ওটা বলে লজ্জা দেবেন না। যা জানি তাকে লেখাপড়া জানা বলে না। আমাকে শিক্ষিত ভাবলে ভুল করবেন।
আপনি আমাকে খুব ডাইলেমায় ফেলে দিয়েছেন। আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে আপনি আমাদের বাড়িতে চুরি করতে ঢুকেছেন। এ-যুগটা তো বোলচালেরই যুগ। যে যত বুকনি আওড়াতে পারে সেই তত খাতির পায়।
আমার কথা শুনে ইমপ্রেসড হবেন না যেন। ভুল করবেন, আমি সত্যিই চোর।
সেটাই তো ধাঁধায় ফেলেছে আমাকে। চোর হলেও আপনার বেশ স্ট্যাটাস আছে মনে হচ্ছে। আমাদের বাড়িতে কি আর তেমন কিছু পাবেন?
ঠিকই ধরেছেন। চোর হলেও আমি একটু উন্নাসিক।
হ্যাঁ, তাই ভাবছি আপনার মতো একজন হাইফাই বার্গলারের সম্মান রক্ষার মতো কিছুই তো আমাদের নেই।
আছে মশাই, আছে। একেবারে বিনা খবরে কি আমি সময় নষ্ট করতে এসেছি? কী আছে বলুন তো? উনিশ-শো আঠারো বা উনিশের একটা রোলেক্স ঘড়ি। বেশ বড় সাইজের। পুরোনো আমলের দম দেওয়া। ঘড়ি। ঠিক কি না?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আছে। ওটা আমার দাদুর বাবার ঘড়ি বলে শুনেছি। ওটা বাবা খুব যত্ন করে রোজ দম দেন। আশ্চর্যের বিষয়, ঘড়িটা আজও চলে। কে আপনাকে ঘড়িটার কথা বলল বলুন তো?
আমার একটা নেটওয়ার্ক আছে।
বাব্বাঃ, আপনি তো বেশ অর্গানাইজড ম্যান।
না হলে, এযুগে ব্যাবসা চলবে কেন বলুন? আপনার বাবা এই ঘড়িটা সম্পর্কে সব ইনফর্মেশন ইন্টারনেটের মাধ্যমে জানিয়েও দিয়েছেন। আমি ইন্টারনেটেই সার্চ করে করে খবরটা পাই।
তার মানে আপনি ইন্টারনেটেই আমাদের ঠিকানা পেয়েছেন? তবে যে বললেন আপনি বাড়ির মালিকের নাম জানেন না, বাড়ির নম্বর জানেন না।
সাবধানের মার নেই মশাই, তাই একটু ন্যাকামি করতে হয়েছিল।
ঘড়িটা হলেই কি আপনার চলবে?
আপাতত ঘড়িটাই আমার টার্গেট। ওটার বাজারদর যাচাই করে দেখেছি পাঁচ থেকে সাত লাখ অবধি পাওয়া যেতে পারে।
বলেন কী? এই ঘড়িটার এত দাম কে দেবে?
কালেকটাররা দেবে, কোম্পানি নিজেও দেবে। ইন্টারনেটে রেগুলার ওদের বিজ্ঞাপন থাকে।
কালেকটারদের এজেন্টরা কলকাতাতেও আসে।
তবু আপনি নিজেকে শিক্ষিত বলতে চান না?
কেন বলুন তো! আপনি তো রীতিমতো শিক্ষিত মানুষ। ইন্টারনেট সার্ফ করেন মানে আপনি দুনিয়ার সব খবরই রাখেন।
না মশাই, বেশি খবর রেখে লাভ কী? আমার যেটুকু দরকার সেই খবরটুকু রাখি।
তার মানে আপনার কম্পিউটারও আছে।
আছে। চাঁদনি মার্কেট থেকে অ্যাসেম্বল করিয়ে কিনে এনেছি।
ল্যাপটপও আছে নাকি?
