ডাক্তার আমার ব্যাপারে তাকে কিছু কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। পাড়ার একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে আমি মাঝে-মাঝে চা খেতাম। সেইখানে এক বিকালে দোকানভরতি লোকের সামনে। সোনামন দোকানদারকে বোঝাল আমার কি বিশ্রী একটা অসুখ হয়েছে। আর চা কত খারাপ। এর পর থেকে আমি চা চাইলে সে যেন আমাকে এক কাপ করে দুধ দেয়। দোকানদারকে কথা দিতে হল।
তারপর চলল গয়লার খোঁজ যে রোজ সকালবেলায় আমার ঘরের সামনে গরু নিয়ে এসে দুধ দুইয়ে দিয়ে যাবে। আমি আপত্তি করলাম–রোজ সকালে উঠে আমি গরুর মুখ দেখতে পারব না। কিন্তু সোনামন শুনল না।
যে হোটেলটায় আমি খেতাম সেখানে গিয়েও সোনামন আমার খাবারে ঝাল মশলার ওপর একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে এল। আর আমার ঘরের টেবিলটা ভরে উঠল বিস্কুটের টিন আর ওষুধের বাক্সে। আর সেই থেকেই আমার সিগারেট হাতছাড়া হয়ে সোনামনের হাতব্যাগে ঢুকে গেল। বিয়ের একমাস আগে থেকেই।
বহুদিন হল প্রায় চোদ্দো–পনেরো বছর বয়স থেকেই আমি বাড়ি আর মা বাবাকে ছেড়ে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কখনও পড়ার জন্য, কখনও চাকরির জন্য। নিঃসঙ্গ জীবন আমার একরকম প্রিয় ছিল। সেইখানেই পড়ল ডাকাত। সোনামন বিকেলে ফিরে যাওয়ার সময়ে রোজ দিব্যি দিয়ে যেত রাত্রে যেন দুটোর বেশি সিগারেট না খাই। ও চলে গেলে দীর্ঘ অপরাহ্ন আর রাত–জোড়া নিঃসঙ্গতায় সিগারেট ছাড়া তাই হঠাৎ বুকের মধ্যে ধক করে উঠত! তবু খেতাম না। ওর দিব্যি মনে পড়ত। একটু হেসে আমি আমার প্রিয় সিগারেটে আগুন না জ্বেলে হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম।
আস্তে-আস্তে ব্যথাটা কমে যেতে লাগল। দশ পনেরো দিনের মধ্যেই আর ব্যথার চিহ্ন ছিল। না। টক জলের স্বাদ মুছে গেল বুক আর জিভ থেকে। চেহারা ফিরল একটু। আর সোনামনের মুখে বাচ্চা লুডো খেলুড়ির ছক্কাফেলার মতো ছেলেমানুষি হাসি ফুটে উঠল। তবু মাঝে-মাঝে আমার দুর্বোধ্যভাবে মনে হত আমার অসুখের কারণ কেবলমাত্র সিগারেট কিংবা অনিয়ম নয়। কেননা অনিয়ম এবং সিগারেটেরও আবার কারণ রয়েছে। এই রকম অনুসন্ধান করে যেতে থাকলে হয়তো দেখা যাবে আমার প্রস্তরীভূত মূল অন্যায়গুলিকে। সেই ট্যাক্সির ব্যাপারটা আমার প্রায়ই খুব মনে পড়ত। সোনামনকে আমি দু একবার বলতে গিয়েও সামলে গেছি। কেননা ও হয়তো ব্যাপারটায় নিজের দোষ মনে করে দুঃখ পাবে।
বিয়ের পর দু-মাস কেটে গেছে। আমার অসুখ নেই। নিঃসঙ্গতা নেই। সোনামন যত্ন করে বেঁধে দেয় মশলা আর ঝাল ছাড়া খাবার। কম সিগারেট। আমার সমস্ত শরীরে ধীরে-ধীরে ফুটে উঠছে স্বাস্থ্যের সুলক্ষণ। আর আমাকে নিজের কাছ থেকে পালাতে হয় না বন্ধুদের বিকারগ্রস্ত ভিড়ে কিংবা আড্ডায়। খিদে মেটাবার আলসেমিতে যখন তখন চায়ের কাপ টেনে বসতে হয় না। আমি সুন্দরভাবে বেঁচে আছি। জানি, অলক্ষে অজান্তে কখন সোনামনের গভীর উষ্ণ অন্ধকারে চলে গেছে আমার বীজ। ওই বৃক্ষ থেকে পাকা ফলের মতো বোঁটা ছিঁড়ে শিগগিরই একদিন নেমে আসবে আমার প্রিয় আত্মজরা। আমি জানি। আমি তা জানি। তবু আজ রাত দুটোয় আমি সোনামনকে ঘুমন্ত একা বিছানায় রেখে চুরি–করা সিগারেট জ্বেলে এসে জানলায় দাঁড়ালাম। হায় ঈশ্বর! আমি কীভাবে বলব! সোনামনকে আমি কীভাবে বলব!
