এমনিই। ভাবছিলাম বড়োলোক হওয়ার কত সুবিধে। আপনার ডিমেনশিয়া হয়েছে বলে আপনার বাবা ঝাড়গ্রামে আস্ত একটা শালবনসুন্ধু দোতলা বাড়িই কিনে ফেললেন, আপনার দেহমন ভালো রাখার জন্য। আমাদের মতো গরিবদের এর চেয়ে অনেক বেশি শক্ত রোগ হলেও কিছু করার থাকে না।
ঝাড়গ্রাম! হ্যাঁ, ঝাড়গ্রামই তো বললেন। এই নামটা দিনের মধ্যে আমি যে কতবার ভুলে যাই! আপনার বাড়ি বুঝি এখানেই?
না। আমি কাছাকাছি একটা কলেজে পড়াই। খুব সম্প্রতি, মাত্র মাসছয়েক আগে জয়েন করেছি।
গরিব আর বড়োলোকের ব্যাপারটা আপনি ঠিকই বলেছেন। বড়োলোক হওয়ার কিছু অন্যায্য সুবিধে আছে। কিন্তু তার জন্য শুধু বড়োলোকদের দোষ দিয়ে বা মুন্ডুপাত করে লাভ নেই। বড়োলোকেরা এই সামাজিক সিস্টেমটা তৈরি করেনি। আমি অনেক ভেবে দেখেছি, এ দেশের সিস্টেমটাই এরকম। তবে আমাদের অবস্থা কিন্তু আগের মতো ভালো নেই।
জানি। আপনার বাবার নামে অনেকগুলো মামলা ঝুলছে। ট্রাকের ব্যাবসা মার খেয়েছে। আপনার দাদা দীপঙ্কর জেল খাটছেন।
হ্যাঁ। আপনি তো সবই জানেন। চিরকাল তো কারো সমান যায় না। বেশ একটি দুঃসময় চলছে আমাদের।
এসব কথা তো, আপনার বেশ মনে আছে দেখছি।
ইমিডিয়েট পাস্ট, অর্থাৎ অনতি অতীত বেশ মনে করতে পারি, কিন্তু তার বেশি অতীতটাই কুয়াশায় ঢাকা। আবার একটু একটু করে এই অনতি অতীতও যে মুছে যাচ্ছে তাও টের পাই। তখন খুব ভয় করে। এক বছর আগে আমাদের বাড়িতে একটা গ্যাস সিলিণ্ডার লিকেজ হয়ে আগুন লেগে যায় এবং তাতে আমার বোন টিকলি ভীষণভাবে পুড়ে যায়। পরে সে মারাও গেছে। এই ঘটনাটা আমি কী করে যে ভুলে গিয়েছিলাম কে জানে। সেদিন সুবল আমাকে ঘটনাটা মনে করিয়ে দিয়েছিল।
টিকলিদির জন্য আমরা সবাই খুব দুঃখ পেয়েছি। খুব ভালো ছিলেন টিকলিদি। জামাইষষ্ঠীতে বাপের বাড়িতে এসেছিলেন। ভাগ্য খারাপ থাকলে কত কী হয়। সেদিনই নতুন সিলিণ্ডার লাগানো হয়েছিল আর টিকলিদি গিয়েছিলেন রাঁধতে।
অত ডিটেলস আমার মনে নেই। টিকলির মুখটাও স্পষ্ট মনে পড়ে না।
ওঁর একটা মেয়ে আছে, না?
আছে বোধহয়। হ্যাঁ, আছে।
আপনি সুবলের কথা বললেন, সুবল কে?
আমার দেখাশোনা করে। পুরোনো লোক।
আপনি ভালো ব্যাডমিন্টন খেলতেন, মনে আছে?
ব্যাডমিন্টন! হয়তো খেলতাম।
মনে নেই আপনার?
না। খেলাটা ভালো নয়।
কেন, ব্যাডমিন্টন তো বেশ একটা খেলা।
শাটল কক কী দিয়ে তৈরি হয় জানেন?
পাখির পালক।
হাজার হাজার শাটল কক তৈরি করার জন্য, এত পালক ওরা পায় কোথায়? ওরা কি পাখি মেরে পালক উপড়ে নেয়?
