সিগারেটটা কোথায় ফেলল মাখনলাল! কোথায়…? সে প্রাণপণে উঠে বসবার জন্য চেষ্টা করতে করতে ললিতাকে ডাকতে চাইল। চেষ্টা করে দেখল মাখনলাল–ওঠা যায় না। পিয়ানোর রিড টিপে কে যেন মুহুর্মুহু বিদ্যুতের আলো ফেলছে। সে হাত বাড়িয়ে খুঁজছিল–সিগারেটটা। এই ঘরেই কোথায় কোন অন্ধকার কোণে সেটা পড়ে আছে…জ্বলছেও, তার পোড়ো গন্ধ আগুনের তাপ সে অনুভব করল। সে নিশ্চিত বুঝল–কোথাও জড়ো করে রাখা কাপড়–চোপড়ে, কাঠের টেবিলের পায়ার সঙ্গে লেগে, কিংবা বিছানায় কারও অসতর্ক চুলের ভিতরে সিগারেটটা নির্দয় জ্বলছে।
‘কেন এভাবে! কেন!’ মাখনলাল প্রশ্ন করে। মনে হয় বহুকাল ধরে একটা অন্ধকার ঘরের ভিতরে কোথায় একটা সিগারেট জ্বলছে–সে খুঁজছে। খুঁজছে। সিগারেটটা আছে কোথাও-তার জ্বলা সে টের পাচ্ছিল। প্রাণপণে উঠবার, কাউকে ডাকবার জন্য সঙ্গে ছটফট করছিল।
রাতের প্রথম কুকুরটা ডেকে উঠতেই আস্তে-আস্তে হাল ছেড়ে দিল মাখনলাল। বুঝতে পারল –সে মারা যাচ্ছে। ইঁদুর আরশোলার মতো তুচ্ছভাবে। কাল ক্ষতস্থান থেকে দু-ফোঁটা রক্ত দু চোখে গড়িয়ে পড়লে ওজন যন্ত্রটা ট্রাফিক পুলিশের মতো হাত বাড়িয়ে তার হাতে একটা টিকিট তুলে দেয়। মাখনলাল কিছুই দেখতে পায় না। নিশ্চিত শেষ স্বপ্নের ঢেউটা এসে পড়লে সে চকিতে শুনতে পায় ললিতা তাকে ডাকছে।
কিন্তু তখন তটভূমি ছেড়ে দিয়ে ঢেউয়ে দুলে–দুলে যাওয়ার মতো মাঝ সমুদ্রের দিকে চলে যাচ্ছিল মাখনলাল।
হরণ
হ্যালো! হ্যালো!
–হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন না।
আচ্ছা, এটা কি টু ফোর সেভেন থ্রি ফোর জিরো ফোর জিরো?
এই মেরেছে, নম্বরটা তো ঠিক জানা নেই।
আচ্ছা, এটা বিজয় ঘোষের বাড়ি কি?
বিপদে ফেললেন মশাই, এই বাড়ির কর্তার নাম কি বিজয় ঘোষ নাকি?
আপনি কে বলছেন বলুন তো!
আমি এ-বাড়ির একজন গেস্ট বলতে পারেন।
গেস্ট! গেস্ট? অথচ হোস্টের নামটা বলতে পারছেন না?
আপনি কোথা থেকে কথা বলছেন?
শিকাগো।
শিকাগো? ও বাবা, সে তো অনেক দূরের পাল্লা!
তাহলে আপনাকে সত্যি কথাটা বলাই যায়।
আপনার দিক থেকে কোনো বিপদের ভয় নেই।
কী যা তা বলছেন! পাগল নাকি?
না, ঠিক পাগল নই। আমি আসলে একজন চোর।
চোর! বলেন কী মশাই! আপনি চোর!
হ্যাঁ, অত অবাক হচ্ছেন কেন? চোর কথাটা নিশ্চয়ই আপনি এই প্রথম শুনছেন না!
ইয়ার্কি মারছেন না তো!
না মশাই, না। অনেক মেহনত করে সবে ঘরে ঢুকেছি, এমন সময় হঠাৎ ফোনটা বাজতে লাগল। কাজের সময় ফোনটোন বাজলে বড় ফ্যাসাদে পড়তে হয় মশাই, তাই ফোনটা তুলে কথা কইছি।
সর্বনাশ! আমি যে, ভীষণ নার্ভাস ফিল করছি!
