আমাকে! কেন?
সেটাই তো গল্প। আপনি আমাকে জেলা শহরে নিয়ে যেতে রাজি হয়েছিলেন। ছ-টায় পরীক্ষা, আপনি ঠিক সাড়ে চারটেয় একটা বিরাট মোটরবাইক নিয়ে এসে হাজির। একমুখ হাসি নিয়ে বললেন, চলো খুকি, তোমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।
দাঁড়ান, দাঁড়ান! কী নাম যেন, বললেন। বিমলাংশু সেন?
হ্যাঁ তো।
লম্বা, ফর্সা, কোঁকড়া চুল, চোখে ভারী চশমা?
হ্যাঁ।
বিমলাংশু সেনকে পেটে আর বুকে ছুরি মারা হয়েছিল, তাই-না?
হ্যাঁ।
তাকে আমার বেশ মনে পড়ে যাচ্ছে।
সত্যি?
তারপর বলুন।
আমি তৈরি হয়েই ছিলাম। আপনি আমাকে কীভাবে মোটরবাইকের ক্যারিয়ারে বসতে হবে তা শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আপনার কাঁধ বা কোমর জড়িয়ে ধরে শক্ত হয়ে বসে থাকতে হবে। জীবনে সেই প্রথম মোটরবাইকে চড়া আমার। যা-ভয় করছিল! আর সেইসঙ্গে লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম।
লজ্জা কীসের?
ওমা! লজ্জা নয়! তখন যে মনে মনে আপনাকে নিয়ে সারাক্ষণ গবেষণা করি! তখন, বালিকা বয়সে আপনার চেয়ে রহস্যময় পুরুষ আর কেউ ছিল না আমার।
রহস্যময়! রহস্যময় ছিলাম বুঝি আমি?
ভীষণ। আপনার কাঁধে হাত রেখে পেছনের সিটে আমি কাঁটা হয়ে বসেছিলাম। সারাশরীর বার বার শিউরে শিউরে উঠেছিল। আপনি অবশ্য পাত্তা দেননি আমাকে আর তেরো বছরের কালো, রোগা একটা পেতনি মেয়েকে কেনই বা পাত্তা দেবেন আপনি?
সেটা ছিল বুলেট।
তার মানে?
মোটরবাইকটার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল।
আপনার মোটরবাইকটা ছিল ভীষণ বিচ্ছিরি। একে তো দৈত্যের মতো চেহারা, তার ওপর যা জোরে ছুটত। শব্দে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়।
আপনার অভিজ্ঞতা নেই বলে বলছেন। নইলে বুলেট একটি চমৎকার বাইক। যেকোনো রাস্তায় চলতে পারে, এমনকী পাহাড়ি রাস্তায়ও।
আপনি এমন উদাসীনভাবে চালাচ্ছিলেন যে, আপনার পেছনে যে একটা তেরো বছরের ভীতু মেয়ে বসে আছে, সেটা আপনার খেয়ালই ছিল না।
না, না, ভুল ভেবেছেন। নিশ্চয়ই খেয়াল ছিল, কাউকে ক্যারি করার সময় আমি তো সাবধানেই চালাতাম।
সেটা বুঝি মনে আছে আপনার?
অ্যাঁ! তাই তো, মনে আছে দেখছি! ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার!
সেদিন কিন্তু মোটেই সাবধানে চালাননি। ভয়ে আমি বার বার দু-হাতে আপনাকে আঁকড়ে ধরেছি আর লজ্জায় মরে গেছি।
আপনি খুব লাজুক ছিলেন তো?
হ্যাঁ। এখনও তাই। খুব আনস্মার্ট, ঘরকুনো। ভীতুও।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক মেয়েদের যেমন হওয়া উচিত।
তার মানে? মেয়েদের আনস্মার্ট, ঘরকুনো আর ভীতু হওয়া ভালো বুঝি?
ভালো নয়? তাহলে কি অন্যরকম হওয়া উচিত?
যদি তাই হবে, তাহলে আপনি আমাকে পাত্তা দেননি কেন?
তেরো বছর বয়সের মেয়েরা তো ইজের পরে!
আমি সেদিন সালোয়ার-কামিজ পরেছিলাম। অ্যাণ্ড ফর ইয়োর ইনফরমেশন, যথেষ্ট সেজেছিলাম।
হাঃ হাঃ! তাই বুঝি! তাহলে তো আপনাকে আমার সমীহ করাই উচিত ছিল। কিন্তু ঠিক কীরকম ব্যবহার করেছিলাম আপনার সঙ্গে, একটু বলবেন?