আমি তা জানি না।
আমার সন্দেহ, শাটল ককের জন্য পাখি মারা হয়।
হতেও পারে।
পাখির মতো এমন সুন্দর আর আশ্চর্য প্রাণী আর হয় না, না? আমি আজকাল চারদিকে অনেক পাখি দেখতে পাই। তাদের ডাক শুনি। আজকাল আমার কাকের ডাকও ভালো লাগে। হাসছেন যে?
ভাবছি আপনি মুরগি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন কি না। আপনার মা খুব শুদ্ধাচারী মহিলা ছিলেন বলে, হেঁসেলে মুরগি ঢুকতে দিতেন না। আপনি আর আপনার বন্ধুরা বাড়ির পেছনের উঠোনে মুরগি কেটে রান্না করে খেতেন, মনে নেই? ও কী! অমন সাদা হয়ে গেলেন কেন?
না, না, ও কিছু নয়। আমার মনে হয় অস্বচ্ছ অতীতে আমি এমন সব কাজ করেছি যা মনে না পড়াই বোধহয় ভালো। না, এখন আমি মুরগি খাই না। মাছ, মাংস কিছুই খাই না।
বৈরাগ্য এল বুঝি?
ঠাট্টা করছেন! বৈরাগ্য তো সহজ ব্যাপার নয়। তবে সহনশীলতা বলে একটা কথা আছে না? বোধহয় সেইটে এসেছে। নাকি, কে জানে, আমি হয়তো ধীরে ধীরে কাঠ বা পাথরের মতো হয়ে যাচ্ছি।
ও-কথা বলছেন কেন?
কিছুদিন আগে আমাকে একটা কাঁকড়াবিছে হুল দিয়েছিল। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে। সে যে কী অসহ্য যন্ত্রণা, মনে হচ্ছিল হার্টফেল হয়ে মরে যাব। সুবল একটা হাতুড়ি নিয়ে বিছেটাকে মারতে এসেছিল। ও নাকি তুক জানে, কাঁকড়াবিছের রস লাগালে ব্যথা কমে যায়। আমি ওকে মারতে দিইনি। মেরে কী হবে বলুন? বেচারা তো নিজেই জানে না যে, ওর বিষ এতটা মারাত্মক। মানুষের কত অস্ত্রশস্ত্র আছে, ওদের তো ওই হুল বা দাঁত বা নখ বা শিং-ই ভরসা।
গাঁধিবাদী হতে বারণ করছি না। তবে পেস্ট কন্ট্রোল এজেন্সিকে খবর দিয়ে বাড়ি থেকে পোকামাকড় তাড়িয়ে দেওয়াই ভালো। দাঁত, নখ, হুলের সঙ্গে সহাবস্থান মোটেই নিরাপদ নয়। আমি জুলজিস্ট, পোকামাকড় সম্পর্কে আপনার চেয়ে একটু বেশি জানি। কাঁকড়াবিছের বিষে মানুষ মারাও যায়। আপনি ডাক্তার ডাকেননি?
না।
খুব অন্যায় করেছেন।
একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল যে।
কী হল?
খবর পেয়ে একটা লম্বাপানা লোক এল। এ-পাড়াতেই থাকে। সেই লোকটা আমাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে মাথায় মগের পর মগ জল ঢালতে লাগল। বিড়বিড় করে কী-একটা মন্ত্রও পড়ছিল। জল ঢালতে আমার সর্বাঙ্গ ঠাণ্ডা হয়ে কাঁপুনি ধরে গিয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জল ঢালার পর আমার ব্যথাও একদম কমে গেল।
যাঃ, ওই বিষে ব্যথা উইদাউট মেডিকেশন চব্বিশ ঘণ্টা থাকার কথা। শুধু জল ঢাললে ব্যথা কমার কথাই নয়।
কিন্তু কমল যে!
আপনি এখানে থাকতে থাকতে অন্ধবিশ্বাস বা বুজরুকিও মানতে শুরু করেছেন।
তাই হয়তো হবে, কিন্তু ব্যথাটা সত্যিই ছিল না আর।
ঠিক আছে, আপনার কথাই মানছি।