আমিও। আপনার চেয়ে বরং একটু বেশিই।
দেখুন, আপনার কাছে আর্মস নেই তো! পিস্তল টিস্তল বা ছোরাছুরি?
আরে না। ওসব নিয়ে বেরোলে আরও বিপদ। ওসব কাছে থাকলেই মনে জিঘাংসা আসে, আর তা থেকে খুনোখুনিও হয়ে যেতে পারে। তাই আমি ওসব রাখি না।
দেখুন, আমার টেলিফোনের স্ক্রিনে ডায়াল করা যে-নম্বরটা দেখতে পাচ্ছি সেটা আমাদের বাড়ির নম্বর-ই বটে। আচ্ছা, এটা কত নম্বর বাড়ি বলুন তো! সেভেনটি ফোর ডি বাই ওয়ান…?
বিপদে ফেললেন মশাই, বাড়ির নম্বরটা তো দেখিনি।
বাইরের দরজায় আমার বাবা বিজয় ঘোষের নেমপ্লেট আছে।
সদর দিয়ে তো ঢুকিনি মশাই যে নেমপ্লেট দেখতে পাব। আমি ঢুকেছি পেছনের জানালার গ্রিল কেটে। পরিশ্রম বড়ো কম হয়নি।
দেখুন, আপনাকে একটা অনুরোধ করতে পারি কি?
আহা, অত কিন্তু কিন্তু করার কী আছে? বলে ফেলুন।
আপনি যখন চোর তখন চুরি তো করবেন-ই, সে তো আর আটকাতে পারব না। কিন্তু প্লিজ, আমার মা বাবার কোনো ক্ষতি করবেন না। আর আমার একটা ছোটোবোনও আছে। প্লিজ, প্লিজ, ওদের ওপর চড়াও হবেন না, আপনার যা খুশি নিয়ে যান।
কিন্তু কেউ যদি জেগেটেগে যায় তাহলে তো আমাকেও মাথা বাঁচাতে হবে মশাই! চোরের প্রাণ বলে কি প্রাণটার দাম নেই?
অবশ্যই আছে, অবশ্যই আছে।
তাহলে কথা দিই কী করে?
আচ্ছা, একটা কাজ করছি। লাইনটা আমি ধরে ধাকছি, আপনিও লাইনটা কাটবেন না। কেউ যদি বাইচান্স জেগে যায়, তাহলে তাকে আগে আমার সঙ্গে কথা বলে নিতে বলবেন।
এ-প্রস্তাবটা অবশ্য খারাপ নয়। বাড়িতে আর কেউ নেই তো? ধরুন, গুণ্ডা প্রকৃতির কোনো ভাই বা আহাম্মক কোনো চাকর?
না, না আর কেউ নেই। আমরা দুই ভাই-বোন আর বাবা-মা।
বাঃ, আপনাদের বেশ ছিমছাম ফ্যামিলি।
হ্যাঁ। আপনার ফ্যামিলি কি বড়ো?
নাঃ। ফ্যামিলিই নেই।
ও। বিয়ে করেননি বুঝি?
নিজেরই পেট চলে না, তার বিয়ে।
সে তো ঠিকই। আমাদের গরিব দেশ, কত লোক খেতে পায় না।
খিদের কষ্টটা কি টের পান? আপনি তো একটা ঝিনচাক দেশে আছেন। শুনেছি সেখানে নাকি মানুষ বেশি খেয়ে মোটা হয়ে যাচ্ছে!
ঠিকই শুনেছেন। আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো প্রবলেম ওবেসিটি। খুব জাঙ্ক ফুড খায় তো!
ওই হট ডগ, পিৎজা, হ্যামবার্গার এইসব তো!
হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি তো বেশ জানেন দেখছি!
ওসব আজকাল সবাই জানে। পড়াশুনো করতে গেছেন, না চাকরি করতে? দুটোই। আমি আই টি-র ছাত্র। আবার চাকরিও করছি।
বাঃ, খুব ভালো। এখন তো আই টি-রই যুগ! আশ্চর্য! আপনি তো সত্যিই বেশ জানেন। চোর বলেই কি আর মুখ? সামান্য হলেও বিদ্যে একটু আছে। রোজ খবরের কাগজ পড়ি।
না, না, আমি আপনাকে মূর্খ বলতে চাইনি। আসলে আপনার সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে আপনি অন্য সব চোরদের মতো নন।
