কী করে বুঝলেন? ক-টা চোরের সঙ্গে আপনার আলাপ আছে?
তা নেই ঠিকই। আন্দাজ থেকে বলছি।
দিনকাল পালটে গেছে মশাই। এখন আর আগেকার মতো বোকা বোকা চোরের যুগ নেই। গেরস্তরাও যেমন চালাক-চতুর হয়েছে, চোরও হয়েছে সেয়ানা। আগে ঘরে ঘরে জানালায় শিক থাকত। সেটা বেঁকিয়ে ঘরে ঢাকা সোজা। আজকাল গ্রিল হয়েছে, সেটা বাঁকানো যায় না বলে আমাদের গ্যাস কাটার ব্যবহার করতে হয়। আর আমেরিকার চোররা তো রীতিমতো ইলেকট্রনিক এক্সপার্ট।
ঠিক কথা। খুব সংকোচের সঙ্গে একটা কথা বলব?
বলুন না। আমি কথাটথা কইতে ভালোই বাসি।
কথা শুনলে জ্ঞানও বাড়ে।
বলছিলাম কী, আমাদের বাড়িতে ক্যাশ টাকা বেশি থাকে না। গয়নাগাটিও সব লকারে।
এই তো মাটি করলেন। গয়নাগাটি লকারে রাখতে গেলেন কেন? আজকাল তো ব্যাঙ্কের লকার থেকে দেদার জিনিস হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। এটা কাঁচা কাজ হয়েছে মশাই।
লকারের জিনিসে ব্যাঙ্ক কোনো গ্যারান্টিও দেয় না। গেলেই গেল।
আপনি হয়তো ঠিক বলছেন। কিন্তু আমার মা-বাবার ব্যাঙ্কের ওপর অগাধ বিশ্বাস। তবে আপনাকে শুধু হাতে ফিরে যেতে হবে না।
ক্যাশ টাকা কোথায় পাওয়া যাবে আমি বলছি। রান্নাঘরে মিটসেফের মধ্যে একটা পুরোনো গ্ল্যাকসোর কৌটো আছে। বড়োকৌটো। তাতে মুসুরির ডাল রাখা হয়। ওই ডালের মধ্যে হাত চালালেই কিছু টাকা পাওয়া যাবে।
কত হবে? বিশ-ত্রিশ নাকি?
কিছু বেশিও হতে পারে। ধরুন শতখানেক।
দুর। ওসব পেটি ক্যাশ ছুঁই না আমি।
আপনার কাছে কি টর্চ আছে?
আছে। তবে চোরেদের আলো জ্বালানো বারণ। টর্চের কথা কেন?
বলছিলাম কী, টর্চ থাকলে আপনার একটু সুবিধে হবে। দক্ষিণদিকে যে শোয়ার ঘরটা আছে সেখানে গোদরেজের আলমারির নীচের তাকে চারটে অ্যালবাম পাবেন। সবুজ মলাটঅলা অ্যালবামের ভেতরে খুঁজলেই অন্তত হাজারখানেক টাকা পেয়ে যাবেন।
আহা, শুধু ক্যাশ টাকাই তো আমার টার্গেট নয়। দামি জিনিস কিছু নেই? এরকম একটা ঘ্যামা বাড়িতে তো দামি দামি জিনিস থাকার কথা।
হ্যাঁ আছে। গোদরেজ আলমারির পাশেই আরও একটা আলমারি পাবেন। তারমধ্যে একটা ক্যামেরা, একটা হ্যাণ্ডিক্যাম আর পোর্টেবল ভি সি ডি, অডিও ভিডিয়ো প্লেয়ার পেয়ে যাবেন।
ওসব জিনিসের সেকেণ্ড হ্যাণ্ড মার্কেট খুব খারাপ। কারণ হচ্ছে, ওগুলো সারা পৃথিবীতে এত একসেস প্রোডাকশন হয়েছে যে, দামও কমে যাচ্ছে হু হু করে।
আপনি সত্যিই খবর রাখেন।
সেকেণ্ড হ্যাণ্ড মার্কেটের খবর না রাখলে কী আমাদের চলে?
আচ্ছা এখন ওখানে ক-টা বাজছে বলুন তো?
