল –বলব?
মাথা নাড়লাম–বলো।
ও আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর আস্তে-আস্তে ওর চোখে আমার এলানো শরীরের সব ভঙ্গি খুঁটিয়ে দেখে নিল। তারপর একটা হাত বাড়িয়ে ও আমার পেট দেখিয়ে দিল–ওইখানে।
–না। আমি মাথা নাড়লাম–ঠিক পেটে নয়, তবে কাছাকাছি। আন্দাজ করে বলল ।
কিন্তু এই লুকোচুরির খেলা খেলল না সোনামন। আমার একটা হাত ধরে টানতে-টানতে বলল –কোথায় ব্যথা জানবার দরকার নেই… এখন চলো তো!
–কোথায়?
–ডাক্তারের কাছে।
বহুকাল, প্রায় সেই ছেলেবেলার পর থেকেই কোনও ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়নি। বড় লজ্জা করছিল। কিন্তু সোনামন শুনল না, জোর করে নিয়ে গিয়ে প্রথম যে ডাক্তারখানা পাওয়া গেল সেখানেই এক বুড়োসুড়ো ডাক্তারের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল আমাকে। কানে শুধু বলে দিল–দেখো, ডাক্তারকে আবার বোলো না যেন, আমার ব্যথাটা কোথায় বলুন তো!
রোগা একটা হাড় জিরজিরে ছেলে বুড়ো ডাক্তারের সামনে মা কালীর মতো জিভ বের করে দাঁড়িয়েছিল। তার দিক থেকে একবার আড়চোখ তুলে ডাক্তার আমাকে প্রশ্ন করলেন কী?
সোনামনকে খ্যাপানোর জন্যেই আমি ভেবেচিন্তে ধীরেসুস্থে কেটে-কেটে বললাম–আজ আমি একটা ট্যাক্সির ভাড়া দিইনি ডাক্তারবাবু। তার ওপর ট্যাক্সিওয়ালাকে আমি খুব। মেরেওছিলাম।
ডাক্তার হাঁ করে তাকালেন। পিঠে সোনামনের একটা চিমটি টের পেলাম।
ধীরেসুস্থে আমি ডান হাতটা এগিয়ে দিলাম ডাক্তারের সামনে, বললাম–দেখুন ডাক্তারবাবু, ট্যাক্সিওয়ালাটার দাঁতে লেগে আঙুলটা অনেকখানি কেটে গেছে। মানুষের দাঁত বড় বিষাক্ত। এর জন্যে একটা ওষুধ দিন।
আমাকে ঠেলে সরিয়ে তখন সোনামন লালচে লাজুক মুখে এগিয়ে এল–না ডাক্তারবাবু, ওর কথা শুনবেন না…ইত্যাদি।
দুটি পাগল প্রেমিক প্রেমিকার পাল্লায় পড়ে আসল ব্যাপারটা বুঝতে ডাক্তারবাবুর অনেকটা সময় এবং ধৈর্য গেল। তারপরও ব্যাপারটা চট করে মিটল না। ডাক্তার অনেক কিছু পরীক্ষা করতে চাইলেন। সোনামনের পাল্লায় করে পড়ে দু-চার দিন ধরে সেই সব ক্লান্তিকর পরীক্ষা আমাকে দিতে হচ্ছিল। কিন্তু সারাক্ষণ আমার মন অন্য কথা বলছিল। বুঝতে পারছিলাম যে, এসব কিছুই নয়; আসলে সারাজীবন ধরে আমি যে কিছু কিছু অন্যায় করেছি তা সবই তার প্রতিক্রিয়া। সবচেয়ে কাছাকাছি কারণটা হচ্ছে ট্যাক্সির ভাড়া না দেওয়া এবং ট্যাক্সিওয়ালাকে ওই মার। অবশেষে রোগ ধরা পড়ল–হাইপার অ্যাসিডিটি। গালভরা চমৎকার নামটি শুনে। আমি খুশি হলাম, সোনামন হল না।
