স্বচ্ছ সরোবর, উপবন, তারপর তোমার রাজবাড়ি। দেউড়িতে কেউ পথ আটকাল না, যেতে দিল। সাতমহলা বাড়ির ভিতর দিয়ে হেঁটে-হেঁটে যাই। বিস্ময়ভরে দেখি, তোমার ঐশ্বর্য থরেথরে সাজানো। ছোট একটা বাগানে তুমি হাঁটু গেড়ে আদর করছিলে হরিণকে। তোমাকে ঘিরে কত গাছপালা। কত পাখির ডাক, কত পতঙ্গের ওড়াউড়ি।
আমাদের দিকে তাকিয়ে তুমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে এলে। ভৃঙ্গারের জলে হাত ধুতে-ধুতে তুমি বলেছিলে-এরকমই হয়।
সুখের দিন ছিল মহারাজ। কোথায় গেল?
তুমি বড় স্নেহে কাছে এলে। প্রত্যেকের চোখে তুমি রেখেছিলে তোমার গভীর দু-খানি চোখ। প্রত্যেকের প্রতি আলাদা ভালোবাসা তোমার। বিমুগ্ধ চোখে দেখি তোমাকে। দেখা ফুরায় না। বাক্যহারা আমরা।
তুমি মাথা নুইয়ে বললে–আমার কিছু করার ছিল না।
আমরা বললুম, ফিরিয়ে দাও।
তোমার কণ্ঠস্বর কোমল হয়ে এল। দু-চোখে মৃদু পিদিমের মতো স্নিগ্ধ আলো। তুমি বললে, চারণের মাঠে হরিণেরা ফিরবে না। অত সুন্দর আর রইল না জ্যোৎস্না। মাটির উর্বরতা কিছু কমে যাবে। তবু জেনো, আমি আমি তোমাদেরই আছি।
আমরা বললুম, ফিরিয়ে দাও।
তুমি মাথা নাড়লে। হাত তুলে মৃদু মুদ্রার একটি ইঙ্গিতে মিলিয়ে গেলে তুমি। মিলিয়ে গেল সেই প্রাসাদ, উপবন, সরোবর।
সেই থেকে সুখের দিন গেল মহারাজ। এখন তোমার সঙ্গে আমাদের এক আকাশনদীর তফাত।
মহারাজ, আমাদের সেই সব সুখের দিন কোথায় গেল?
সুভাষিণী
আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?
না তো! আমি আপনাকে চিনতে পারছি না।
একদম না?
আমার কি আপনাকে চেনার কথা?
হ্যাঁ।
তাহলে চিনতে পারছি না কেন?
মানুষ যদি কিছু ভুলে যেতে চায়, তাহলে সে নিজের মস্তিষ্ক থেকে ওই অনভিপ্রেত স্মৃতি মুছে ফেলতে পারে।
তাই যদি হয়, তাহলে কি এটাও সম্ভব যে, মানুষ তার কিছু প্রিয় ভুলে-যাওয়া স্মৃতিকে ফের জাগিয়েও তুলতে পারে?
সেটা আমি জানি না। আমি সাইকিয়াট্রিস্ট নই।
নন?
না।
মানুষের মনের অনেক সমস্যা, সবটাই কি সাইকিয়াট্রিস্টরা জানে? মন বা স্মৃতি কোনোটাই মানুষের বশীভূত তো নয়। সাইকিয়াট্রিস্টেরও মানসিক সমস্যা হতে পারে।
সেসব আমার জানা নেই। আমি আপনাকে একটা কথা বলার জন্য এসেছি।
বলুন। কিন্তু তার আগে বলুন, আপনাকে আমি যদি চিনতাম-ই, তবে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছি কেন? আপনাকে ভুলতে চাইবার কি কোনো বিশেষ কারণ আছে?
