–কথা! বলে টুপু হাঁ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ বলে—এতদিন বলেনি কেন?
—সময় হয়নি। কথারও সময় আছে টুপু।
টুপু হেসে মাথা নীচু করে লজ্জায়। তারপর অল্প একটু শ্বাসকষ্টের সঙ্গে বলে—আজ বুঝি সময় হয়েছে?
—হ্যাঁ। খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই এবার বলি। টুপু…
টুপু দু-হাতে কান চেপে ধরে চেঁচিয়ে ওঠে—পায়ে পড়ি, বোলো না, বোলো না তো! বললেই ফুরিয়ে যাবে।
—বলব না? কুশল অবাক।
টুপু স্নিগ্ধ চোখে চেয়ে হাসল। বলল—সারা জীবন ধরে ওই কথাটা একটু-একটু করে বোলো। কথা দিয়ে নয়, অন্যরকম ভাবে।
কার্যকারণ
কার্যকারণ
রাত দুটোয় জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আমি সিগারেট জ্বাললুম। নিঃসাড় ঘুমে অচেতন আমার বউ সোনামন তা জানতেও পারল না। সারা বিকেল আমার সিগারেটের প্যাকেট লুকোনো ছিল হাতব্যাগে। খেয়াল করেনি সোনামন, বিছানায় যাওয়ার আগে অবহেলায় সে আমাদের দুই বালিশের ফাঁকে রেখেছিল ব্যাগটা আমি তা দেখে রেখেছিলাম।
বিয়ের একমাস আগে আমার গ্যাসট্রিকের ব্যথাটা বেড়ে গেল খুব। ব্যথা লুকিয়ে আমি ঘুরে বেড়াতাম। পেট আর বুকের মাঝখানে একটা বিন্দুতে ব্যথাটা প্রথমে শুরু হত। ফুলের কলির মতো। তারপরেই ছিল তার আস্তে আস্তে পাপড়ি মেলে দেওয়া। কিছু খেলেই কমে যেত। তারপর আবার গোড়া থেকে সে শুরু করত। সোনামন যখন রাস্তায় আমার পাশে হাঁটত, ট্যাক্সিতে ঢলে পড়ত আমার কাঁধে, কিংবা রেস্টুরেন্টে বসে চাপা ঠোঁটের হাসিটি হাসতে-হাসতে চায়ে চিনি মেশাত তখন আমি বুক–জোড়া টক জল আর কামড়ে ধরা ব্যথাটা গিলে রেখে অনায়াসে হাসতাম, কথা বলতাম। ওকে টের পেতে দিতাম না। শুধু মাঝে-মাঝে সোনামন চমকে উঠে বলত তোমাকে অত সাদা দেখাচ্ছে কেন মানিকসোনা (আমরা পরস্পরকে নানা নামে ডাকি)? আমি শান্ত গলায় উত্তর দিতাম বোধহয় আলোর মতো। ও বিশ্বাস করত না। বলত–আলো না, তোমাকে কেমন ক্লান্তও দেখাচ্ছে! কী হয়েছে? আমি হাসতাম। হেসেই ধরিয়ে নিতাম সিগারেট। ওই সময়টুকুর মধ্যেই আমি কৌশলে সোনামনকে অন্য কোনও বিষয়ে নিয়ে যেতাম নিজেকে আড়াল করে। আমি কখনও লক্ষই করতাম না, আমি কত সিগারেট খাই। সোনামনের
সঙ্গে জীবনে প্রথম এবং একমাত্র প্রেম করার সময়ে আমি মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিলাম। কেন না। দেখা হলে বা দেখা হওয়ার আগের কিছুটা সময়ে আমার শরীর কাঁপত, স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ত। প্রবল। সঙ্গে-সঙ্গে সিগারেটের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে নেওয়া আমার ছিল প্রিয় অভ্যাস। বিবাদে, আনন্দে কিংবা উত্তেজনায় আমার কেবলই ছিল সিগারেট আর সিগারেট। সিগারেটের চেয়ে স্বাদু কিছুই ছিল না।
