আমাকে আপনি রাস্তায়-ঘাটে, ফাংশনে বা আরও অনেক জায়গায় অনেকবার দেখেছেন, কিন্তু কখনো লক্ষ করেননি। করার কথাও নয়। লক্ষ করার মতো তো ছিলাম না।
তা হবে।
আপনি দেবযানীদির সঙ্গে প্রেম করতেন। আবার রুচিরার সঙ্গেও। এবং নন্দিনীও ছিল আপনার প্রেমিকা। এই নন্দিনী ছিল আমার দিদি। আপনার মনে নেই।
বড়ো লজ্জায় ফেললেন। দেবযানীর কথা খুব সামান্য মনে পড়ছে। তার বাঁ-গালে জড়ল বা আঁচিল গোছের কিছু একটা ছিল বোধহয়। তাই-না?
ছিলই তো।
ব্যস, ওইটুকু মনে আছে, বাকিটা নয়। আপনার দিদি–কী নাম বললেন যেন!
নন্দিনী।
তার নিশ্চয়ই এখন বিয়ে হয়ে গেছে!
দু-বার। প্রথমবারের বিয়ে ভেঙে যায়। দ্বিতীয়বার বিয়ে করে এখন জার্মানিতে আছে।
না, তাকে আমার একদমই মনে পড়ছে না।……..
….এবং অন্যান্য জায়গায় ফাংশনের মধ্যমণি ছিল। পরে রেডিয়ো আর টিভিতে অনেক প্রোগ্রাম করেছিল।
আপনি আর বলবেন না। খুব বেশি রেফারেন্স দিলে আমার মাথার ভেতরে একটা ওলটপালট হতে থাকে। মেমরি আরও গুলিয়ে যায়। খুব হতাশ লাগে তখন।
কিন্তু আপনিই তো বললেন, কথা বললে মেমরি রিচার্জ হতে পারে।
হ্যাঁ, সেও ঠিক। তবে খুব উপর্যুপরি রেফারেন্স দিলে আমি সূত্র হারিয়ে ফেলি।
সরি, আমি বুঝতে পারিনি।
আপনার তো দোষ নেই। আমিই কীরকম যেন হয়ে গেছি।
আমি কিন্তু দিদির কথা বলতে আসিনি।
তাহলে বরং তার কথা থাক। তাকে বোধহয় আমার মনে পড়বে না। সুন্দরী বা গায়িকা যাই হোক। বরং কালো, রোগা, ইনসিগনিফিক্যান্ট যে-মেয়েটির কথা বলতে চাইছেন–অর্থাৎ আপনার কথা বলুন।
আমার কথা! না আমাকে আপনার মনে পড়ার কোনো কারণই নেই। রূপবতী, গুণবতীদেরই যখন মনে নেই, তখন আমাকে তো মনে পড়ার কথাই নয়।
কী জানেন, অনেক কথাই মনে পড়ে না বটে, কিন্তু মাঝে মাঝে খুব তুচ্ছ, সামান্য অর্থহীন ছোটো ছোটো ছবির মতো দৃশ্য মনে পড়ে। কেন মনে পড়ে তা বুঝতে পারি না। যেমন ধরুন, একটা বৃষ্টির দিনের কথা মনে আছে। স্কুলবাড়ির গাছতলায় সবুজ জামা গায়ে একটা ছেলে একটা ছাগলকে কাঁঠালপাতা খাওয়াচ্ছে আর গলা জড়িয়ে ধরে আদর করছে, এই দৃশ্যটা কেন মনে পড়ে বলুন তো। কিংবা ধরুন, সেই যে যেবার আকাশে একটা বিরল ধূমকেতু দেখা গিয়েছিল। আমরা ভোররাতে প্রচন্ড শীতে ছাদে সেই ধূমকেতু দেখতে উঠতাম। একটা ভোরে কে একজন পাশের ছাদে ভরাট গলায় একটা রবীন্দ্রসংগীত গাইছিল, আর আমার কেন যেন গান। শুনে খুব মৃত্যুর কথা মনে হয়েছিল।
আর কিছু মনে পড়ে না?