হয়তো আছে।
আমি সম্প্রতি একটা লস অফ মেমরি থেকে ভুগছি। ডাক্তার বলেছে, ইট ওয়াজ এ মেন্টাল শক। কী জানি, হতেও পারে। কিন্তু ভাইরাল অ্যাটাকে যেমন কম্পিউটারের মেমরি উড়ে যায়, আমারও ঠিক সেরকমই কিছু হয়েছে। আপনি যদি একটু খুলে বলেন, তাহলে আমি আমার হারানো স্মৃতি ফিরিয়ে আনার একটা চেষ্টা করতে পারি। ইনফ্যাক্ট, আমি এখন সারাদিন এই বারান্দায় বসে সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি রোজ।
আপনার চাকরিটা কি গেছে?
চাকরিটা এখনও যায়নি বটে, তবে যাবে। আমি লম্বা ছুটিতে আছি। অসুখের ছুটি। কোম্পানি কতদিন ছুটি বহাল রাখবে বলা মুশকিল। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন, চেয়ার তো খালি রয়েছে। বসুন। এবং একটু ডিটেলসে বলুন, আমি আপনাকে কীভাবে চিনতাম?
তখন আমি ফ্রক পরি, স্কুলে যাই, তেরো বছর বয়স। আপনার বয়স হয়তো তখন বাইশ-তেইশ। তেজি, টগবগে, প্রাণবন্ত একজন যুবক। খুব যে হ্যাণ্ডসাম ছিলেন তা নয়, তবে ফিগারটা দারুণ ছিল। আমাদের শহরের মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন আপনার বাবা। আপনাদের ট্রাকের ব্যাবসা ছিল। যাট-সত্তরখানা ট্রাক। এসব নিশ্চয়ই আপনি ভুলে যাননি?
ঠিক ভুলে যাইনি, তবে স্মৃতি একটু আবছা। যেন পূর্বজন্মের কথা।
সেই তখন আপনাকে আমি প্রথম দেখি, দশ বছর আগে।
দশ বছর! দশ বছরও তো অনেকটা সময়!
তেরো বছর বয়সে আমার না ছিল রূপ, না কোনো গুণ।
দাঁড়ান, দাঁড়ান! কোথাও একটা গন্ডগোল হয়েছে।
কীসের গন্ডগোল?
আপনি বরং একটু ধীরে ধীরে বলুন। আমি বুঝতে পারছি না।
না বোঝার মতো কিছু বলিনি তো! রূপহীনা, গুণহীনা এক ত্রয়োদশীর কথাই তো বলছি।
আপনার গুণের কথা আমি জানি না। কিন্তু আপনাকে রূপহীনা বলে মনে হচ্ছে না তো! আপনি কি দেখতে খারাপ? আজকাল হয়তো সুন্দর কুচ্ছিতের সংজ্ঞাও আমি গুলিয়ে ফেলেছি।
আমি আমার তেরো বছর বয়েসের কথা বলছি। কালো, রোগা, গাল-বসা কোটরগত চোখের একটা মেয়ে, যার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করলেও চলে। আপনি তখন আমাদের সেই শহরের বেশ একজন চোখটানা পুরুষ। ফুটবল খেলেন, পাহাড়ে চড়েন, লোকের উপকার করে বেড়ান, আবার তেমনই লাফাঙ্গা, বদমাশ, মেয়েবাজ ছেলে। মনে পড়ে?
একটু একটু মনে পড়ে। তবে বড় কুয়াশায় ঢাকা। আমি খুব খারাপ ছিলাম–না?
সেটা বললে অন্যায় হবে। খারাপ ছিলেন, আবার ভালো কাজও তো করেছেন। সেই ভয়ংকর বন্যার বছরে যখন শহর চার-পাঁচ ফুট জলের তলায় গিয়েছিল, তখন আপনি নাওয়া-খাওয়া ভুলে কত লোককে এনে স্কুলবাড়ি আর ইনস্টিটিউটে পৌঁছে দিয়েছেন, রিলিফের জোগাড় করেছেন। এমনকী মার্চেন্টদের কাছ থেকে চাল, ডাল কেড়ে এনেছেন।
হবে হয়তো।
মফসসলে আপনার গ্রুপ থিয়েটারের খুব নাম ছিল। আপনি অভিনয়ও বেশ ভালোই করতেন। শুনেছি আপনি সিনেমায় নামবার চেষ্টা করেছেন।
তাই নাকি? কিন্তু আপনার সঙ্গে কি তখনই দেখা হয়েছিল?
