আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না। ঠোঁটে একটু চাপা হাসি, চোখে একটু বিদ্রুপের চাউনি। আজকাল আমি অবশ্য কাউকেই কিছু বোঝাতে পারি না। এমনকী, সুবল অবধি আমার অনেক কথা সিরিয়াসলি নেয় না।
আমি ভাবছি মানুষ অনেক সময়ে যা বিশ্বাস করতে চায় সেটাই ঘটে যায়। আপনি হয়তো খুব জোরের সঙ্গে লোকটার অলৌকিক ক্ষমতাকে বিশ্বাস করেছিলেন, আর সেই জোরেই হয়তো ব্যথাও কমেছে। মানুষ মন দিয়ে কত কী করতে পারে! কিংবা লোকটা হয়তো আপনাকে হিপনোটাইজ করেছিল।
আপনি পারেন?
কী?
হিপনোটাইজ করতে?
না। আমার পারার কথাও নয়।
কেউ যদি আমাকে বাকি জীবনটা হিপনোটাইজ করে রেখে দিত, তাহলে বড় ভালো হত।
বাস্তব থেকে পালাতে চান তো! আমরা সবাই কমবেশি পালাতেই তো চাই। কিন্তু পালিয়ে লাভ হয় না, ফের বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়। নিস্তার নেই। একটা সময় ছিল যখন আপনি পালানোর মানুষ ছিলেন না। হাসপাতালের মোড়ে সেই যে ভীষণ হাঙ্গামাটা হয়েছিল, তারকথা আপনার মনে আছে? বাবুপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মেছোবাজারের গুণ্ডাদের কী ভয়ংকর মারপিট! কত বোমা পড়েছিল, গুলি চলেছিল, পুলিশ অবধি এগোতে সাহস পায়নি। একটা মোটরবাইক নিয়ে আপনি সেই হাঙ্গামার মধ্যে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। খুব পপুলার ছিলেন বলেই বোধহয় সেই হাঙ্গামা থামাতে পেরেছিলেন আপনি। আমি অবশ্য ডিটেলস জানি না, তবে তখন লোকের মুখে মুখে আপনার নাম ফিরত। মনে আছে?
না। কিছু মনে নেই।
কিংবা রুচিরা আর পল্লর সেই ভালোবাসার বিয়ে! মনে আছে?
নাম দুটো প্রথম শুনছি।
বদমাশ, জুয়াড়ি, জোচ্চোর, মিথ্যেবাদী বলে পল্লকে সবাই চিনত। তবু রুচিরা যে কী করে ওর প্রেমে পড়ল কে জানে! শান্ত, শিষ্ট, ভারি ভালো মেয়ে। ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল। তবু পল্লুর প্রেমে পাগল হয়ে প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ল। কেলেঙ্কারির একশেষ। পল্ল দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছিল। রুচিরার বাবা পল্লর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে গিয়ে গুণ্ডাদের হাতে মার খেয়ে এলেন। পুলিশ অবধি পল্লুকে আড়াল করেছিল, কারণ ওর মামা ছিল ডি এস পি। রুচিরাকে আত্মহত্যা করতে হত আপনি না থাকলে।
পল্লু! রুচিরা! এসব শব্দ শুনছি আর আমার মাথার ভেতর গভীর কালো জল টুপটাপ করে পড়ে তলিয়ে যাচ্ছে। কোনো ঝংকারও নেই, টংকারও নেই। পল্লুকে কি আমি মেরেছিলাম?
