হ্যাঁ। ফোনটা একটু ধরে থাকুন। তালাটা খুলে নিই।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি ধরছি, আপনি খুলুন। …হয়ে গেছে নাকি?
ইজি। তালা-ফালা কোনো ব্যাপার-ই নয়। কিন্তু অন্য একটা মুশকিল দেখা দিয়েছে।
কী বলুন তো?
বাথরুমে জলের শব্দ হচ্ছে। কেউ বোধ হয় বাথরুমে গেছে।
সর্বনাশ!
ভয় পাবেন না। আমার অসীম ধৈর্য, এখন কিছুক্ষণ অ্যাকশন বন্ধ করতে হচ্ছে। বুড়ো মানুষরা ঘুম ভাঙলে ফের সহজে ঘুমোতে পারেন না। আমি বরং এই ফাঁকে আপনাদের ছাদ থেকে একটু ঘুরে আসি।
বেশ তো। উঠে পড়ন। তবে আমার বাবা রোজ-ই ট্রাংকুলাইজার খেয়ে ঘুমোন। তাই বোধহয় ঘুমোতে অসুবিধে হবে না।
এটা তো উনি খুবই খারাপ করেন। ওসব খেয়ে শেষে অভ্যেস হয়ে গেলে স্বাভাবিক নিয়মে আর ঘুমোতেই পারবেন না। না খেলে উইথড্রয়াল সিম্পটম দেখা দেবে।
তাহলে কী করা উচিত?
পরিশ্রম। পরিশ্রমই হচ্ছে ঘুমের সবচেয়ে ভালো ওষুধ।
হার্ট প্রবলেম আছে বলে, উনি পরিশ্রম করতে পারেন না।
আজকাল সফিসটিকেটেড পেসমেকার লাগালে কোনো প্রবেলেম হওয়ার কথাই নয়।
পেসমেকার নিয়ে টেনিস খেলা, সুইমিং, জিম সব কিছুই করা যায়।
পেসমেকার সম্বন্ধে এত জানলেন কী করে?
জানা শক্ত কী? আপনার বাবাকে বলবেন, সাতান্ন বছর বয়সে আজকাল কেউ বুড়ো নয়, আর পেসমেকার মানেই জবুথবু হয়ে থাকা নয়।
বলব, নিশ্চয়ই বলব।
আপনাদের ছাদটা তো ভারি সুন্দর! টাইলস বসিয়েছেন নাকি?
হ্যাঁ।
আপনারা বেশ শৌখিন। তাই না?
তা বলতে পারেন। বাবা একটু বাবুগোছের মানুষ।
বুঝেছি।…আপনি বোধহয় কোনো মেমসাহেবের সঙ্গে কথা বলে নিলেন একটু, তাই-না?
সরি, আমার রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট একটা ব্যাপার জিজ্ঞেস করছিল।
আপনি তাহলে এখন অফিসে?
হ্যাঁ। পিক আওয়ার। এক হাতে ফোন অন্য হাতে মাউস।
তাহলে তো মশাই, আপনার কাজের ডিসটার্ব হচ্ছে!
আরে না না, কাজে ডিসটার্ব হবে কেন? কাজ তো একটা সিস্টেমে চলে, তারজন্য অখন্ড মনোযোগের দরকার হয় না।
আচ্ছা মেয়েটা আপনাকে কি হ্যালো সুইট হার্ট বলে ডাকল? ও তো পুরুষরা মেয়েদের বলে!
না মশাই, আজকাল সব উলটেপালটে গেছে। যে কেউ, যে কাউকে ডাকে।
মেয়েটা সত্যিই আপনার গার্লফ্রেণ্ড নয় তো?
পাগল নাকি? মেয়েটা ব্ল্যাক, মোটা আর বোকা।
আমেরিকায় প্রেম-ট্রেম হয়নি আপনার?
খেপেছেন? মেমসাহেবদের খপ্পরে পড়লে উপায় আছে? দু-দিন পর যখন ছেড়ে যাবে তখন, অ্যালিমনি দিতে দিতে ফতুর হতে হবে।
আজকাল বাঙালি ছেলেরা সেয়ানা হয়েছে। লক্ষ্মীছেলের মতো একদিন দেশে এসে টোপর পরে বাঙালি মেয়ে বিয়ে করে নিয়ে যাবেন, তাই-না?