বিয়ের একমাস আগে আমরা একটা ইতর ট্যাক্সিওয়ালার পাল্লায় পড়েছিলাম। গঙ্গার ধার থেকে সে আমাদের ঘুরপথে নিয়ে যাচ্ছিল। জোড়া ছেলে মেয়ে উঠলে ওটা তাদের অভ্যাস। আমি তাকে রেড রোড দিয়ে বালিগঞ্জের পথ বললাম, সে আমাদের অন্যমনস্ক দেখে সোজা উঠে এল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাছে। পরপর সে অবাধ্যতা করে যাচ্ছিল। গাড়িতে তার মুখের সামনে লাগানো ছোট্ট আয়নাটায় আমি তার রুক্ষ মুখে বিচ্ছিরি একটু হাসিও দেখতে পেয়েছিলাম। আমি ড্রাইভারকে লক্ষ করছি দেখে সোনামন রাগ করে বলল –তুমি কেবল ওইদিকেই চেয়ে আছ। ওখানে কী! আমি তোমার ডানপাশে। আমি মৃদু হেসে সোনামনের দিকে মুখ ফিরিয়ে ওর কথা শুনছিলাম। কিন্তু আমার লক্ষ ছিল আয়নার দিকে। নির্জন গুরুসদয় রোডে গাড়ি ঢুকলে আমি শান্ত গলায় ড্রাইভারকে থামতে বললাম। ড্রাইভার মুখ ফিরিয়ে ঠোঁট আর জিভের শব্দ করল। সোনামন আমার হাত আঁকড়ে বলল , এখানে কেন? আমি হেসে বললাম–বাকিটুকু হেঁটে যাব, সোনামন। বিয়ের আগে একটু পয়সা বাঁচাই।
সোনামন নেমে ফুটপাথে দাঁড়াতেই আমি ট্যাক্সিটা ঘুরে ড্রাইভারের দরজায় গিয়ে একটা ঝটকায় দরজা খুলে ফেললাম। কী করছিলাম তা আমার খেয়াল ছিল না। আঠাশ উনত্রিশ বছর বয়সের শক্ত কাঠামোর ড্রাইভারটা মুখে একটু রাগ দেখাবার চেষ্টা করল। তারপরই আমার মাথার ভিতরে অস্বচ্ছ একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠেছিল। তাকে গাড়ির বনেটের ওপর চিৎপাত করে ফেলে আমি একনাগাড়ে অনেকক্ষণ মেরে গেলাম। নির্জন রাস্তাতেও লোকজন ছুটে আসছিল। প্রথম ভ্যাবাচাকার ভাবটা সামলে নিয়ে সোনামনই প্রথম ছুটে এসে আমার কোমর জড়িয়ে ধরল দু-হাতে–মানিকসোনা, এই মানিকসোনা…ওগো…পায়ে পড়ি। আমি সোনামনের কান্নার শব্দও শুনতে পেলাম।
কলকাতার লোকেরা এমনিতেই ট্যাক্সিওয়ালাদের পছন্দ করে না। তার ওপর আমার সঙ্গে সুন্দর একটি মেয়ে রয়েছে। কাজেই ট্যাক্সিওয়ালাকে আরও কিছু মারমুখো লোকের ভিড়ের মধ্যে রেখে দিয়ে আমি সোনামনকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। অভ্যাসমতোই আমার স্বয়ংক্রিয় হাত সিগারেট ধরিয়ে নিল। অনেককাল আমি কোনও দাঙ্গাহাঙ্গামার মধ্যে যাইনি। আমার রক্ত ঠান্ডা। তবু কী করে যে ব্যাপারটা হয়ে গেল। আমার ছেলেবেলায় শেখা ঘুষি মারার কৌশল আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। অনেককাল আর আমার দুই হাত মারধরে ব্যবহৃত হয়নি।
চুপচাপ অনেকটা হেঁটে যাওয়ার পর হঠাৎ সোনামন তখনও তার কিছুটা ধরা গলায় বলল –তুমি যে এমন রাগতে পারো জানতুম না।