না। তবে আপনার বাবার ঘড়িটা গ্যাঁড়াতে পারলে ল্যাপটপও হয়ে যাবে।
ঠিক আছে। বাবা দোতলার দক্ষিণের ঘরে থাকেন। পাশের ঘরে মা আর বোন। বাবার ঘরে একটা সেক্রেটারিয়েট টেবিল আছে। তার ডানধারে টপ ড্রয়ারে ঘড়িটা পেয়ে যাবেন।
বাঃ, ইউ আর ভেরি কো-অপারেটিভ।
কিন্তু মুশকিল হল, দোতলায় সিঁড়ির মুখে কোলাপসিবল গেটে তালা দেওয়া আছে। আপনি তো আমেরিকায় থাকেন। জানেন কি সেখানকার কৃষ্ণাঙ্গ মাগারদের একটা গাড়ির লাগেজ বুট খুলতে ক-সেকেণ্ড সময় লাগে? তিন থেকে পাঁচ সেকেণ্ড।
ভগবান! আপনি কি আমেরিকাতেও হানা দিয়েছিলেন নাকি?
এ-প্রশ্নের জবাব আপনার না জানলেও চলবে। আমি কর্ডলেস ফোনটা নিয়েই ওপরে উঠছি। আপনি আমাকে গাইড করতে থাকুন।
আর একটা কথা। আমার বাবার ঘুম খুব সজাগ। সামান্য শব্দ হলেই জেগে যাবেন। যদি জেগে যান তাহলে কী করতে হবে, তা তো আপনাকে বলেই রেখেছি।
হ্যাঁ, মনে আছে। তাঁকে ফোনটা ধরিয়ে দেব এবং আপনি তাঁকে রি-অ্যাক্ট করতে বারণ করবেন।
এগজ্যাক্টলি। আর দয়া করে ঘুমের ওষুধ স্প্রে করবেন না। আমার বাবার পেসমেকার আছে। কেমিক্যাল ওষুধে রি-অ্যাকশন হতে পারে।
আপনি আপনার বাবাকে খুব ভালোবাসেন, না?
খুব।
ভালো। এই ভালোবাসাটা বজায় রাখবেন। পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপঃ, পিতরি প্রতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতা।
আমি এই শ্লোকটার অর্থ জানি।
তা তো জানেন। কিন্তু বিয়ের পর অর্থটা যেন ভুলে যাবেন না। পিতায় শ্রদ্ধা, মায়ে টান, সেই ছেলেই হয় সাম্যপ্রাণ। এটা কার কথা বলুন তো?
একজন মহাপুরুষের। তিনি মানুষের ভালো চেয়েছিলেন।
আপনি কি দোতলা পৌঁছে গেছেন?
না। উঠছি। সিঁড়িটা খুবই অন্ধকার।
সাবধানে উঠবেন।
আচ্ছা, আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমার সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র আছে নাকি?
হ্যাঁ। সত্যিই নেই তো?
না, সত্যিই নেই, কিন্তু আপনার বাবার আবার পিস্তল বা রিভলভার আছে নাকি?
আছে।
এই রে! তাহলে তো বিপদের কথা।
না না। উনি খুব সাবধানি মানুষ। পিস্তল থাকলেও সেটা আলমারিতে তোলা থাকে। লোড করা থাকে না।
তাহলে পিস্তল রাখার মানে কী?
আমার মা পিস্তল-টিস্তল একদম পছন্দ করেন না। আগে বাবা পিস্তলটা বালিশের তলায় রেখে শুতেন। মা। রাগারাগি করে ওটাকে বিছানা থেকে বিদেয় করেছেন।
খুব ভালো কাজ করেছেন। আপনাদের বাড়িতে কুকুরও নেই দেখছি।
ছিল। একটা রাগি ডোবারম্যান। সেটা আমার খুব প্রিয় কুকুর। সেটা বুড়ো হয়ে মারা যাওয়ায়, আমি কী কান্নাটাই না কেঁদেছিলাম! এখন কুকুর পোষার প্রশ্নই ওঠে না। পেডিগ্রি কুকুর রাখার অনেক ঝামেলা। আমার মা-বাবা এখন আর অত পরিশ্রমের মধ্যে যেতে চান না।
ভালোই করেছেন। কুকুর থাকলে আমাকে অন্যরকম লাইন অফ অ্যাকশনের কথা ভাবতে হত।
না, না, ওসব ভাবতে হবে না আপনাকে। আই উইশ ইউ অল সাকসেস। উঠে পড়েছেন নাকি?