উপায় কী বলুন? নইলে আলুপোস্ত, বেগুনপোড়া, ইলিশ ভাপে, ধোঁকার ডালনা ভুলতে হবে যে! বউয়ের সঙ্গে বসে রবীন্দ্রসংগীত, কী ভীষ্মদেব বা শচীনকর্তার গান শোনা বা সত্যজিৎ-তপন সিংহের ছবি দেখাও বন্ধ। হয়ে যাবে। আপনার গার্লফ্রেণ্ড নেই?
না। তবে একজনকে টার্গেট করে কিছুদূর এগিয়েছিলাম, হল না।
কেন মশাই? সে কি ডিচ করল নাকি?
ডিচ তো অ্যাকসেপ্ট করার পর করে। সে আমাকে অ্যাকসেপ্টই করল না কখনো।
স্যাড ব্যাপার বোধহয়?
হ্যাঁ, আমার পক্ষে তো স্যাড বটেই।
বলতে আপত্তি আছে?
আরে না। আমার লুকোছাপার কিছু নেই।
দাঁড়ান, বাথরুমের আলো এখনও জ্বলছে কি না দেখে নিই।
জ্বলছে?
হ্যাঁ। বোধহয় বড়ো-বাইরে গেলেন। মুশকিল হল।
আপনার তাড়াহুড়ো নেই তো?
না। তবে কাজটা মিটে গেলে স্বস্তি পাওয়া যেত।
বাবা একটু পেটরোগা আছেন। তবে বাথরুমে বেশি সময় নেন না। ততক্ষণে আপনি গার্লফ্রেণ্ডের কথাটা বলে নিন-না। ততক্ষণে বাবার হয়ে যাবে।
কী আর শুনবেন! দুনিয়ার সব প্রেমের গল্পই একরকম।
না, না, তা কেন, প্রেম তো নানারকম আছে। ঝগড়া থেকে প্রেম, আক্রোশ থেকে প্রেম, মুগ্ধতা থেকে প্রেম, অনেক কম্বিনেশন আছে মশাই।
আমাদের ঠিক প্রেম হয়নি। ওয়ান ওয়ে ট্র্যাফিক। আপনাকে বলে রাখা দরকার, পুরুষ হিসেবে আমি মোটেই অ্যাট্রাকটিভ নই।
কী করে বুঝলেন?
আমার চেহারাটা একটু রুক্ষ টাইপের। রাগেড বলতে পারেন। মুখশ্রী মোটামুটি কুচ্ছিত। তবে আমার হাইটটা বেশ ভালো। ছয় ফুট এক ইঞ্চি।
বাঃ দারুণ হাইট তো!
হ্যাঁ, ওটাই আমার একমাত্র প্লাস পয়েন্ট, এ তো গেল চেহারা। গুণের কথা যদি জিজ্ঞেস করেন তবে বলতে হবে, আমি মোটামুটি খারাপ ছাত্র, কোনো বাড়তি গুণ, যেমন গানের গলা, ছবি আঁকার হাত, একস্ট্রা স্মার্টনেস এসব আমার নেই। মেয়েরা আমাকে অপছন্দ করে বলেই আমি যৌবনের একেবারে শুরু থেকে টের পেয়ে আসছি।
এগুলো কোনো বাধা নয়।
না, বাধা নয়। তবে চেহারা বা ব্যক্তিত্বে রিপালসিভ কিছু থাকলে অনেক সময়ে নিজে টের পাওয়া যায় না। আমাদের এক বন্ধু ছিল অশোক, তার চোহারা খারাপ ছিল না, মানুষও খারাপ নয়। পয়সাকড়িরও অভাব ছিল না, কিন্তু আমরা প্রায় সবাই ইউনিভার্সালি তাকে অপছন্দ করতাম। এই অপছন্দের কোনো লজিক্যাল ব্যাখ্যা কখনো খুঁজে পাইনি।
আচ্ছা, আপনি আত্মগ্লানি বন্ধ করে ঘটনাটা বলুন।
ব্যাকগ্রাউণ্ডটা জানিয়ে রাখলাম তাতে আপনার বুঝতে সুবিধে হবে। কয়েক বছর আগে আমি দিল্লি থেকে পূর্বা এক্সপ্রেসে ফিরছিলাম। সেকেণ্ড ক্লাস থ্রি-টায়ারে। এই মেয়েটিও তার মা-বাবা আর মামা-মামির সঙ্গে বেড়িয়ে ফিরছিল। মিষ্টি চেহারা, ছোটোখাটো এবং রোগা। বেশ লাজুক ধরনের সভ্য মেয়ে।
