কত মনে আছে আপনার! আপনি ভাগ্যবতী। আমার যে কেন কিছুই মনে পড়ে না। কী জানি কেন, এখন হঠাৎ আমার একটা ভাঙা কাঁচের বোল-এর কথা মনে পড়ছে। সবুজ রং ছিল বোলটার, ভারি সুন্দর দেখতে।
আপনি একটা বিচ্ছ। কেন ও-কথা বলছেন? আপনার সব মনে আছে, কিছুই ভোলেননি। আমার চেয়েও বেশি মনে আছে আপনার। কারণ প্রাইজে আমি এক সেট বোলও পেয়েছিলাম। মোটরবাইকের ঝাঁকুনিতেই বোধহয় একটা বোল ভেঙে গিয়েছিল। বোলগুলো ছিল সবুজ রঙের। আমিই ভুলে গিয়েছিলাম, আপনার কী করে মনে আছে?
না, না, কিছু মনে নেই। কিছুই মনে নেই। কীসের একটা আড়াল বলুন তো? কে আমার অতীতকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছে?
কেউ নয়। ওটা আপনার অটো সাজেশন।
আপনিই-না একটু আগে বলেছিলেন, আমি কিছু একটা ভুলতে চাইছি বলে ভুলে যাচ্ছি। কিন্তু কী ভুলতে চাইছি সেটাই তো আর মনে নেই আমার।
মনে পড়লে হয়তো আপনার ভালো লাগবে না।
তা হোক, তবু তো এই আধখানা হয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে রেহাই পাব। আপনি জানেন?
না তো?
কিন্তু আপনার মুখ দেখে আমার কেন মনে হচ্ছে যে, আপনি জানেন?
অনুমানটা ভুল।
তাই হবে হয়তো।
আজ আমি আসি!
যাবেন! তাই তো, আপনার তো চলে যাওয়ারই কথা! আবার আসবেন।
বলতে পারি না।
দাঁড়ান, দাঁড়ান। না, নড়বেন না, ওই রোদ আর ছায়ার ঠিক মাঝখানে যেমনটি দাঁড়িয়ে আছেন, তেমনই থাকুন তো! আপনার ডানদিকে রোদ, বাঁ-দিকে ছায়া…
দাঁড়ালাম তো!
সুভাষিণী…সুভাষিণী…আশ্চর্য! কেন এ নামটা মনে পড়ল।
মনে পড়ল তাহলে!
পড়ল, কিন্তু আপনি কে বলুন তো?
আমাকে ভুলতে গিয়ে কত কী ভুলতে হল আপনাকে!
একটু দাঁড়ান। আশ্চর্য, আমার আদিগন্ত সব মনে পড়ে যাচ্ছে যে! উঃ, ভীষণ মনে পড়ে যাচ্ছে সব!…রেপ চার্জ, পাবলিকের মার, মামলা, কয়েদখানা, নাবালিকা ধর্ষণের জন্য…ওঃ!
সব ঠিক। কিন্তু আপনি বোকা, ভীষণ বোকা। যদি সব উপেক্ষা করে জোর করে এসে আমার হাত ধরতেন, তাহলে আমিও ভয় ঝেড়ে ফেলে, সবাইকে মুখের ওপর বলতে পারতাম, উনি আমাকে রেপ করেননি, আমিই ওঁকে বাধ্য করেছিলাম।
কিন্তু কেন করেছিলে? কেন বাধ্য করেছিলেন আমায়?
তখন আমার পনেরো বছর বয়স। গুটিপোকার খোলস ছেড়ে একটি প্রজাপতি বেরিয়ে এসেছে। কেউ ফিরেও দেখত না যাকে তার দিকে সকলেরই অবাক চোখের চাউনি। অহংকারে মক মক করে বুকের। ভেতরটা। তখন আমার ট্রফি চাই, মুগ্ধতা চাই, স্তাবকতা চাই, পুরুষদের হাঁটু গেড়ে বসা দেখতে চাই। কিন্তু একচোখখা, অন্ধ আবেগ একটা পুরুষকেই শুধু খুঁজে বেড়ায় তখনও। ওই একটা পুরুষের সিলমোহর না হলে, তার জীবন-যৌবন বৃথা। বুঝেছেন? ওই পঁচিশ মাইলের উজান-ভাঁটায় মাথাটা চিবিয়ে খেয়ে রেখেছিলেন। আপনি। কিন্তু সবাই যখন আমাকে লক্ষ করে, আপনি ফিরেও তাকান না। নাবালিকা বলেই হয়তো, সুন্দরী প্রেমিকার একফোঁটা একটা রোগা প্যাংলা বোন বলেই হয়তো। কী দিয়ে আপনাকে আমার দিকে ফেরাই? আমার পাগলিনি-মন তখন ওই একটা পথই খুঁজে পেয়েছিল। এক নিরালা দুপুরে সেজেগুঁজে আপনার নির্জন। একটেরে ঘরটায় হানা দিয়েছিলাম। মাথার ঠিক ছিল না। বশে ছিলাম না। নিজের শ্বাসেই আগুনের হলকা টের পেয়েছিলাম। আপনি অবাক হয়েছিলেন, ঠেকাতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মানুষ কি পারে নিজের শরীর মনকে রাশ টেনে রাখতে। ভেসে গিয়েছিলেন, ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম আমি। দুই মাতাল আর পাগলের খেয়ালই ছিল না কিছু। বীরু নামে সেই মিস্তিরি ছেলেটা আপনাদের বাইরের দেওয়ালে রং করছিল, যে লোক ডেকে এনেছিল…উঃ, তারপর পৃথিবীটা উলটেপালটে গেল একেবারে। কোন অন্ধকারে ঠেলে দিলাম আপনাকে, আর। এক অন্ধকারে ডুবে গেলাম আমিও। সত্যি কথাটা যতবার বলতে গেছি, আমার মুখ চেপে ধরা হয়েছিল। অঝোরে চোখের জল ঝরে গিয়েছিল শুধু। কত কষ্ট পেতে হল আপনাকে!