ট্যাক্সিওয়ালাটা জানে যে, একটা রাস্তায় দুর্ঘটনার জন্য তার ফাঁসি হবে না। কিন্তু পরিপূর্ণ প্রতিশোধ নেওয়া হবে। আমি তার ট্যাক্সির নম্বর মনে রেখেছি। কিন্তু আমি জানি তাতে লাভ নেই। আমি তাকে আর ছুঁতেও পারি না।
পরশুদিনই আমি তাকে আর একবার দেখলাম। এক পলকের জন্য। সুইন হো স্ট্রিটের ঘরটা ছেড়ে দিয়ে আমরা এখন যে ছোট্ট বাসাটায় আছি তা বাস রাস্তা থেকে অনেকটা দূরে। একটু নির্জন চওড়া রাস্তা। বড়লোকদের পাড়া। বিকেলে আমি ফিরছিলাম। সারা মন সোনামনের নাম ধরে ডাকছিল। মনে পড়ছিল দরজা খুলে দিয়ে সোনামন কেমন লঘু পায়ে আমার আক্রমণ থেকে সরে দাঁড়াবে। চলে যাবে ছোট্ট ফ্ল্যাটটার কোণে কোণে। অনেকক্ষণের সেই ক্লান্তিহীন হুটোপুটি। সে সময়ে সোনামন তার ঘন শ্বাসের ফাঁকে-ফাঁকে বলবে–মোটেই তিনটে না মশাই, তুমি আজ। পাঁচটা সিগারেট খেয়েছ সারাদিন। ভুরভুর করছে গন্ধ। ভাবতে-ভাবতে আমি অন্যমনে ফুটপাথ থেকে পা বাড়িয়েছি রাস্তা পার হওয়ার জন্য। অভ্যাসমতো ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। মোড় থেকে ধীরে-ধীরে আসছে একটা ট্যাক্সি। ওটা আসার অনেক আগেই আমি পেরিয়ে যাব মনে করে যখন আমি রাস্তার মাঝামাঝি তখনই হঠাৎ মোটর ইঞ্জিনের তীব্র শব্দ হয়েছিল। হর্ন বাজেনি। হতচকিত আমি দেখলাম। পাগলাটে খ্যাপা ট্যাক্সিটা বাঘের মতো লাফিয়ে চলে এল। বৃথাই আমি একটা হাত তুলে আমার অসহায়তা তাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম। কেননা ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি সে কী চায়। সময় ছিল না। একদম সময় ছিল না। শুধু শেষ চেষ্টায় আমি খুব জোরে শূন্যে লাফিয়ে উঠলাম। ট্যাক্সির নীচু বনেটটায় আমার পায়ের জুতোর ঠক করে। শব্দ হল। আমাকে পাকিয়ে ছুঁড়ে একধারে ফেলে রেখে গাড়িটা তার তীব্র গতি বজায় রেখে বেরিয়ে গেল। খুব সামান্য এক পলকেরও ভগ্নাংশ সময়ের জন্য আমি ড্রাইভারের রুক্ষ মুখটা দেখতে পেলাম, অস্বচ্ছভাবে শুনতে পেলাম তার চাপাগলার গালাগাল–শালা…