না। বরং তাকে প্রবল মারের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। রুচিরা যখন বিষ খেয়ে হাসপাতালে, তখন ওদের পাড়ার লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে এসে পলুকে পাকড়াও করে। সেদিন আপনি গিয়ে আড়াল না করলে ও মরেই যেত। শুনেছিলাম, কিছুদিন আপনি ওকে বন-বাংলোয় নিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আত্মহত্যার। প্ররোচনা দেওয়ার জন্য পুলিশ ওকে খুঁজছিল। খুব গন্ডগোল চলেছিল কিছুদিন। আপনাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। কিছুদিন পরে অবশ্য রুচিরা আর পড়ুর বেশ মিলমিশ হয়ে যায়। পল্লু কিন্তু আর আগের মতো ছিল না, পালটে গিয়েছিল। কী করে সেটা হয়েছিল তা আজও জানি না।
আচ্ছা এই ঘটনাটা শুনে আমাকে তো বেশ ভালো লোক বলেই মনে হচ্ছে, তাই-না?
খারাপ তো বলতে চাইছি না।
কিন্তু একটু আগে আপনিই না বলেছিলেন যে, আমি ছিলাম লাফাঙ্গা, বদমাশ, মেয়েবাজ! একইসঙ্গে একটা লোক ভালো আর খারাপ কী করে হতে পারে?
সেইজন্যই তো আপনাকে একদম বুঝতে পারতাম না। কখনো মনে হত ভীষণ ভালো, ডাকাবুকো, সাদা মনের মানুষ। আবার কখনো মনে হত, ভীষণ পাজি, ভীষণ দুষ্টু, ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ।
খুব মুশকিলে ফেলেছেন আমাকে।
মুশকিল শুধু আপনার নয়, আমারও। মনে মনে আপনার যে-পোট্রেটটা আঁকার চেষ্টা করেছি, সেটা বার বার বদলে গেছে। কখনো আপনাকে মনে হয় ইভান দি টেরিবল, কখনো বা সন্ত জন। আপনি এমন অদ্ভুত ছিলেন। বলেই আমার কিশোরী বয়সে আপনাকে নিয়ে আমি মনে মনে ভারি জ্বালাতন হতাম।
আমাকে নিয়ে আপনার প্রবলেমটা কী ছিল বলবেন?
অনেক সময়ে কেউ কেউ নিজের অজান্তেই অন্য কারো প্রবলেম হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া আমার একটা ধারণা হয়েছিল যে, আপনি আমার দিদিকে বিয়ে করবেন এবং একদিন আপনাকে জামাইবাবু বলে ডাকতে হবে।
ও হ্যাঁ, এ-কথাটা বলেছিলেন বটে। আপনার দিদির সঙ্গে আমার—
ঠিক তাই।
গানের কথায় একটা মেঘলা দিনের কথা মনে পড়ল। বলব?
কী জানি কেন, আজ এই শীতের সকালে আপনার কথা শুনতে আমার বেশ ভালো লাগছে। আপনি আমার সেই ছোট্ট শহরের মেয়ে। কত ছোটো ছোটো কথা মনে আছে আপনার। শুনে ফের সেই ছেলেবেলায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে?
হ্যাঁ। ভীষণ।
আপনার ইচ্ছের আরও জোর হোক।
সেই যে মেঘলা দিনের কথা বলবেন বলছিলেন। বলুন।
হ্যাঁ, সেটা এক আশ্চর্য দিন। আমাদের শহরের এক পলিটিক্যাল লিডার তার আগের দিন কদমতলার মোড়ে খুন হয়েছিলেন। বিমলাংশু সেন। পরদিন সকাল থেকেই দোকানপাট বাজার সব বন্ধ। গাড়িঘোড়া কিছু চলছে না। অথচ সেদিন জেলা শহরে আমার গানের কম্পিটিশনের ফাইনাল পরীক্ষা। না গেলেই নয়। শহর প্রায় পঁচিশ মাইল দূর। সকালে এসব খবর পেয়ে মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। রাগ-অভিমান-হতাশায় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে বিছানায় পড়ে পড়ে কেবল কাঁদছি, তখন দিদি এসে বলল, কাঁদিস না। ঠিক একটা উপায় হবে, দেখিস। কিন্তু ওসব যে ছেলেভোলানো কথা তা জানা ছিল বলে একটুও বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু উপায় সত্যিই হয়েছিল। দিদি আপনাকে খবর দিয়েছিল।