কী চাই সুভাষিণী? আজ আমার কাছে আর কী চাও?
আপনি কি ভেবেছিলেন সেইদিনের সেই কিশোরী সুভাষিণী ওইদিনের গন্ডগোলে ভয় পেয়ে বোবা হয়ে থাকবে চিরকাল? দুই বাড়ির মধ্যে সম্পর্ক তেতো হয়ে গেল, যাতায়াত বন্ধ, আপনাকে নিয়ে কী বিচ্ছিরি টানাহ্যাঁচড়া–মামলা-মোকদ্দমা! ভয় হয়েছিল ঠিকই, তবু মন স্থির ছিল। কত কষ্ট করে, কত কাঠখড় পুড়িয়ে এখানে এসে ঘাঁটি গেড়েছি জানেন?
সুভাষিণী, আমাকে বরং আবার সব ভুলিয়ে দাও। বিস্মৃতিই তো ভালো ছিল এর চেয়ে। এত যন্ত্রণা ছিল না! আধখানা হয়েই থেকে যাই না কেন সুভাষিণী!
বাকি আধখানা খুঁজে দিতেই তো এত কষ্ট করে এতদূর আসা।
বাকি আধখানা! ও!
এখন আসুন তো, আমার হাতখানা ধরুন। চলুন, ওই শালবনের ছায়ায় ছায়ায় দুজন একটু হাঁটি।
চলো সুভাষিণী।
সূত্রসন্ধান
ছেলেবেলা থেকেই–অর্থাৎ যখন আমার বয়স ছয় কি সাত-তখন থেকেই আমার ভিতরে একরকমের অদ্ভুত অনুভূতি মাঝে-মাঝে দেখা দিত। এই অনুভূতি কীরকম তা স্পষ্ট করে বোঝানো খুব শক্ত। তবে একথা বলা যায় যে, অনুভূতিটা এক ধরনের অবাস্তবতার। একা-একা থাকলে হঠাৎ কখনও চারদিকে চেয়ে মনে হত–আমার চারদিকে যা রয়েছে–গাছপালা কিংবা ঘরের দেওয়াল, আসবাব, কিংবা মানুষ–এরা সবাই অবাস্তব, মিথ্যে। এসব জিনিসপত্র, গাছপালা এরা কোনওটাই সত্য নয়। এরকম ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ মাথা গুলিয়ে উঠত। ওই চিন্তা মুহূর্তের মধ্যে প্রবল আকার ধারণ করত, মনে হত–এই পৃথিবীতে যা আমি চোখের সামনে দেখছি তা সবই এক অদ্ভুত উদ্ভট অবাস্তব ব্যাপার, এসবের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই। আমি এই পৃথিবীর কেউ না। এই প্রত্যক্ষ বস্তুগুলি, এই আলো-অন্ধকার এই প্রিয়জন এসবই যেন আমার চারদিকের এক মিথ্যে, অলীক আবরণ মাত্র। ভাবতে ভাবতেই আমার শরীর যেন ঊধ্বদিকে উঠতে থাকত, গা শিউরোত। আমার মনে হত এক ভীষণ যন্ত্রণায় আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আমার মন কিছুতেই এই চিন্তা তখন আর করতে চাইত না, কিন্তু চিন্তা তখন আমাকে ছাড়তও না। বেশ কয়েকটা ঝাঁকুনি দিত আমাকে। কিছুক্ষণ আমি আমার মধ্যে থাকতাম না। এই অনুভূতি আমার শরীরে এবং মনে এত প্রকট এবং প্রবলভাবে দেখা দিত যে, আমার বিশ্বাস ছিল এটা আমার অসুখ। সাংঘাতিক ধরনের কোনও অসুখ।