একটু নাক সিঁটকানোর ভাব তো ছিলই। আর ছিল অ্যান অ্যাটিটিউড অফ রিজেকশন। ভাবটা যেন, তুমি যতই সাজো, কিচ্ছু যায় আসে না আমার।
আজ আমি সেদিনের ব্যবহারের জন্য যদি ক্ষমা চাই?
যাঃ, ঠাট্টা করছিলাম। আমার ওই বয়েসে কি কারো কাছে পাত্তা পাওয়ার কথা?
দাঁড়ান, দাঁড়ান, একটা গন্ধ পাচ্ছেন?
পাচ্ছি তো। পাতাপোড়ার গন্ধ। কেউ কাছেপিঠে শুকনো শালপাতা জড়ো করে আগুন দিয়েছে বোধহয়।
না, না, সে গন্ধ নয়।
তবে?
ক্যা-ক্যালিফোর্নিয়ান পপি!
ক্যালিফোর্নিয়ান পপি?
ক্যালিফোর্নিয়ান পপির গন্ধ!
আমি তো পাচ্ছি না, তবে আমরা একসময়ে ওই নামের একটা তেল চুলে মাখতাম। কিন্তু সে তো ছেলেবেলায়!
কিন্তু আমি গন্ধটা পাচ্ছি যে! আর একটা বাসন্তী রঙের ওড়না–হ্যাঁ, বাসন্তী রঙের ওড়না ঝোড়ো বাতাসে খুব উড়ছে, রিয়ার ভিউ মিররে আমি যেন এখনও দেখতে পাই। ভয় করছিল আমার।
উঃ!
কী হল?
সেটা তো বাসন্তী রঙেরই ওড়না ছিল! আমিই ভুলে গিয়েছিলাম! আপনি বাইক থামিয়ে আমাকে বললেন ওড়নাটা কোমরে জড়িয়ে নিতে। নইলে নাকি চাকায় ওড়না জড়িয়ে অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে। এটা কী করে মনে পড়ল আপনার?
না, মনে পড়েনি। একটা নিরেট নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে একটা-দুটো বিচ্ছিন্ন তারা ফুটে উঠছে মাত্র। পূর্বাপর সম্পর্ক নেই। ওই বাসন্তী রঙের ওড়না আর ক্যালিফোর্নিয়ান পপির গন্ধ। কিন্তু দুটোকে মেলাতে পারি না যে? কোথা থেকে এক একটা স্মৃতি, পাখি, প্রজাপতি বা মৌমাছির মতো উড়ে আসে, তারপর আবার উড়ে কোথায় হারিয়ে যায়। সারাদিন আমার মাথায় এইসব দৃশ্য, গন্ধ, শব্দের পারম্পর্যহীন যাতায়াত। আপনি কী বলছিলেন যেন?
ভাবছি, বলে লাভ আছে কি না।
কিন্তু শুনতে আমার ভালোই লাগছে। আপনার কথাগুলো যেন আমার বন্ধ দরজায় মৃদু টোকার শব্দ। দরজাটা আমি খুলে দিতে চাই, কিন্তু ইচ্ছে করলেও যেন পারি না। তবু শব্দটাও তো একটা সংকেত! কে জানে দরজাটা ওই সংকেতে আপনা থেকেই খুলে যাবে কি না। প্লিজ, থামবেন না, বলুন।
শুনতে আপনার ভালো লাগছে কি? বোর হচ্ছেন না তো?
না, বরং আমার ভেতরে যেন শুকনো মাটিতে বৃষ্টির ফোঁটার মতো কিছু পড়ছে। বলুন, প্লিজ!
বলছি। সেই পঁচিশ মাইলের ভয়, লজ্জা, শিহরন সব এখনও পুরোনো বইয়ের মতো সাজিয়ে রেখেছি মনের মধ্যে। কিন্তু পথ তো একসময়ে শেষ হয়। আপনি আমাকে ঠিক জায়গায় নামিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার ফাংশন হয়ে গেলে আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাব। চিন্তা কোরো না। সেদিন আমি কোকিলকে হার মানিয়ে গান গেয়েছিলাম। ফেরার সময় আমার হাতে একগাদা প্রাইজ দেখে আপনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, ও বাবা, তুমি তো সাংঘাতিক মেয়ে! সব প্রাইজ লুট করে এনেছ দেখছি! বাইকে সেইসব প্রাইজ নিয়ে আসা কত শক্ত ছিল বলুন! আপনিই গিয়ে একটা বিগ শপার ব্যাগ কিনে আনলেন, তারপর সেটা যত্ন করে ক্যারিয়ারে বাঁধা হয়েছিল।