হ্যাঁ, এইরকমই ছোটো ছোটো চৌখুপির মতো দৃশ্য বা শব্দ। ঠিক যেন, একটা অন্ধকার খামের গায়ে এলোমেলো সংগতিহীন কয়েকটা ডাকটিকিট সাঁটা। একটার সঙ্গে আর একটার কোনো পারম্পর্য নেই। তবু যে মনে পড়ে, তার কারণ হয়তো এইসব স্মৃতি বোধহয় উপেক্ষা করার মতো নয়। মনে পড়ার কারণ আছে।
সেটা বোধহয় সব মানুষেরই আছে। আমারও এমন সব কথা মনে পড়ে যার কোনো মানেই হয় না। আমাদের বাড়িতে লাঠিতে ভর দিয়ে একটা বুড়ো ভিখিরি আসত। কেন কে জানে, ওই লাঠিটার কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। সাধারণ বাঁশেরই লাঠি, তবে গাঁটে গাঁটে আঁকাবাঁকা। তিরিক্ষি ছিরির একটা লাঠি। সব ছেড়ে ওই লাঠিটাকেই কেন মনে পড়বে বলুন? অমন অবাক হয়ে চেয়ে আছেন কেন বলুন তো?
আমি পরের যে-ঘটনাটা আপনাকে বলতে যাচ্ছিলাম, তা ওই লাঠিটা নিয়েই।
সে কী?
ওই বুড়ো ভিখিরিটার নাম ছিল দেলু। মা ওকে খুব ভালোবাসত। বহুদিন বসিয়ে ভাত খাইয়েছে। লোকটার ভালো একটা নামও ছিল। বোধ হয় দিলদার সিং। সেই বাঁশের বাঁকা লাঠিটার কথা আমার যখনই মনে পড়ে, তখনই দিলদারকেও যেন দেখতে পাই। কাঁচামিঠে আমগাছটার তলায়, পাশে লাঠিখানা রেখে উবু হয়ে বসে। কলাইকরা থালায় ভাত খাচ্ছে।
আশ্চর্য তো! ওই লাঠিটার কথা আপনার মনে আছে?
হ্যাঁ। খুবই অবাক কান্ড! দেলুর লাঠির কথা মনে রেখেছে এমন লোক বোধহয় পৃথিবীতে খুবই বিরল।
আর কী মনে আছে আপনার?
উমমম! দাঁড়ান, ভাবতে দিন। মুশকিল কী জানেন, চেষ্টা করলে তেমন মনে পড়ে না। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ এক একটা ছবি যেন অন্ধকারে ভেসে ওঠে। মস্তিষ্ককে বেশি তাড়না করলে একটা যন্ত্রণা হয়। ভয় হয়, গোটা মেমরি ডিস্কটাই না স্লেটের মতো মুছে যায়। কিন্তু আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন তা এখনও জানি না।
ধরুন, এমনিই। আমরা এক শহরে বাস করতাম, ছেলেবেলায় আপনি আমার কাছে খানিকটা হিরোও তো ছিলেন। মনে করুন, সেই হিরোকেই একটু দেখতে আসা।
ভালো, খুব ভালো। আজকাল কেউ বড়ো একটা আসে না। এখানে খুব হাওয়া বয়, বেশ শীত। সারাদিন এই খোলা বারান্দায় বসে থাকি। শালগাছে বাতাসের যে-শব্দটা হয় সেটা অনেকটা হাহাকারের মতো, মন খারাপ লাগে। আর এ-বাড়িটায় অনেক গাছ। এত বড়ো বড়ো গাছ থাকায়, আমি বাইরেটা খুব ভালো দেখতে পাই না।
এ-বাড়িটা বুঝি আপনারা কিনেছেন?
হ্যাঁ। বাবাকে ডাক্তার বুঝিয়েছে, নির্জন স্বাস্থ্যকর জায়গায় আমাকে রাখতে। তাই এ-বাড়িটা কেনা হয়েছে।
আপনি বেড়াতে যান না?
মর্নিং ওয়াক? না। আমার ওসব ভালো লাগে না। সন্ধেবেলা ছাদে অনেকক্ষণ পায়চারি করি। এখানে খুব ঠাণ্ডা পড়ে। সন্ধের পর আমাদের ছাদটায় খুব হিম বাতাস বয়ে যায়। আর ভীষণ অন্ধকার। খুব কুয়াশা না হলে, আকাশভরা তারা দেখা যায়। বেশ লাগে তখন পায়চারি করতে। হাসছেন কেন?