দুটো পাঁচ। আপনি তো সাড়ে এগারো ঘণ্টা পিছনে আছেন। ওখানে বোধ হয় এখন দুপুর তিনটে পঁয়ত্রিশ শনিবার।
মাই গড। আপনি শিকাগোর সময় জানলেন কী করে?
জানা শক্ত নাকি?
না, শক্ত নয়, তবে–। যাকগে, আপনার টার্গেটটা কী, আমাকে একটু বলবেন?
না মশাই, কোনো টার্গেট ঠিক করে তো আর চুরি করতে ঢোকা যায় না। আর যা জোটে তাই নিয়ে পিটটান দেওয়ার মতো ছিচকে চোরও আমি নই। মেহনত করে ঢুকেছি, চারদিকে দেখে-টেখে যা পছন্দ হবে নিয়ে যাব।
অ্যান্টিক কিছু আছে?
অ্যান্টিক! না, আমাদের বাড়িতে অ্যান্টিক কিছু আছে বলে তো জানি না। তবে ছিল। শুনেছি, আমাদের ঢাকার বাড়িতে ব্রিটিশ আমলের পুতুল, ঘড়ি, খেলনা, অয়েল পেন্টিং, এনগ্রেভিং, ফরাসি দেশের রুপোর চামচের সেট এইসব ছিল।
আপনাদের দেশ কি ঢাকা?
হ্যাঁ। আমাদেরও ঢাকা। তবে শহরে নয়। গাঁয়ে।
বিক্রমপুর।
বাঃ, শুনে খুশি হলাম।
খুশি হওয়ার কিছু নেই মশাই, ঢাকাতেও শুনেছি, আমাদের তেমন সুখের সংসার ছিল না। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনারা বেশ বনেদি বড়োলোক।
না, না, বড়োলোক নই। তবে ঢাকা শহরে আমাদের বেশ বড়ো ব্যাবসা ছিল। মিষ্টির দোকান আর মনোহারি স্টোর। দেশত্যাগ হওয়ার পর ব্যাবসা লাটে উঠল।
ঢাকায় গেছেন কখনো?
না। দেশত্যাগের সময় তো আমার বাবারই জন্ম হয়নি।
আপনার বাবার বয়েস কত?
সাতান্ন। এ-কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন?
মিলিয়ে দেখলাম। বেঁচে থাকলে আমার বাবার বয়স হত পঞ্চান্ন।
বেঁচে নেই বুঝি?
না, ইস্কুল মাস্টার ছিলেন।
তাই? তাহলে আপনি এই লাইনে এলেন কেন?
কেন, এই লাইন কি খারাপ?
না, মানে চুরি-টুরি কি আর ভালো জিনিস?
হাসালেন মশাই, যে-দেশের মন্ত্রী চোর, পুলিশ চোর, আমলা চোর, আপামর জনসাধারণের তিনজনের দুজন চোর সেই দেশে চুরি ভালো জিনিস না-হবে কেন? আমার বাবা মাস্টারি করতেন, চুরির সুযোগ ছিল না আর তেমনি কষ্ট পেয়ে অভাবের তাড়নায় কুঁকতে ধুকতে অকালে চলে গেলেন।
আপনি কি বলতে চান যে, আপনার অবস্থা আপনার বাবার চেয়ে ভালো?
খারাপ কী বলুন! আমার মোটরবাইক আছে, মোবাইল ফোন আছে, ঘরে কালার টিভি, ফ্রিজ আছে। এমনকী রান্নাবান্না করে দেওয়ার জন্য একজন মাইনে করা লোকও আছে। আর হ্যাঁ, আমি সেলিমপুরে যে ফ্ল্যাটে থাকি সেটা আমার ওনারশিপ ফ্ল্যাট।
বলেন কী? তাহলে তো আপনি রীতিমতো এস্টাব্লিশড!
হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। তবে নাল্পে সুখমস্তি, ভূমৈব সুখম।
আমার কম্বিনেশনে সংস্কৃত ছিল না। ওটার মানে কী?
আমার বাবা সংস্কৃতে মস্ত পন্ডিত ছিলেন, আমাকে সংস্কৃত শিখতে হয়েছিল। আর যেটা বললাম, সেটার মানে আপনার না জানলেও চলবে।
আচ্ছা, আপনার কথাবার্তার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, আপনি লেখাপড়া জানেন।
